এক সময় ঠেলাগাড়িতে বিক্রি হতো কুলফি, আজ ট্রাম্প-আম্বানির অনুষ্ঠানে পৌঁছয় সেই আইসক্রিম!
Shankar Ice Cream library: আইসক্রিম খাওয়ার পর মানুষের মুখের অভিব্যক্তি কেমন হচ্ছে, কোন স্বাদটা মানুষ বারবার চাইছে—এসব তিনি খুব মন দিয়ে খেয়াল করতেন। গ্রাহকদের সেই ভালোলাগাকে বুঝেই তিনি একের পর এক আইসক্রিমের স্বাদে বদল আনতেন। আর এই ‘মানুষের মন বোঝার ম্যাজিক’-ই হয়ে উঠেছিল আজকের এই বিশাল ব্র্যান্ডের আসল ভিত্তি।
১৯৬০ সাল। গুজরাতের আহমেদাবাদ শহরে Law Garden-এর ব্যস্ত রাস্তায় তখন এক ভদ্রলোক হাতে চালানো একটি ঠেলাগাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নাম তাঁর গোপিলাল সামনানি। তিনি নিজেই কাঠ দিয়ে হাতে ঘুরিয়ে (Hand-churned) তৈরি করতেন আইসক্রিম আর কুলফি। দোকানের নাম দিয়েছিলেন ‘শঙ্কর আইসক্রিম অ্যান্ড কুলফি সেন্টার’।
গোপিলাল সামনানির পুঁজি বলতে বড় কোনো দোকান বা মোটা অঙ্কের টাকা ছিল না। কিন্তু তাঁর কাছে ছিল একটা অসামান্য গুণ। তিনি গ্রাহকদের মন পড়তে পারতেন। আইসক্রিম খাওয়ার পর মানুষের মুখের অভিব্যক্তি কেমন হচ্ছে, কোন স্বাদটা মানুষ বারবার চাইছে—এসব তিনি খুব মন দিয়ে খেয়াল করতেন। গ্রাহকদের সেই ভালোলাগাকে বুঝেই তিনি একের পর এক আইসক্রিমের স্বাদে বদল আনতেন। আর এই ‘মানুষের মন বোঝার ম্যাজিক’-ই হয়ে উঠেছিল আজকের এই বিশাল ব্র্যান্ডের আসল ভিত্তি।
বছরের পর বছর কেটে গেল। ধীরে ধীরে সেই ঠেলাগাড়িটা একটা স্থায়ী দোকানে রূপ নিল, আর সেই দোকানটাই মানুষের মুখে মুখে হয়ে উঠল একটা ভরসার নাম।

১৯৮৯ সাল। ব্যবসায় পা রাখল পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম—অরুণ সামনানি। তাঁর হাত ধরেই এই ব্যবসার চেহারাটা পুরোপুরি বদলে যেতে শুরু করে। অরুণভাই বুঝলেন, শুধু সনাতন পদ্ধতিতে আর বেশিদিন টিকে থাকা যাবে না; ব্যবসার পরিধি বাড়াতে গেলে দরকার আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া।
তিনি ব্যবসায় নিয়ে এলেন এক সুনির্দিষ্ট কাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি। তবে একটা জায়গায় তিনি কোনো আপস করেননি, তা হলো গুণগত মান। একদম খাঁটি দুধ এবং ফ্রেশ ক্রিম বেস ব্যবহার করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে আইসক্রিম বানানোর ধারা বজায় রাখলেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।
এই সময় তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন আইসক্রিম বিশেষজ্ঞ নিতিন বি. শাহ। অরুণ সামনানি এবং নিতিন বি. শাহের যৌথ প্রয়াসে আইসক্রিম তৈরি করাটা কেবল একটা রান্নার কাজ রইল না, তা হয়ে উঠল এক সূক্ষ্ম শিল্প। আর এই সৃজনশীলতার হাত ধরেই আইসক্রিমের জগতে শুরু হলো একের পর এক দুর্দান্ত এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

