হুবহু বলতে পারতেন গত জন্মের কথা! রহস্যময়ী শান্তিদেবী অবাক করেছিলেন স্বয়ং গান্ধীকেও

rudranjan
৪ মিনিট
হুবহু বলতে পারতেন গত জন্মের কথা! রহস্যময়ী শান্তিদেবী অবাক করেছিলেন স্বয়ং গান্ধীকেও

মথুরা থেকে দিল্লি এসেছেন পণ্ডিত কেদারনাথ চৌবে নামক এক ব্যবসায়ী। সঙ্গে আছেন তাঁর ভাই এবং পুত্র। দৈনন্দিন ব্যস্ততা সামলে দিল্লি তাঁকে আসতেই হত, নইলে শান্তি পেতেন না মনে। জরুরি চিঠি দিয়ে তাঁকে জানানো হয়েছে ভারতের রাজধানীতে নাকি এমন এক শিশুকন্যার আবির্ভাব ঘটেছে যে নাকি নিজেকে কেদারের গত জন্মের স্ত্রী 'লুগডি' বলে দাবি করছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেয়েটার বাড়ির লোকজন ব্যস্ত তো হয়েছেনই, এমন কী চিঠিটা পাওয়ার পর থেকে কেদারনাথও অস্থির হয়ে উঠেছেন। তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হল। সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মৃতা 'লুগডি'র কথা কেদারের মাঝে মধ্যে মনে পড়ে ঠিকই, কিন্তু এ আবার কেমন কাণ্ড। মরা মানুষ কি ফিরে আসতে পারে নাকি? এ যে ভৌতিক ব্যাপার।

দিল্লি পৌঁছে কেদারনাথ ঠিক করলেন এই তথাকথিত 'জাতিস্মরে'র বাড়িতে প্রথমেই নিজে যাবেন না। নিজের ভাইকে কেদারনাথ সাজিয়ে পাঠাবেন তিনি। কথা মতো কেদারনাথের ভাই তাঁর দাদার নাম ধরে গিয়ে পৌঁছলেন সেই শিশুকন্যার বাড়িতে। মেয়েটা তাঁকে ঠিক এক ঝলক দেখেই গড়গড় করে বলতে লাগল তাঁর নাম,ধাম, পরিচয়। কেদারের ভাইয়ের চোখ কপালে উঠে গেল। পড়ি কী মরি করে দাদার কাছে এসে তিনি বললেন, 'ভাইয়াজী, আপনি চলুন। আমার ব্যাপার সুবিধের মনে হচ্ছে না।' এবার কেদারনাথ তাঁর পুত্রকে নিয়ে মেয়েটাকে দেখতে গেলেন। তাঁকে দেখামাত্র মাটিতে লুটোপুটি করে কাঁদতে আরম্ভ করল সেই কিশোরী, ভারতবাসী যাঁকে চিনেছিলেন 'জাতিস্মর' শান্তিদেবী নামে।

শান্তিদেবীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর দিল্লি শহরে। বাবা মার আদরের সন্তান হয়ে বেড়ে উঠছিলেন তিনি, কিন্তু তাঁর বয়স কিছুটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিল সমস্যা। শান্তিদেবীর মা অবাক হয়ে দেখতেন মেয়ে তাঁর খালি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। কোনোকিছুর সূত্র ধরে সে পৌঁছে যায় পূর্বজন্মের প্রসঙ্গে এবং তাঁদের সামনে তুলে ধরে অদ্ভুত সমস্ত তথ্য। গোড়ার দিকে তিনি এগুলো কে শিশুর কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতেন, কিন্তু কালে কালে তিনি বুঝলেন, না, তাঁর মেয়ে যে সমস্ত কথাগুলো বলে তা তো ঠিক কোনও বাচ্চার মস্তিষ্কপ্রসূত হতে পারে না।শান্তি দেবীর যখন ন' বছর বয়স হল তখন তিনি ঘোষণা করলেন, গত জন্মে তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল মথুরাতে, সেখানে সবাই তাঁকে ডাকতেন 'লুগডি' বলে। যদিও স্বামীর নাম তিনি তক্ষুনি বললেন না। এভাবে কেটে গেল আরও কিছুদিন। হঠাৎ শান্তিদেবী ফের বলে বসলেন আগের জন্মে তাঁর স্বামীর নাম নাকি ছিল পণ্ডিত কেদারনাথ চৌবে। এমনকী তাঁর চেহারার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাও তিনি দিলেন। ইতিমধ্যে তাঁর এক আত্মীয় ঠিক করেছিলেন তাঁর কথাগুলো যাচাই করে দেখবেন। সেই হিসেবে তিনি মথুরায় কেদারনাথকে একটা চিঠিতে গোটা ঘটনাটা লিখে পাঠিয়ে দেন।

