নোনা জমিতেই ফলবে 'সোনা', এই বিশেষ ধানের হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন সুন্দরবনের চাষিরা
Salt tolerant Paddy Cultivation Sundarbans : সুন্দরবন ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এই ধানের চাষই শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে ফলনও দিচ্ছে, কৃষকরাও নতুন করে উৎসাহ পাচ্ছেন।

আয়লা, আমফান, ইয়াস – বিগত কয়েক বছরে একের পর এক সাইক্লোন দেখেছে পশ্চিমবঙ্গ। ঝড়-ঝঞ্ঝায় বিপর্যস্ত হয়েছে জনজীবন। কোথাও বাড়ি ভেঙেছে, কোথাও জল জমে থেকেছে দিনের পর দিন। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে সুন্দরবন ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সাম্প্রতিক সময় প্রথমে আমফান, তারপর ইয়াস – জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি। অনেক জায়গা জলের নিচে চলে গিয়েছে। সেইসঙ্গে সাইক্লোনের জেরে সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে পড়েছে স্থলভাগে।
এই শেষ জায়গাতেই মাথায় হাত পড়েছিল মানুষের। সুন্দরবন, দক্ষিণ ২৪ পরগণার অজস্র মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। সেখান থেকেই সংসার চলে কোনওমতে। এদিকে সাইক্লোনের তাণ্ডবের ফলে নদীবাঁধ ভেঙে যায়। সমুদ্রের নোনা জল সরাসরি ঢুকে পড়ে মাঠে। এলাকার পর এলাকা জলের তলায় থাকে দীর্ঘদিন। নোনা জলের নিচে চলে যায় চাষের জমি। ফলে মাটিও লবণাক্ত হয়ে যায়। কেবল ফসল নষ্ট নয়, নোনা ভাবের ফলে জমির উর্বরতাও নষ্ট হয়েছে অনেকটা। তাহলে এমন জমিতে চাষ কী করে হবে? এত কষ্টের সংসার আরও শেষ হয়ে যাবে? মাথায় হাত পড়ে কৃষকদের।
পরিসংখ্যান বলছে, একের পর এক সাইক্লোন তাণ্ডবের জেরে পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, দুই ২৪ পরগণা, হুগলি জেলা মিলিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ হেক্টরেরও বেশি জমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যার মূল কারণ নোনা জলের প্রবেশ। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এদিকে পরিবেশবিদদের বক্তব্য, আগামী দিনে এই সাইক্লোনকে সঙ্গী করেই আমাদের বাঁচতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বুকে এরকম আরও ঝড় তাণ্ডব চালাবে। এমন খবর শুনেই মাঠে নামে রাজ্যের কৃষি দফতর। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নোনা মাটিতেই যদি চাষাবাদ করা যায়, সেই পরীক্ষা নিরীক্ষার পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রশাসন।
অবশেষে শিরদাঁড়া সোজা করে লড়াইয়ের পথে ফিরল সুন্দরবনের কৃষকরা। সৌজন্যে, নোনা স্বর্ণ ধান। ২০২১ সাল থেকেই এই ধান নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়। সুন্দরবনের বেশকিছু জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষও শুরু হয়। এর বিশেষত্ব হল, নোনা জমিতেও এই ধান দিব্যি চাষ করা যায়। প্রথমে অবশ্যই সমুদ্রের জল বের করে দিতে হবে। তারপর নোনা মাটি এক দু’বার সাধারণ মিষ্টি জল দিয়ে ধুয়ে নিলেই তৈরি। এই ধান চাষে জলও খুব বেশি লাগে না। তাই সাইক্লোনের এমন তাণ্ডবের পরেও এই ধান চাষ করা যাবে।
সুন্দরবন ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এই ধানের চাষই শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে ফলনও দিচ্ছে। ফলে কৃষকরাও নতুন করে উৎসাহ পাচ্ছেন। যেমন ধরা যাক সুন্দরবনের সাগর ব্লকের কথা। ইয়াসের সময় এই ব্লকই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জমি নোনা জলে ভরে গিয়েছিল। সেখানেই প্রায় ৪০০ একর জমিতে এই বিশেষ স্বর্ণ ধানের চাষ শুরু হয়। তারপরই মেলে সাফল্য। বিঘাপ্রতি প্রায় ১২ মন ধান পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে কৃষকরা আরও উৎসাহিত হয়েছেন। এখন এই নোনা ধানের হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়ানোর শপথ নিয়েছে সুন্দরবন। কৃষকদের আশা, আর সাইক্লোনের সামনে মাথা নোয়াবেন না তাঁরা। বরং এই স্বর্ণ ধানই হবে তাঁদের হাতিয়ার।