২০১৩ সালে এলেন তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি ভাগ্যেশ সামনানি। তরুণ প্রজন্মের এই আইকন ব্যবসার ভোল পাল্টে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপরই, ২০১৬-১৭ সাল নাগাদ আত্মপ্রকাশ করে এক অভিনব কনসেপ্ট—‘শঙ্কর’স আইসক্রিম লাইব্রেরি’।
আমরা যেমন লাইব্রেরিতে গিয়ে হাজার হাজার বইয়ের খোঁজ পাই, ঠিক তেমনি এই আইসক্রিম পার্লারে ঢুকলে চোখের সামনে ভেসে উঠবে আইসক্রিমের এক অনন্ত সমুদ্র! বর্তমানে এদের নিজস্ব আবিষ্কার করা ফ্লেভারের সংখ্যা ১৩০০-রও বেশি। ফুল, ফল, নানারকম বাদাম, চকোলেট থেকে শুরু করে মশলাপাতি—কী নেই সেখানে!
এখানে গ্রাহকদের জন্য রয়েছে ‘লাইভ কাউন্টার’ আর ‘কোল্ড স্টোন প্রিপারেশন’-এর সুবিধা। অর্থাৎ, আপনার চোখের সামনেই আপনার পছন্দের ফ্লেভারের আইসক্রিম মেখে তৈরি করে দেওয়া হবে। আর কেনার আগে মনের মতো চেখে দেখার সুযোগ তো আছেই!
আপনি যদি বোদাকদেব (Bodakdev) বা সিজি রোডের (CG Road) মডার্ন আউটলেটে যান, তবে মেনু কার্ড দেখে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। এদের কিছু জনপ্রিয় ফ্লেভারের তালিকয় আছে:
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Mushroom Farming at Home: বাড়ি বসেই মাশরুম চাষ করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব—এই কথাটি শুনলে হয়তো অনেকেরই বিশ্বাস হতে চাইবে না। কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন কেরালার পিরাভোমের এক তরুণ, নাম জিথু থমাস। মায়ের সাথে মাত্র একটা ছোট প্যাকেট মাশরুমের বীজ (স্পন) দিয়ে শুরু করে আজ তিনি প্রতি মাসে ১২ লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন! তাঁর এই ১৫ বছরের পথচলা আজ দেশের বহু মানুষের কাছে এক দারুণ অনুপ্রেরণা।
ফলের জাদু: ব্ল্যাক জামুন, আলফনসো ম্যাঙ্গো কিংবা জামুন-ম্যাঙ্গো মিক্স।
অভিজাত স্বাদ: স্প্যানিশ হ্যাজেলনাট, বেলজিয়াম বা মাদাগাস্কার চকোলেট, আঞ্জির আখরোট ও আফগান রোজ পিস্তা চিলগোজা।
ইউনিক এক্সপেরিমেন্ট: বাকলাভা, রেড ভেলভেট ক্র্যানবেরি এবং হোয়াইট চকোলেট সিনামন (দারুচিনি)।
স্বাস্থ্য সচেতনদের জন্য: সুগার-ফ্রি ক্র্যানবেরি জাম্বু কিংবা ভেগান ও লো-সুগার কেসার চিলগোজা।
একটি সাধারণ ঠেলাগাড়ি থেকে উঠে এসে দেশের সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল ইভেন্টগুলিতে জায়গা করে নেওয়াটা মুখের কথা নয়। কিন্তু শঙ্কর আইসক্রিম লাইব্রেরি সেই অসম্ভবকেও সম্ভব করেছে।
১. ট্রাম্প (২০২০): আহমেদাবাদের মোতেরা স্টেডিয়ামে যখন আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসেছিলেন, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (PMO) থেকে শঙ্করের কাছে আইসক্রিম সাপ্লাইয়ের অনুরোধ যায়। কড়া নিরাপত্তা বলয় পার করে স্টেডিয়ামে পৌঁছেছিল তাঁদের বিশেষ ‘জামুন-ম্যাঙ্গো’ এবং ‘তুলসী স্ট্রবেরি’ ফ্লেভার। ট্রাম্প থেকে শুরু করে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো তারকারা সেই স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছিলেন।
২. আম্বানিদের প্রি-ওয়েডিং (২০২৪): অনন্ত আম্বানি ও রাধিকা মার্চেন্টের সেই বিশ্বখ্যাত প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানেও ডাক পেয়েছিল এই ব্র্যান্ড। প্রায় ৩০,০০০ অতিথির জন্য আইসক্রিম তৈরি করতে ভাগ্যেশ সামনানিকে ২২-২৩ জন কর্মীর এক বিশাল টিম নিয়ে দিনরাত এক করতে হয়েছিল। সেখানে তাঁদের তৈরি ভেগান ও স্টিভিয়া দিয়ে মিষ্টি করা ‘কেসার চিলগোজা’ আইসক্রিমটি তুমুল সাড়া ফেলেছিল।
তাছাড়া, ২০১৭ সালে সেরা আইসক্রিমের জন্য ‘টাইমস্ ফুড অ্যাওয়ার্ড’-ও জিতে নেয় এই প্রতিষ্ঠান।

আজকের দিনে দাঁড়িয়েও কিন্তু তাঁদের আদি দোকানটি (Law Garden-এর অরিজিনাল শঙ্কর আইসক্রিম অ্যান্ড কুলফি সেন্টার) সগৌরবে চলছে। বহু পুরনো মানুষ এখনও সেখানে ছোটবেলার নস্টালজিয়া খুঁজতে যান, যাকে তাঁরা ভালোবেসে বলেন “ওল্ড ইজ গোল্ড”।
তবে শঙ্কর আইসক্রিম লাইব্রেরি এখানেই থেমে থাকতে চায় না। কার্পিগিয়ানির (Carpigiani) মতো বিশ্বমানের আধুনিক মেশিন ব্যবহার করে কোয়ালিটি ধরে রাখার পাশাপাশি তাঁরা এবার তৈরি হচ্ছেন বিশ্বজয়ের জন্য। আগামী দিনে কিটো (Keto), ভেগান (Vegan) এবং হাই-প্রোটিন আইসক্রিমের সম্ভার আরও বাড়িয়ে গ্লোবাল মার্কেটে পা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
একটি সাধারণ ঠেলাগাড়ি, একজোড়া পরিশ্রমী হাত আর আকাশছোঁয়া স্বপ্ন—এই তিনের মেলবন্ধনে যে একটা কিংবদন্তি তৈরি করা যায়, শঙ্কর আইসক্রিম লাইব্রেরির গল্পটা আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। বড় কিছু গড়তে গেলে যে কোটি কোটি টাকার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষের কথা শোনা, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলানো আর নতুন কিছু করার অদম্য সাহস—তা এই তিন প্রজন্মের পথচলা প্রতি পদে প্রমাণ করে দিয়েছে।






