গাছের প্রাণ থেকে ছুটি বা কাবুলিওয়ালা, বিশ্বের দরবারে নিবেদন নিবেদিতার

Susen
৪ মিনিট
গাছের প্রাণ থেকে ছুটি বা কাবুলিওয়ালা, বিশ্বের দরবারে নিবেদন নিবেদিতার

সাক্ষর সেনগুপ্ত: তাঁর আশ্চর্য সুন্দর লেখনী আন্তর্জাতিক স্তরে বৈজ্ঞানিক মহলে পৌঁছে দিয়েছিল সেই অপার বিস্ময়ের তথ্য, গাছেরও প্রাণ আছে। গীতাঞ্জলি পর্বের অনেক আগেই কবির তিনটি ছোট গল্প ইংরাজি ভাষার পাঠকদের কাছে উপস্থাপিত হয়েছিল তারই হাতের ছোঁয়ায়। উদ্ভিদের প্রাণ বিষয়ক বিজ্ঞানীর লেখা প্রবন্ধ অবশ্য আগে পাঠানো হয়েছিল রয়াল সোসাইটির পত্রিকায়। কিন্তু রহস্যময় কারণে সে লেখাটি প্রকাশিত হয়নি। ১৯০২ সালের ১ মে বন্ধুবর কবিকে একটি চিঠিতে বিজ্ঞানী লেখেন, ".....এই যে Royal Society-তে গত বৎসর মে মাসে Plant Response সম্বন্ধে লিখিয়াছিলাম তাহা Waller and B. Sanderson চক্রান্ত করিয়া Publication বন্ধ করিয়া দিলেন।" এর পরেই জগদীশচন্দ্র সিদ্ধান্ত নেন বিদেশি পত্র-পত্রিকার মুখাপেক্ষী না থেকে নিজের গবেষণা বইয়ের আকারে তিনি নিজেই প্রকাশ করবেন। আর এই পরিকল্পনা থেকেই শুরু হয় Response in the Living and Non living -এর কাজ।

চিত্রঋণ : Googleপরিকল্পনা তো নিলেন, কিন্ত নানা গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চার অন্যান্য কাজে ব্যস্ত বিজ্ঞানীর জন্য গ্রন্থের সম্পাদনা ও পরিমার্জনার কাজটি কে করবেন? যাবতীয় দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নিজের কাঁধে তুলে নেন মার্গারেট নোবেল। এদেশে অবশ্য ততদিনে তিনি বিশিষ্ট জনেদের মধ্যে যথেষ্ট পরিচিত ভগিনী নিবেদিতা নামে। বিজ্ঞানীর ওই বই প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর গবেষণার যন্ত্রপাতি কেনা আর লেখার কাজে সহায়তা করার জন্য নিবেদিতার জীবনযাপনের সমস্ত অর্থের যোগান দিয়েছিলেন সারা বুল। এক ধনী মার্কিন পরিবারের কন্যা মিসেস বুল অবশ্য বিজ্ঞানীর কাাজে অর্থ সাহায্যের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিবেদিতারই অনুরোধে। আমেরিকান এই ভদ্রমহিলাই সেই সময় জগদীশচন্দ্রের জন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজের ব্যবস্থা করা আবার গবেষণার কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের আয়োজনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। দুই তরফের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের জন্য অনুঘটক হিসাবে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি যে বিজ্ঞানীর দ্বিতীয় গ্রন্থ Plant Response as a means of Physiological Investigation -এর কাজ শুরুর সময় সারা বুল নিজেই জগদীশচন্দ্রকে অনুরোধ করেন যে নিবেদিতাকে যেন লিটারারি এগজিকিউটর হিসাবে নিয়োগ করা হয়। ১৯০৫ সালের ১২ জুন বিজ্ঞানীকে একটি চিঠি লেখেন মিসেস বুল, বেলুড় মঠের সন্ন্যাসীদের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন ধীরামাতা নামে। ওই চিঠিতে তিনি বিজ্ঞানীকে জানান, নিবেদিতা যতই ত্যাগ ও সেবার কাজে আগ্রহী হোন না কেন তাঁর জন্য একটা আর্থিক সংস্থানও থাকা প্রয়োজন।

