'সামান্য' ছবির অসামান্য কয়েকটি গল্প

Amit Pratihar
৪ মিনিট
'সামান্য' ছবির অসামান্য কয়েকটি গল্প

প্রতিটা ছবির অন্তত একটা করে গল্প থাকে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে চোখের সামনে ভেসে আসে এমন কিছু ছবি যার নেপথ্যের গল্পগুলো ভয়ঙ্কর, আশ্চর্যজনক এবং অস্বাভাবিকও বটে। ছবির দিকে আপাতদৃষ্টিতে তাকালে মনে হবে, 'কই! কিছুই তো নয়, সবই তো ঠিক আছে'- কিন্তু ছবিটির গল্প শুনলে জানলে বিস্মিত হওয়া ছাড়া অন্য পথ খোলা থাকে না!

১. মৃতকে পাশে বসিয়ে ছবি তোলা:

আলোকচিত্রবিদ্যা বা ফটোগ্রাফি সাধারণ মানুষদের জীবনে প্রথম পা রাখে ১৮৩৯ সালের শুরুর দিকে। সেই সময় ছবি তোলা ছিল একটি ব্যায়বহুল ব্যাপার, কারণ ছবি তোলার পর সেটি ছাপা হতো একটি রুপো এবং কপারের প্লেটে। এই সময় ছবি তোলা ছিল ধৈর্য্যের পরীক্ষা দেওয়ার মতোই। কারণ একটি ছবি তুলতে গেলে যার বা যাদের ছবি তোলা হচ্ছে তাকে বা তাদের অন্তত ১৫ মিনিট না নড়াচড়া করে একইভাবে ক্যামেরার সামনে উপস্থিত থাকতে হতো।

এই ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন পিতামাতা এবং তাঁদের মেয়েকে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সুন্দর পারিবারিক ছবি হলেও, ছবির গল্পটি স্বাভাবিক নয়। ১৮০০ শতাব্দীতে বিভিন্ন রোগের প্রকোপে মৃত্যুর হার খুবই বেড়ে গিয়েছিল মানবসমাজে। কলেরা ছিল সেইসব রোগগুলির মধ্যে অন্যতম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগিরা বাড়িতেই মারা যেতেন নিজেদের আত্মীয় পরিজনদের মাঝেই। ফলত সাধারণ মানুষের কাছে মৃত্যু একটি খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। আমরা আজকাল প্রিয়জনের বিয়োগে যেভাবে কেঁদে উঠি, উদাস হয়ে উঠি সেই যুগে ব্যাপারটা একইরকম ছিল না। ঠিক এই সময়েই সাধারণ মানুষের হাতে আসে আলোকচিত্রবিদ্যা। এবং একটা অদ্ভুত অভ্যাস শুরু হয় সমাজে। পরিবারের অত্যন্ত প্রিয় সেই মানুষটির ছবি তুলে রাখা, যিনি ইতিমধ্যেই মারা গিয়েছেন কিংবা যিনি অত্যন্ত মুমুর্ষ এবং যে কোনও মুহূর্তে মারা যেতে পারেন। এই ক্ষেত্রে মৃতদেহটিকে বা মুমূর্ষ ব্যক্তিটির সঙ্গে একই ফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকতেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। মৃতদেহটিকে বা অসুস্থ ব্যক্তিকে সোজাভাবে ধরে রাখতেন দু'জন ব্যক্তি। ছবি উঠে যেত। এই প্রথাটি সেই সময় খুবই জনপ্রিয় হয়। প্রিয়জনের স্মৃতি আঁকড়ে রাখার এই প্রথা আজকের দিনে হয়তো খুবই অদ্ভুত লাগে, ভয়ঙ্কর লাগে। কিন্তু সেই সময় এটাই ছিল রীতি। উপরের ছবিটিতে যে বাচ্চা মেয়েটিকে তার বাবা এবং মা দু'দিক থেকে ধরে রেখেছেন তিনি হয়তো ইতিমধ্যেই মারা গিয়েছিলেন অথবা যে কোনও মুহূর্তে মারা যাবেন এরকম সময়ে তোলা। এবার আরেকবার তাকান ছবিটির দিকে!

২. মেক্সিকোতে মমি!:

চিত্রঋণঃ গুগলসাধারণত মমি শুনলে মনে পড়ে মিশরের কথা। কিন্তু মেক্সিকোতে মমি? ব্যাপার কী? ছবিটি মেক্সিকোর একটি ছোট্ট শহর গুয়ানাজুয়াতোর মিউজিয়ামের ভিতরে তোলা। ছবির মধ্যে যে মমিগুলোকে দেখা যাচ্ছে তাদের প্রত্যেককেই জীবিত অবস্থায় মমি বানানো হয়েছিল, তাই তাদের চোখে মুখে লেগে আছে স্পষ্ট ভয়, আতঙ্ক, বিভীষিকার ছাপ। কিন্তু কেন এই অত্যাচার? ১৮৩৩ সালে এই ছোট্ট শহরে হানা দেয় এক অজানা মহামারী। মানুষের পর মানুষ মরতে শুরু করে। মহামারীটি এতটাই ছোঁয়াচে ছিল যে, পরিবারের পর পরিবার আক্রান্ত হয়ে পড়ছিল। মানুষ ভয়ে দিশেহারা হয়ে যায়। নিজেদের প্রাণ রক্ষার চেষ্টায় তারা রোগিদের বাঁচানোর চেষ্টা না করে, জীবন্ত অবস্থায় কফিনে ঢুকিয়ে দেয়। মহামারীটির নাম ছিল কলেরা। কিছু দিন পর যখন শহরে আবার সব ঠিক হয়ে যায়, তখন শহরের জনসংখ্যা কমে গিয়েছে অর্ধেকেরও বেশি। ১৮৭০ সালে এই মমিগুলো নিয়ে একটি মিউজিয়াম খোলা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই মিউজিয়াম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

