শিবরাজকে ছেঁটে মোহনের হাতেই মধ্যপ্রদেশের ভার! নেপথ্যে বিজেপির ঠিক কোন অঙ্ক?
MP CM Mohan Yadav: ১৮ বছর মুখ্যমন্ত্রীর পদ সামলেও মধ্যপ্রদেশের গদির লড়াই থেকে ছিটকে গেলেন শিবরাজ সিংহ চৌহান। তার বদলে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হলেন মোহন যাদব।

ছত্তীসগঢ়ে বাদ পড়েছেন রমন সিং, রাজস্থানে রেস থেকে ছিটকে গিয়েছেন বসুন্ধরা রাজেও। মধ্যপ্রদেশেও ব্যতিক্রম হল না। লম্বা রেসের ঘোড়াদের পাল্টে নতুন মুখেদেরই ২০২৪ লোকসভা ভোটের আগে সামনে আনতে চাইছে বিজেপি। তাই ১৮ বছর মুখ্যমন্ত্রীর পদ সামলেও মধ্যপ্রদেশের গদির লড়াই থেকে ছিটকে গেলেন শিবরাজ সিংহ চৌহান। তার বদলে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হলেন মোহন যাদব।
পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে তিনটি রাজ্যেই ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। তিনটি রাজ্যেই মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে মাপা কদম ফেলেছে বিজেপি। এই প্রথমবার, তিনটি রাজ্যেই মুখ্য়মন্ত্রী নির্বাচনের জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব। তারা সেই জেলায় গিয়ে রীতিমতো খুঁটিয়ে দেখে বেছে নিয়েছেন একটি নাম। মুখ্যমন্ত্রীর লড়াইয়ে প্রাথমিক ভাবে ছিলেন অনেকেই। তবে তাঁদের পিছনে ফেলে শেষপর্যন্ত একটি নাম বেছে নিয়েছেন সেই কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক দল।
মধ্যপ্রদেশে আঠেরো বছর রাজত্ব সামলেছেন শিবরাজ সিং চৌহান। বিজেপির বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিত সেই শিবরাজকেই এবার ছেটে ফেলে দিল বিজেপি নেতৃত্ব। স্বাভাবিক ভাবেই শিবরাজের জন্য় তো বটেই, মধ্যপ্রদেশ বিজেপির জন্যই ব্যাপারটা বেশ অবাক করার মতোই ছিল। তবে দলের কাছে নিজের জন্য কিছু চেয়ে নিতে নারাজ শিবরাজ। তেমনটাই জানিয়েছেন তিনি। এ নিয়ে দলের অন্দরে কথাবার্তা চলছিলই। অনেকেই ভেবেছিলেন, ৩ ডিসেম্বর ভোটের ফলাফল বেরোনোর পরে দিল্লি যাবেন শিবরাজ। তবে তেমনটা ঘটেনি। দিল্লির পরিবর্তে ছিন্দওয়ারা সফর করেন শিবরাজ, যেখানে কোনও আসন জিততে পারেননি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rajasthan CM: মঙ্গলবার জয়পুরের সর্দার পটেল মার্গে বিজেপির রাজ্য দফতরে বিজেপির সদ্যজয়ী বিধায়কদের বৈঠকে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক তথা ব্রাহ্মণ নেতা ভজনলাল শর্মার নাম ঘোষণা করলেন তিন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক।
মধ্যপ্রদেশের জয় নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিত ছিল কংগ্রেস। সেখান থেকেই জয় ছিনিয়ে এনেছে বিজেপি। যে জয়ের পিছনে শিবরাজ সরকারের 'লাডলি ব্যাহেনা' প্রকল্পের মতো একাধিক জনকল্যাণ প্রকল্পের হাত রয়েছে ভালোই। আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যের মহিলাদের ওই প্রকল্পের আওতায় মাসে ১২৫০ টাকা করে ভাতা দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ সরকার। স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যে বিশেষত মহিলা ভোটারদের ক্ষেত্রে একটা কি-ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে শিবরাজের এইসব জনকল্যাণ প্রকল্প। সেই শিবরাজ যে পুনর্বার সিংহাসনে বসবেন না, তা ছিল ভাবনাচিন্তার বাইরে। তবে তেমনটাই ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী রেস থেকে ছিটকে গিয়েছেন শিবরাজ। চারবারের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ জানিয়েছেন, দল তাঁকে যে কাজ দেবেন, সেই দায়িত্বই তিনি নিষ্ঠাভরে পালন করবেন। তিনি এ-ও জানান, বিজেপি একটি মিশন, এখানে প্রত্যেক কর্মীর কিছু কাজ রয়েছে। শিবরাজ এ-ও জানান যে বিশ্বাস করেন, মোহন যাদবের নেতৃত্বেও একই ভাবে গড়াবে মধ্যপ্রদেশের উন্নতির চাকা। তাঁর সমর্থন সবসময়ে মোহনের সঙ্গে রয়েছে বলেও জানান শিবরাজ।