চিঠি পেয়ে তো কেদারনাথ ছুটতে ছুটতে দিল্লি এলেন। তারপর, তাজ্জব ব্যাপার। এমনও হয়? তাঁর দাম্পত্য জীবনের এমন কিছু কথা, যেগুলো একমাত্র তাঁর স্ত্রী ছাড়া কারুর পক্ষেই জানা সম্ভব নয়, সেগুলো অবলীলাক্রমে বলে দিলেন শান্তিদেবী। কেদারনাথের মেনে না নিয়ে উপায় রইল না যে ইনিই তাঁর স্ত্রী। তারপর সংবাদপত্রে শান্তি দেবীকে নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল। কালক্রমে গান্ধীজি জানতে পারলেন যে দিল্লিতে নাকি এক জাতিস্মরের আগমন ঘটেছে। ১৯৩৫ সালে তিনি নিজে গিয়ে দেখেও এলেন শান্তিদেবীকে। তারপর তাঁকে নিয়ে বিশেষ গবেষণার উদ্দেশ্যে ১২ জনের একটা কমিটি তৈরি করলেন। নামী সাংবাদিক থেকে আরম্ভ করে গবেষক নিয়ে সেই কমিটি ছিল রীতিমত ওজনদার।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে শান্তিদেবীকে নিয়ে মথুরা পৌঁছয়। নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে একটা গাড়িতে উঠে তাঁরা চালককে বলেন সেই কিশোরীর নির্দেশ মতো চালাতে। চৌড়াই ধরে চলতে শুরু করল গাড়ি। শান্তিদেবী বড় বড় চোখে জানালার বাইরে দেখেন এবং থেকে থেকেই বলে ওঠেন, 'আরে রাম, এখানেও বাড়ি উঠে গেছে? এ জমি তো আগে সন্নাটা ছিল।' কমিটির লোকজন চালককে জিগেস করেন, 'এ মেয়ে কি ঠিক বলছে?' চালক উত্তর দেন, 'মেয়ে একদম ঠিক বলছে, সত্যিই এ জমি আগে ফাঁকা ছিল। কিছুদিন আগে বাড়ি উঠেছে।' এই করতে করতে শান্তিদেবী সকলকে সঠিক পথ দেখিয়ে নিজের গতজন্মের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে গিয়ে হাজির করেন।

ইতিপূর্বে গতজন্মের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে শান্তিদেবী জানিয়েছেন যে শ্বশুরবাড়ির এক গোপন স্থানে একটা বাক্সের ভেতর তিনি কিছু টাকাপয়সা জমিয়ে রেখেছিলেন। এবার একজন গবেষক তাঁকে বলেন, 'দেখি তো সেই বাক্স বের করতে পার কিনা।' শান্তিদেবী এক সেকেন্ডও বিলম্ব না করে সোজা বাড়ির কাঠের মেঝের তলা থেকে বের করে আনেন সেই বাক্স। কিন্তু বাক্স খুলে দেখা যায় ভেতরে যে একটা পয়সাও নেই। কেদারনাথ তখন মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন, 'ওর মৃত্যুর পর আমিই বাক্স থেকে টাকাগুলো সরিয়েছিলাম।'

শান্তিদেবীর আচরণের কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বড় বড় তাত্ত্বিকরা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতে শুরু করলেন। ১৯৫৮ সালে এক সাংবাদিককে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন নিজের জীবন নিয়ে। পৃথিবীর মানুষ জাতিস্মরের গল্প জানতে পারলেন আরও বিশদে। তারপর ১৯৮৭ সালে ৬১ বছর বয়সে দুই জন্মের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ভারতবর্ষের 'ওয়ান্ডার ওম্যান' শান্তিদেবী।

তথ্যঋণ: 'জাতিস্মর' শান্তি দেবীর জন্য কমিটি গড়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী: নীহারেন্দু বন্দোপাধ্যায়: খবরের কাগজ

শান্তিদেবী কি সত্যিই জাতিস্মর? গবেষণায় আগ্রহী খোদ গান্ধীজিও: শুভজিৎ বন্দোপাধ্যায়: prohor

চিত্র ঋণ: wikipedia

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।