কবিতার ‘অভিশাপ’ পিছু ছাড়েনি শ্রীজাতর, গ্রেফতারির গুজবে জলঘোলা রাজনীতি

ব্রাত্য বসু ইনস্ক্রিপ্টকে শ্রীজাতর গ্রেফতারির নির্দেশ প্রসঙ্গে বলেন, "বিজেপি বাঙালি এবং বাংলা সাহিত্য জগতকে কী চোখে দেখে, তা প্রমাণিত হলো। সংস্কৃতি জগতকে তারা টুকরে টুকরে গ্যাং মনে করে। তারা জয় গোস্বামীকে এসাআইআরের লাইনে দাঁড় করিয়েছিল। শ্রীজাতকে তারা গ্রেফতার করতে চায়। হয়তো তৃণমূল ঘনিষ্ঠতার কারণে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা আবুল বশরকেও ওরা ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাতে পারে। শ্রীজাতকে যদি গ্রেফতার করা হয় বাংলায় বিজেপি নিশ্চিহ্ন হবে।"

inscript
৬ মিনিট
কবিতার ‘অভিশাপ’ পিছু ছাড়েনি শ্রীজাতর, গ্রেফতারির গুজবে জলঘোলা রাজনীতি

রাত পোহালেই রাজ্যে প্রথম দফার ভোট। আর ঠিক তার আগের মুহূর্তেই বুধবার শিরোনামে উঠে এলেন বাঙালি কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৭ সালের একটি পুরনো কবিতা সংক্রান্ত মামলার জেরে নাকি তাঁর বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে,খবর এমনই। তাঁর লেখা হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছে, তাই গ্রেফতারির পরোয়ানা! এই খবর নিয়ে হইচই পড়ে যায় গোটা বাংলায়। সমালোচনার ঝড় ওঠে সর্বত্র। দাবি করা হয়, শ্রীজাতর বিরুদ্ধে থাকা পুরনো একটি মামলার প্রেক্ষিতেই নাকি এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই নির্বাচন কমিশনের তরফে বলা হয়, এই খবর ভুয়ো। ইলেকশন কমিশনের তরফে এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি বলেই জানা যায়।

https://www.facebook.com/share/p/1PxjDGR76n/

তবে ইলেকশন কমিশন এই খবর 'মিথ্যে' বলে নিশ্চিত করলেও, গুজবের ঝড় ওঠে সব স্তরে। এমনকী শ্রীজাতকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে বলেও রব ওঠে। বিভিন্ন জায়গায় এটাও শোনা যায়, কমিশন যুক্তি দিয়েছে ভোটের সময় কবির বয়ান বা উপস্থিতি থেকে প্ররোচনা ছড়াতে পারে এবং তাতে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নাকি এই নির্দেশ!

যদিও এসবের কিছুই সত্য নয় বলে জানিয়েছে ইলেকশন কমিশন। এই বিষয়ে কবি শ্রীজাত সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তিনিও শুনেছেন পরোয়ানা জারি হয়েছে। কিন্তু এখনও আদালত বা প্রশাসনের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হয়নি। তিনি কবিতা লিখেছেন, কোনো অন্যায় করেননি, তাই সমস্তরকম পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রস্তুত। তাঁর ভাবতে ভালো লাগে, কবিকে এখনও রাষ্ট্র ভয় পায়।

কবির বিরুদ্ধে এই গ্রেফতারির নির্দেশ খবর ছড়াতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সকলেই। বাংলার রাজনৈতিক মহল হোক বা সাহিত্য জগত— একে সহজভাবে নিচ্ছেন না কেউই। তাঁদের স্পষ্ট প্রশ্ন, কীভাবে একজন কবি বা সাহিত্যিকের বাকস্বাধীনতার উপর এমন আঘাত হানা হতে পারে?

