দেশের প্রথম মুসলিম কন্যা হিসেবে ওড়াবেন যুদ্ধবিমান, সানিয়া মির্জার উত্তরণ চমকে দেবে আপনাকেও

Sania Mirza Fighter Plane : সানিয়া মির্জা এখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। ভারতের প্রথম মুসলিম মহিলা হিসেবে ফাইটার প্লেন ওড়াতে চলেছেন তিনি।

Aritra Som
৩ মিনিট
দেশের প্রথম মুসলিম কন্যা হিসেবে ওড়াবেন যুদ্ধবিমান, সানিয়া মির্জার উত্তরণ চমকে দেবে আপনাকেও

নাম শুনলে প্রথমেই চমকে উঠতে হয়। সানিয়া মির্জা! মানে যিনি ভারতের মহিলা টেনিসের জীবন্ত কিংবদন্তি? দেশকে বিশ্ব টেনিসের মঞ্চে জায়গা দেইয়ার অন্যতম কাণ্ডারি? হাজার হাজার মেয়ের অনুপ্রেরণা, সেই সানিয়া মির্জা? না, এই সানিয়ার বাড়ি হায়দ্রাবাদে নয়। ইনি টেনিসও খেলেন না। কিন্তু এই মুহূর্তে সানিয়ার গল্প নেট দুনিয়ায় আরও বহু মানুষের মনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। উত্তর প্রদেশের মেয়ে সানিয়া মির্জা এখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। ভারতের প্রথম মুসলিম মহিলা হিসেবে ফাইটার প্লেন ওড়াতে চলেছেন তিনি।

অবশ্য সাফল্যের রাস্তা সহজ ছিল না। উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর গ্রামের যশোবর গ্রামে সানিয়া মির্জার বাড়ি। ছোট্ট মধ্যবিত্ত সংসার। বাবা শাহিদ আলি সামান্য একজন টিভি মেকানিক। মা তাবাসুম মির্জা বাড়িতেই থাকতেন। ছোট থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী সানিয়া। একচিলতে ঘরের ভেতর সহজ, সাদাসিধা জীবনযাত্রা। লক্ষ্য একটাই, কিছু তো একটা করতে হবে। কিন্তু কী করতে হবে, তখনও পরিষ্কার ছিল না তাঁর কাছে। পণ্ডিত চিন্তামণি দুবে ইন্টার কলেজ থেকে হাই স্কুল পাস করেন। তারপর সোজা চলে যান মির্জাপুর শহরে। গুরু নানক গার্লস ইন্টার কলেজে শুরু হয় উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা। চমৎকারের শুরু হয় এরপরই। দ্বাদশ শ্রেণিতে তিনি গোটা উত্তর প্রদেশে প্রথম হন। আশা একটু একটু করে সামনে আসতে থাকে।

এরইমধ্যে ভারতের এয়ার ফোর্স মহিলাদের জন্য নিজের দরজা খুলে দেয়। ২০১৫ সালে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারপর পরীক্ষাও হয়। সেখান থেকে ২০১৬ সালে দেশের ইতিহাসে উঠে আসে তিনজন মহিলার নাম। অবনী চতুর্বেদী, ভাবনা কান্থ এবং মোহনা সিং। ভারতীয় বিমানবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবার কোনও মহিলা যুদ্ধবিমান চালানোর দায়িত্ব পান। তাও একজন নয়, তিনজন। ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি থেকে পাস করার পর নিজেদের কাজে যোগও দিয়েছেন।

যখন এসব হচ্ছে, তখন উত্তর প্রদেশের একটি গ্রামে বসে সেই খবর শুনছেন এক কিশোরী। সানিয়া মির্জার চোখে উঠে এল নতুন স্বপ্ন। যুদ্ধবিমান! সামনে এল অবনী চতুর্বেদীর ছবি। অবনীই যে তাঁর ‘দ্রোণাচার্য’, একলব্য হয়ে তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই কথা স্বীকারও করেছেন সানিয়া। একে মেয়ে, তার ওপর মুসলিম – সামনে একের পর এক বাধার ছবিটা যেন দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। সেইসঙ্গে সামনে এসেছিল দুজনের ছবিও। একজন তাঁর অনুপ্রেরণা, তাঁকে দেখেই সানিয়া যুদ্ধবিমান চালাতে চান। আরেকজন অজান্তেই তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন। ভারতের লাখ লাখ মেয়ের কাছে সানিয়া মির্জা স্রেফ টেনিস তারকা নন। সমাজের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে, লড়ে জিতে ফেরার মন্ত্র।

উত্তর প্রদেশের সানিয়াও সেই স্বপ্নই দেখছিলেন। তিনি তাঁর গ্রামের, তাঁর রাজ্যের মেয়েদের কাছে দৃষ্টান্ত হতে চান। চাইলে সমস্ত কিছুই করা যায়, সমস্ত বাধা অতিক্রম করা যায়। এই মন্ত্র আউড়ে তিনি প্রস্তুতই শুরু করেন। কতটা কঠিন ছিল এই প্রস্তুতই, সেটা পরীক্ষাটি দেখলেই বোঝা যাবে। ছেলে মেয়ে মিলিয়ে মোট ৪০০ টি সিট ছিল। তার মধ্যে মাত্র ১৯ টি ছিল মেয়েদের জন্য। আর ফাইটার প্লেনের পাইলট হিসেবে জায়গা পাওয়ার জন্য সেই মার্জিন আরও কমে যায়। মাত্র ২ টি সিট!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। মাত্র ২ টি সিট, আর তার পেছনে কয়েকশো, বা কয়েক হাজার মেয়ে। প্রতিযোগিতার অঙ্কটা যথেষ্ট কঠিন ছিল। তার ওপর মধ্যবিত্ত পরিবার; পরিশ্রম ছাড়া আর তো কোনও রাস্তা নেই। তাই সেই পরিশ্রমই শুরু করলেন সানিয়া মির্জা। দিনরাত এক করে চলত পড়াশোনা। যে করেই হোক, ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে জায়গা পেতেই হবে।

প্রথমবারের চেষ্টায় জায়গা পাননি সানিয়া মির্জা। কিন্তু দ্বিতীয়বারেই কেল্লা ফতে! ওই দু’টি আসনের মধ্যে একটিতে জায়গা করে নেন সানিয়া। সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ড বুকে নাম উঠে গেল তাঁর। দেশের প্রথম মুসলিম মহিলা হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করলেন তিনি। এনডিএ পরীক্ষায় ১৪৯ তম র‍্যাঙ্কও করলেন তিনি। মেয়ের সাফল্যে বাবা-মায়ের আনন্দ যেন বাঁধ মানছে না।

আগামী ২৭ ডিসেম্বর সানিয়া পুনের এনডিএ বা ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে যোগ দেবেন। ট্রেনিংয়ে সবকিছু ঠিকঠাক হলে খুব শীঘ্রই আকাশে ফাইটার প্লেন নিয়ে উড়বেন তিনি। সানিয়া জানেন, এই উড়ান তাঁর একার নয়। তাঁর বাবা-মায়ের স্বপ্ন, হাজার হাজার মুসলিম মেয়ের শিকল ভাঙার শব্দ জড়িয়ে আছে এই রাস্তায়। তাঁকে পারতে হবে। অনেকের জন্য, পারতে হবেই!

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।