রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ান সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ঠিক কী?

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ান সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ঠিক কী?

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলের পথে রাশিয়া। রুশ আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হয়েও হাল ছাড়েনি ইউক্রেন। ইতিমধ্যেই দু-দেশের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাই বিরাট। প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ও নিতান্ত কম নয়। কিন্তু রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট এখন কেবল ইউক্রেনের বিরুদ্ধেই লড়ছেন তা নয়, নিজের দেশে প্রেসের স্বাধীন বহুমাত্রিক স্বরকে দমিয়ে দেওয়াও এখন পুতিনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিষয়টা ঠিক কেমন? দু একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা হবে কীভাবে সরকারের মতকেই সুকৌশলে প্রেসের ওপর আরোপ করছে রাশিয়া। ২৪ শে ফেব্রুয়ারি গোটা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলির শিরোনাম ছিল রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু স্বয়ং পুতিন কিন্তু একে যুদ্ধ বলতে নারাজ। ফলে নিজের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলির জন্য সরকারের কড়া নির্দেশিকা ছিল এই আক্রমণকে বলতে হবে ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’। ভাবখানা এমন যেন ইউক্রেনের নিজের স্বার্থেই রাশিয়াকে এই যুদ্ধের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে একের পর এক সংবাদসংস্থার ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রের খড়গহস্ত। ১৯৯০ সালের সোভিয়েতে তৈরি হয় ‘ইকো অফ মস্কো’ রেডিও স্টেশন যা রাশিয়ান প্রেসের ইতিহাসে মুক্তচিন্তা এবং মুক্তস্বরের অন্যতম মাইলফলক। এই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে রাশিয়ার প্রশাসন এই রেডিও স্টেশনটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার ‘টিভি রেইন’ বলে অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম নিজেদের অফিসে তালা ঝুলিয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য।

২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন রাশিয়ার সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। রাশিয়ান সরকারের স্বাধীন মতামত দমনের নীতির সামনে বন্ধ হওয়ার মুখে তার সংবাদপত্র নোভেয়া গেজেট। এই প্রসঙ্গে দিমিত্রি স্পষ্ট জানিয়েছেন বর্তমান রাশিয়ায় যে সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে তার ওপরই নেমে আসবে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু। দিমিত্রি বলেছেন , "বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরকারের মতে সংবাদ মাধ্যমগুলোর একমাত্র কাজ প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়া। যে মিডিয়া রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করতে অস্বীকার করবে তারই কণ্ঠরোধ করবে পুতিনের সরকার।" রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা আপনাকে অবশ্যই মনে করাবে হিটলার জমানায় নাৎসি জার্মানির প্রেসের কণ্ঠরোধের ঘটনা।

ইকো অফ মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই পুতিনের এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে। ইকো অফ মস্কোর সম্পাদক অ্যালেকসি ভেনেডিক্তব এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। আলেক্সি জানিয়েছেন মস্কো ক্রমাগত নিজেদের যুদ্ধের উপলক্ষ্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে এসেছে। সংবাদ মাধ্যমের যাবতীয় ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করছে মস্কোর হেড কোয়ার্টারস। এই গোটা যুদ্ধে ইকো অফ মস্কো সরাসরি একাধিক ইউক্রেনের সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার যারা সরাসরি রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। হাতে কলমে প্রমাণ করে দেখিয়েছে এই যুদ্ধের বীভৎসতা। তারই মাসুল দিতে গিয়ে ১৯৯১ এর পর প্রথমবারের জন্য সম্প্রচার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে ‘ইকো অফ মস্কো’।

প্রায় একই ঘটনার শিকার টিভি রেইন। ২০১০ এ নাতালিয়া সিন্দেইয়াভা এবং ভেরা ক্রিচেভস্কায়ার হাত ধরে জন্ম হয় টিভি রেইনের। এরপর ধীরে ধীরে স্বাধীন ও নির্ভীক সাংবাদিকতার এক নতুন পরিসর তৈরি করে টিভি রেইন। শুধু তাই নয় উদীয়মান তরুণ সাংবাদিকদের আঁতুড়ঘর হিসেবে ও টিভি রেইন এক পরিচিত নাম। অতীতে ক্রেমলিন দখলের সময় ও রাশিয়ান প্রশাসনের অবাধ্যতার মূল্য দিতে হয়েছে এই সংবাদ চ্যানেলটিকে। কিন্তু কোনোভাবেই শাসক তার কণ্ঠরোধ করতে পারেনি। ২০১৪ সালে শাসকের অবাধ্যতার ফলস্বরূপ কেবল নেটওয়ার্কের তালিকা থেকে বাদ পরে টিভি রেইন। কিন্তু তাও শাসকের সামনে মাথা নোয়ায় নি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। এইবারে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে আবার শাসকের কোপে পড়েছে টিভি রেইন। রাশিয়ান টেলিকমিউনিকেশন অথরিটির তরফ থেকে জানানো হয়েছে ক্রমাগত রাশিয়া বিরোধী খবর সম্প্রচার, সাধারণ জনগণকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে মদত দেওয়ার অভিযোগে এই সংবাদ সংস্থাটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নিষিদ্ধ হওয়ার মুহূর্তে ও শেষ লাইভে ও সিন্দেইয়াভা সহ টিভি রেইনের সমস্ত কর্মী রাশিয়ার এই যুদ্ধের তীব্র নিন্দা করেছেন। একের পর এক সংবাদ মাধ্যম যেভাবে নিষিদ্ধ করছে রুশ প্রশাসন তা নতুন করে পুতিনের ফ্যাসিস্ত চরিত্রকেই জনমানসে তুলে আনছে। আজকের রাশিয়ায় সংবাদমাধ্যমের মুক্ত কণ্ঠই যেখানে বারবার প্রশ্ন চিহ্নের মুখে সেখানে সাধারণ মানুষের বাক স্বাধীনতা কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।