৩. অপরাধ ঢাকতে প্লাস্টিক সার্জারি:

চিত্রঋণঃ গুগলজন ডিলিঙ্গার, ১৯৩৪ সালে এই নামের এক ব্যক্তি ছিলেন আমেরিকান পুলিশদের চোখে সব থেকে মারাত্মক আসামী। সারা দেশজুড়ে যখন তাকে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হচ্ছে গ্রেফতারের জন্য, তখন তিনি শিকাগোতে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন আত্মরক্ষার্থে। এই সময়েই তিনি পুলিশদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মাথা থেকে বার করেন এক অদ্ভুত বুদ্ধি। নিজের আত্মপরিচয় লোকানোর বুদ্ধি। কিন্তু কীভাবে? প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নিজের মুখ এবং হাতের ছাপ বদলে ফেলে। যা ভাবা তাই কাজ। তিনি ৫০০০ ডলারের বিনিময়ে এক জার্মান ডাক্তারের কাছে করে নেন প্লাস্টিক সার্জারি। হাতের ছাপ বদলে ফেলার জন্য সেই ডাক্তার হাতের পাতার ওপরের স্তরটি কেটে বাদ দিয়ে দেন। ডিলিঙ্গার বহুদিন অবধি নিজের হাত দুটি ব্যবহার করতে পারেননি এই অপারেশনের পর। পরে ডিলিঙ্গারের হাতের পাতার ওপরের স্তর ফের তৈরি হয়ে যায়, এবং তা পুরানো হাতের ছাপের থেকে প্রায় পুরোটাই আলাদা রকমের হয়। অবশ্য এতকিছুর পরেও পুলিশের হাতে থেকে বাঁচতে পারেননি ডিলিঙ্গার। পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি শিকাগোতে।

৪. ভালোবাসার 'অপরাধে' ২৫ বছর মেয়েকে অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রাখলেন মা:

চিত্রঋণঃ গুগলকাউকে ভালোবেসে কেউ কতদিন অবধি শাস্তি পেয়েছে? প্রশ্নটা মাথায় এলে তার উত্তর খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে যেতে হয় বালাঞ্চে মোনিয়ার নামক এক ফ্রেঞ্চ মহিলার এই ছবিটির কাছে। এই ছবিটির পিছনে লুকিয়ে আছে এক মারাত্মক মর্মান্তিক অত্যাচারের গল্প। বালাঞ্চে মোনিয়ার ১৮৪৯ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন পইটিয়ার্সে। তাঁর শৈশব এবং ছোটবেলা কাটে খুবই সুখে। অত্যন্ত স্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় মোনিয়ার দুঃখের স্বাদ তখনও চেনেননি। জীবনের ২১'টা বছর কাটিয়ে ফেলার পর, মোনিয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার। ১৮৭৪ সালে তার পরিচয় হয় এক বয়স্ক উকিলের সঙ্গে। তাঁরা একে অপরের প্রেমে পড়ে যান। বিয়ে করতে চান। কিন্তু বেঁকে বসেন মোনিয়ারের মা। ছেলেটি নিচু জাতের হওয়ায় তিনি বিয়ে দিতে রাজি হন না এবং মোনিয়ারকে বলেন ছেলেটিকে ভুলে যেতে। কিন্তু মোনিয়ার কর্ণপাত করেন না মায়ের কথায়। ফলস্বরূপ মোনিয়ারের নির্মম মা একদিন মোনিয়ারকে বন্ধ করে দেন একটি ছোট্ট জানলাহীন অন্ধকার ঘরের ভিতর। সেখানে তাঁকে শুধু রাতের খাবার দেওয়া হতো। মাসের পর মাস কেটে যায় এ'ভাবেই, কিন্তু মোনিয়ার হার মানেন না। তিনি নিজের ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গেই থাকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। ধীরে ধীরে কেটে যায় বছরের পর বছর। মোনিয়ারের ভালোবাসার মানুষটি মারা যান। তবুও বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান না মোনিয়ার। তাঁর মা তাঁকে ২৫ বছর ধরে ওই ছোট্ট অন্ধকার ঘরটিতে বন্দি রাখেন।

১৯০০ সালে পুলিশ এই নির্মম অত্যাচারের খবর পেয়ে উদ্ধার করে বালাঞ্চে মোনিয়ারকে। মোনিয়ারের মা এবং ভাইকে পুলিশ গ্রেফতার করে। মোনিয়ারের মা পুলিশের হেফাজতেই ১৫ দিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করেন। ভাই কিছুদিন পর ছাড়া পেয়ে যায়। মোনিয়ারের বাকিটা জীবন কাটে মানসিক রোগিদের সঙ্গে একটি হাসপাতালে। ওপরে বালাঞ্চে মোনিয়ারের ছবিটি বন্দিদশার আগের এবং বন্দিদশার পরের।

তথ্যসূত্র:

http://blog.hmns.org/2017/10/post-mortem-photography-in-the-victorian-era-as-still-as-the-dead/

https://allthatsinteresting.com/creepy-pictures

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।