শিবরাজ জমানায় মধ্যপ্রদেশে বহু উন্নয়নমূলক কাজ যে হয়েছে, তা অস্বীকার করার জায়গা নেই। শুধু জনকল্যাণ প্রকল্পই নয়, একই সঙ্গে রাস্তাঘাট, আলো, বিদ্যুৎসরবাহ, কৃষির উন্নতি, সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। ২০২৩-র বিধানসভা ভোটে জিতে বিজেপির তরফ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেছেন মোহন যাদব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে। বছর ৫৮-র মোহন দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) থেকে উঠে এসেছেন মোহন। আর মধ্য়প্রদেশের তখতে বসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কি-ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে সেটাই, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা। রাজ্যের আঞ্চলিক এবং বর্ণ সমীকরণের কথা মাথায় রেখেই মধ্যপ্রদেশের মালওয়া-নিমার অঞ্চলের উজ্জয়িন দক্ষিণের বিধায়ক মোহন যাদবকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি-শাহরা। মনে রাখতে হবে, মধ্যপ্রদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে কিন্তু রয়েছেন ওবিসি-রা। পাশাপাশি দীর্ঘদিব ধরেই শিবরাজ সিংহ চৌহানের ঘনিষ্ঠ মোহন যাদব। এর আগে তাঁর মন্ত্রিসভায় উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফলে মোহনকে মধ্যপ্রদেশের মুখ্য়মন্ত্রী করার পিছনে যে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে ভবিষ্য়তের কথা মাথায় রেখে পদক্ষেপ করছে বিজেপি, তা আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Revanth Reddy, Telangana: অনুগামী-সমর্থকদের কাছে তাঁর পরিচয় টাইগার রেবন্ত। বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে সোনিয়া গান্ধি, রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধির যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

২০১৩ সালে প্রথম বার ভোটে দাঁড়ান মোহন। সেইবারই প্রথম বিধায়ক হন তিনি। ২০১৮ সালের ভোটে ফের জয়ী হন। ২০২০ সালে শিবরাজ সিংহ চৌহানের মন্ত্রী হিসেবে সরকারে যোগ দেন মোহন যাদব। সে সময় কমলনাথ সরকারকে গদিচ্য়ুত করে ফের ক্ষমতা হাতে নিয়েছিল বিজেপি। সেই সময়ই সম্ভবত বিজেপিতে নিজের জায়গাটা মজবুত করে ফেলেছিলেন মোহন। শৈশব থেকেই সংঘের স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন তিনি৷ ১৯৮২ সালে, তিনি সংঘের ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)-তে যোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু তাঁর রাজনৈতিক পথচলা। ১৯৮২ সালে মাধব সায়েন্স কলেজের ছাত্র সংগঠনের সহ-সম্পাদক এবং ১৯৮৪ সালে সভাপতি হন। সে বছরই এবিভিপি উজ্জয়নের সিটি মিনিস্টাক ও ১৯৮৮ সালে মধ্যপ্রদেশ এগজিকিউটিভ ও ন্যাশনাল এগজিকিউটিভের সদস্য হন। এর পরে, তিনি ১৯৮৯-৯০ সাল নাগাদ বিদ্যার্থী পরিষদের রাজ্য ইউনিটের মন্ত্রী এবং 1991-92 সালে ন্যাশনাল মিনিস্টার অব কাউন্সিল হন। সেই ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ এতগুলি বছর ধরে আরএসএসের সঙ্ঘসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন একটানা।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এবার বিজেপির হাতে আসা তিন রাজ্যেই মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই রকম রাস্তা, একই রকম ধাঁচ অবলম্বন করেছে বিজেপি। পুরনো শিকড় উপড়ে নতুন মুখের হাতেই যে শুধু রাজ্যের ক্ষমতা তুলে দিয়েছে তারা, তাই নয়। রয়েছে প্যাটার্নগত আরও কিছু মিল। রাজস্থানে বেছে নেওয়া হয়েছে ব্রাহ্মণ নেতা ভজনলালকে। ছত্তীসগঢ়ে ক্ষমতায় এসেছেন সাঁওতাল নেতা বিষ্ণুদেব সাঁই। অন্য়দিকে, মধ্যপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রীর পদ মিলেছে ওবিসি সম্প্রদায় থেকে আসা মোহন যাদব। তিন ক্ষেত্রেই যে রাজ্যের অবস্থান, জনসংখ্যা ও সেখানকার পটভূমির কথা মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী বাছা হয়েছে, সেই প্যাটার্নটি বুঝতে খুব অসুবিধা হয় না। পাশাপাশি একটু খুঁজলেই জানা যাবে, এই তিন বিজেপি নেতার শিকড়ই কিন্তু রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘে। এর মধ্যে কেউ আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবক, তো কেউ আরএসএসের ছাত্রশাখা এবিভিপি-র সঙ্গে ছাত্রাবস্থা থেকে জড়িত। সব মিলিয়ে তিন রাজ্যেই মুখ্যমন্ত্রীরে চেয়ারে বসেছেন আরএসএস ঘনিষ্ঠ বিজেপি নেতাই।
রাজ্যগুলিতে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২০২৪ লোকসভা ভোটের কথা যে মাথায় রেখেইছেন মোদি-শাহরা, তা তো জানা কথাই। তবে এই সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনও না কোনও ভাবে যে আরএসএস ফ্যাক্টর কাজ করেইছে, তা কিন্তু চোখ বুজে বলাই যায়। এই তিন রাজ্যে উদীয়মান এই তিন বিজেপি নেতারই কিন্তু আগে মুখ্যমন্ত্রীত্ব সামলানোর কোনও অভিজ্ঞতা নেই। এরমধ্যে রাজস্থানের ভজনলাল শর্মা তো আবার প্রথমবারের জয়ী। ছত্তিশগড়ের বিষ্ণুদেব সাই চারবার সাংসদ, দু'বার বিধায়ক, দু'বার রাজ্য সভাপতি এবং একবার কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। মধ্যপ্রদেশে মোহন যাদব তৃতীয়বারের মতো বিধায়ক হয়েছেন এই বার। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর পদ ঠিক কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারবেন বিজেপির এই তিন নতুন মুখ, সেটাই দেখার। আদৌ এই মন্ত্রেই কি বধ হবে ২০২৪ লোকসভা ভোট, চোখ থাকবে সেদিকেও।







