রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে পরিবেশে বুকের ঘা কয়েক দশকেও সারবে না

আমাদের যদি বিশ্ব উষ্ণায়নের রোষ থেকে বাঁচতে হয় তাহলে যুদ্ধ নিষিদ্ধ করতেই হবে। যুদ্ধ শুধু চলুক দারিদ্রের বিরুদ্ধে, অশিক্ষার বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে  এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন ও পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে পরিবেশে বুকের ঘা কয়েক দশকেও সারবে না

ইউক্রেনের অন্তত ২০ শতাংশ রাশিয়ার দখলে, এ কথা মানছেন স্বয়ং ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভালোদেমির জেলেনস্কি। ধ্বংস হচ্ছে একের পর এক ইউক্রেনের শহর। পৃথিবীর অর্থনীতি, পৃথিবীর মানবতা আজ এক ভয়ংকর পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে, সেই সঙ্গে আরো একটি দিকে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে যা নিয়ে আলোচনা প্রায় নেই, সেই ক্ষতিটা সইছে পরিবেশ।

বিজ্ঞানীদের আগাম আশঙ্কা ছিলই। আইপিসিসির রিপোর্ট এল এমন এক সময়ে, যখন একের পর এক রাশিয়ান মিসাইল আছড়ে পড়ছে ইউক্রেনের মাটিতে, এবং চূড়ান্ত ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের। এমন ক্ষতি, যা পূরণ করা সুদূর ভবিষ্যতেও সম্ভব হবে না।

ইউক্রেনের আয়তন ইউরোপের মোট আয়তনের ছয় শতাংশ। কিন্তু মোট জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৩৫ শতাংশ দেখা যায় এই দেশে। সত্তর হাজারেরও বেশি বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমাগম এখানে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন যে এই সেনা অভিযানে এর মধ্যে অনেক প্রজাতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, শুধু তাই নয়, বিলুপ্ত পর্যন্ত হতে পারে।

ইউক্রেনের চারটি বৃহৎ নদী, ডিনিপ্রো, নিয়েস্টার, পিভেডেনিবা এবং দানিয়ুব ওই দেশের খাদ্যসুরক্ষার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমাগত বোমা বর্ষণ, গোলা গুলি এই নদী গুলির জলকে নিশ্চিত ভাবে দূষিত করবে।

এছাড়াও এই দেশের প্রায় ষোলো শতাংশ স্থল জঙ্গলে ঢাকা। বলাই বাহুল্য কত পরিমাণে গাছ ইতিমধ্যেই মৃত এবং রাশিয়ার আক্রমণ যতো তীব্র হচ্ছে তত এই ১৬ শতাংশ সবুজের আস্তরণের বিপদ বাড়ছে। শুধু তাই নয়, কাঠের রফতানি ইউক্রেনের আয়ের এক বড় অংশ। এই যুদ্ধে সেই বাণিজ্যের জায়গাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের অনেকটা জুড়ে আছে জলাভূমি, যার মধ্যে অন্তত ৩৩টির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আছে। ট্যাঙ্ক, রকেট লঞ্চার এবং মিসাইলের দাপটে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি গুলির কি পরিণাম হতে চলেছে তা আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।

তার সাথেও আছে গোলাগুলির ফলে দাবানলের আশঙ্কা। ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে যুদ্ধের পরিণামে একের পর এক জঙ্গল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তা যে পরিবেশের জন্যে কত বড় ক্ষতি তা একটি শিশুও বোঝে। ২০২০ সালে লুহাস্কে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে সরকারের যুদ্ধেই ধ্বংস হয়েছে প্রায় কুড়ি হাজার হেক্টর জঙ্গল। তাহলে এটা সহজেই বোধগম্য এই বিশাল পর্যায়ের যুদ্ধে কত পরিমাণ জঙ্গল ধ্বংস হতে চলেছে।

রয়েছে ভুগর্ভস্ত জলে ল্যান্ডমাইনের কারণে আর্সেনিক, সিসা এবং আরো বিপজ্জনক ধাতু মিশে যাওয়ার আশঙ্কা। বিশেষ করে ডনবাস অঞ্চলে, যেখানে আগে থেকেই অনেক ল্যান্ডমাইন মজুত রয়েছে।

সবথেকে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো চার্নোবিল। যার দখল ইতিমধ্যেই রুশ সেনা নিয়ে নিয়েছে। পরমাণু চুল্লির আসে পাশেও যদি গোলা গুলি চলে, বা বোমা, মিসাইলের বিস্ফোরণ হয়, তাহলে ওই অঞ্চলের তেজস্ক্রিয়তা বাড়বে, এবং বিস্ফোরণের তীব্রতা যদি বেশি হয় তাহলে সেই তীব্রতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বহুদূর পর্যন্ত। তাছাড়াও ইউক্রেনে পনেরোটি পরমাণু চুল্লি আছে। এর মধ্যে একটিও যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পরতে চলেছে গোটা ইউরোপ এবং রাশিয়া নিজেও।

নিকাশী ব্যবস্থাও মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, এবং যুদ্ধে আশঙ্কা রয়েছে তা পুরোপুরি ভেঙ্গে পরার। নিকাশি ব্যবস্থা একবার ভেঙ্গে গেলে তা পরিবেশের এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্যে ভয়াবহ হতে চলেছে। পরিকাঠামোর ওপর আঘাত তৈরি করতে পারে ডমিনো এফেক্টের।

যুদ্ধে যে পরিমাণ বারুদের ব্যবহার হচ্ছে, তা কার্বন নিঃসরনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণ। প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস মিশছে আমাদের বায়ুমণ্ডলে। রাশিয়া শুধুমাত্র ইউক্রেনকে যুদ্ধে আক্রমণ করে তার মানব এবং অন্যান্য সম্পদ ধ্বংস করছে না, তাকে আরো অনেক বেশি করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিও। বিশেষ করে যারা ইউক্রেনিয় শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছেন। কারণ হাজারে হাজারে মানুষ খুব ছোট ভৌগোলিক অঞ্চলে জড়ো হন, সেখানকার সম্পদ ব্যবহার করেন এবং প্রচুর পরিমাণে বর্জ্য তৈরি হয়।

২০১৯-এর একটি গবেষণায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাকে সবথেকে বড় দূষণকারী বলে চিহ্নিত করেছিল। যে কোনো যুদ্ধই মানবতাবিরোধী, সেই সাথে চূড়ান্ত ভাবে পরিবেশবিরোধী। আমাদের যদি বিশ্ব উষ্ণায়নের রোষ থেকে বাঁচতে হয় তাহলে যুদ্ধ নিষিদ্ধ করতেই হবে। যুদ্ধ শুধু চলুক দারিদ্রের বিরুদ্ধে, অশিক্ষার বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন ও পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।