জগদীশচন্দ্রের ওই গ্রন্থ রচনার কাজে নিবেদিতা কতটা ব্যাস্ত থাকতেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর চিঠিপত্রেই। ১৯০৫ সালের ২২ নভেম্বর বন্ধু জোসেফিন ম্যাকলিয়ডকে নিবেদিতা লিখছেন, " We are gradually finishing the gigantic labour of Brain"s book on Botany. We are now working over the conclusion and will hope by his birthday on the 30th to have put in the inevitable extra discoveries and even the Introduction." Brain, হ্যাঁ এই নামে বিজ্ঞানীকে ডাকতেন মার্গরেট নোবেল। কিভাবে এগিয়েছিল বই লেখার কাজ ? নিবেদিতার জীবনীকার লিজেল রেঁম জানিয়েছেন, জগদীশচন্দ্র তাঁর মনের ভাবগুলির খসড়া একটি কাগজে লিখে রেখে যেতেন। আর পরদিন এসে দেখতেন সেগুলি যথাযথ ভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। আবার লেখার বিষয়ে তর্কাতর্কিও হত দুজনের মধ্যে। রেঁমর লেখায় আছে ছুটিতে তৎকালীন যুক্তপ্রদেশ অধুনা উত্তরাখণ্ডের মায়াবতীতে গিয়ে শুরু হয় লেখালেখির কাজ। নিবেদিতা চান ভাব আর ভাষার সামঞ্জস্য। কিন্তু বিজ্ঞানী অনেক ক্ষেত্রেই তা বুঝে উঠতে পারেন না। ক্ষুব্ধ জগদীশচন্দ্র বলছেন, "যে অধ্যায়টি লিখেছেন ওটা ছিঁড়ে ফেলব আমি। আমার ভাবনার ধারা ওইরকম নয়।" আর নিবেদিতার জবাব, "সেটা যদি কর তো আমি চললাম। আমি কেবল তোমার চিন্তাগুলি যথা সম্ভব সহজ কথায় বিবৃত করেছি। আর কথাকেই তোমার ভয়।" দুজনের মেজাজ দেখে শঙ্কিত হয়ে ওঠেন বসুজায়া অবলা দেবী। তাঁদের ঠাণ্ডা করার জন্য নিয়ে আসা হয় চায়ের পেয়ালা। এই গ্রন্থ পরিমার্জনা আর সম্পাদনার কাজ নীরবেই করতে চেয়েছিলেন নিবেদিতা। এজন্য জোসেফিনকে লেখা সেই ২২ নভেম্বরের চিঠিতেই তিনি জানিয়েছিলেন, কোথাও যেন ঘুণাক্ষরে একথা প্রকাশ না পায় যে তিনি বিজ্ঞানীর গ্রন্থের কাজের সঙ্গে যুক্ত। একই কথা তিনি জগদীশচন্দ্রকেও বলেছিলেন। জানালেন নিবেদিতার জীবনী বিষয়ক গ্রন্থ লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত।

শুধু বিজ্ঞানীই নয় অসাধারণ এই ব্যক্তিত্বময়ীর সহযোগিতা কবিও পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পগুলি অনুবাদ করিয়ে পাশ্চাত্যের পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটা উদ্যোগ জগদীশচন্দ্র নিয়েছিলেন। ১৯০০ সালের ২ নভেম্বর বিদেশ থেকে লেখা চিঠিতে বিজ্ঞানী তাঁর প্রিয় কবিকে জানাচ্ছেন. "তোমার গল্পগুলি আমি এদেশে প্রকাশ করিব। লোকে তাহা হইলে কতক বুঝিতে পারিবে। আর ভাবিয়া দেখিও, তুমি সার্ব্বভৌমিক।" কাবুলিওয়ালা, ছুটি আর দেনাপাওনা এই তিনটি গল্প অনুবাদের জন্য বেছে নেন জগদীশচন্দ্র। আর এবারেও তাঁদের এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে কে পাশে থাকবেন ? যথারীতি ভগিনী নিবেদিতা। ওই ১৯০০ সালের ২৯ নভেম্বর সারা বুলকে লেখা চিঠিতে নিবেদিতা জানান, The "Cabuliwalah", and "Leave of Absence" are both Englished now, and I have "Giving and, Giving in Return" ready for the last finish. কেমন হয়েছিল সেই অনুবাদ? গল্পগুলি প্রকাশিত হওয়ার পর বিজ্ঞানী তাঁর কবি বন্ধুকে লিখছেন, "তোমার লেখা তরজমা করিয়া এদেশীয় বন্ধুদিগকে শুনাইয়া থাকি, তাঁহারা অশ্রু সম্বরণ করিতে পারেন না।" হয়তো সেজন্যই তাঁর মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণে জগদীশচন্দ্র বলেথিলেন, "দধীচির মত আত্মবলিদান, উমার মত তপস্যা, যা পুরাণে বা কাব্যে বর্ণনা শুনেছি-- তাঁর জীবনে প্রত্যক্ষ করেছি। ঈশ্বরের পাদপদ্মে ভারতবর্ষের কল্যাণের জন্য তিনি সর্বতোভাবে নিজেকে নিবেদন করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সঠিক নামকরণ করেছিলেন ---নিবেদিতা।" শুধু মুখের কথা নয়, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে যেন অন্তরের আবেগের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন বিজ্ঞানী। জগদীশচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রবেশপথেই রয়েছে জপমালা হাতে এক নারীর রিলিফ মূর্তি। বলে না দিলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না -- সে নারী নিবেদিতাই। আর বিজ্ঞান মন্দিরের ফোয়ারাটির নীচে রাখা রয়েছে তাঁর চিতাভস্ম, বিজ্ঞানীর কাছে যে ব্যক্তিত্বময়ী যেন আত্মবলিদানের প্রতীক।

তথ্যসূত্র- জ্বলিছে ধ্রুবতারা - রন্তিদেব সেনগুপ্ত , নিবেদিতা লোকমাতা -শঙ্করীপ্রসাদ বসু, নিবেদিতা-- ঃলিজেল রেমঁ ( অনুবাদ - নারায়ণী দেবী)

লিখেছেন
Susen
Susen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।