সাধারণ মানুষও এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। ভোটের আগে এক সৃজনশীল ব্যক্তিত্বকে এভাবে আইনি জাঁতাকলে ফেলার নজির সচরাচর দেখা যায় না, যা নিয়ে তোলপাড় চলছে গোটা রাজ্যে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একটি বানান ভুলেই শেষ নাগরিক পরিচয়?

ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন এই অবস্থাকে একটি বৃহত্তর দার্শনিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন। ইতিহাসে এমন মানুষের অস্তিত্ব সবসময়ই ছিল, যাদের রাষ্ট্র পুরোপুরি তাড়িয়ে দেয়নি, আবার নাগরিক হিসেবে গ্রহণও করেনি। তাদের বলা হয় ‘হোমো স্যাক্যার’ (Homo Sacer)— অর্থাৎ এক ধরনের 'বাতিল মানুষ'।

বিশিষ্ট বাঙালি নাট্যকার ও রাজনীতিবিদ ব্রাত্য বসু এই প্রসঙ্গে ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন,

বিজেপি বাঙালি এবং বাংলা সাহিত্য জগতকে কী চোখে দেখে, তা প্রমাণিত হলো। সংস্কৃতি জগতকে তারা টুকরে টুকরে গ্যাং মনে করে। তারা জয় গোস্বামীকে এসাআইআরের লাইনে দাঁড় করিয়েছিল। শ্রীজাতকে তারা গ্রেফতার করতে চায়। হয়তো তৃণমূল ঘনিষ্ঠতার কারণে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা আবুল বশরকেও ওরা ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাতে পারে। শ্রীজাতকে যদি গ্রেফতার করা হয় বাংলায় বিজেপি নিশ্চিহ্ন হবে।

এই ঘটনায় ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ কবি সাহিত্যিক জয় গোস্বামীও। তিনি শ্রীজাতের পাশে দাঁড়িয়ে এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি ইনস্ক্রিপ্টকে বলেছেন,

আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। আমি সেই লেখা পড়েছি। সেই লেখা লেখার সমস্ত রকম স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক দেশে একজন কবির আছে। একজন কবিকে এভাবে গ্রেফতার করা যায় না। এটা খুব অন্যায় হচ্ছে শ্রীজাতের প্রতি এবং গণতন্ত্রের প্রতি।

২০১৭ সালেও ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরও এই একই শোনা যায় জয় গোস্বামীর মুখে। আজ ২০২৬ সালে আবারও যখন ওই একই প্রসঙ্গে সরগরম রাজ্য রাজনীতি, তখনও একই বক্তব্যে অনড় জয় গোস্বামী।

আমডাঙায় নির্বাচনী জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিশয় উল্লেখ করে বলেন,

আরে আজকে তো সকাল থেকে ফোন-মেসেজ পেয়ে পাগল হয়ে গেছি। শুনলাম শ্রীজাতকে নাকি ফোন করেছে কেউ, ‘আপনার বাড়িতে পুলিশ যাচ্ছে। আপনাকে গ্রেফতার করা হবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলাম শ্রীজাতকে। এ আবার কী! বাইক চলবে না। রেল বন্ধ। যা ইচ্ছে তাই করছে। মনে রাখবেন, আমার হাতে প্রশাসন নেই এখন। সব এগুলো ইলেকশন কমিশন করছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালে। শ্রীজাত ফেসবুকে ‘অভিশাপ’ নামে একটি কবিতা পোস্ট করেছিলেন।

আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –

কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!

সেই কবিতায় থাকা এই লাইন নিয়েই উত্তাল হয়ে ওঠে রাজ্য রাজনীতি। অভিযোগ ওঠে, এই কবিতা হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছে। সেই সময় শিলিগুড়িতে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) হয় এবং ২০১৯ সালে কৃষ্ণনগর আদালতে মামলা দায়ের করেন আইনজীবী রমিত শীল।

https://www.facebook.com/share/17ZbGGfDqD/

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে খবরটিকে 'ভুয়ো' বলে নিশ্চিত করা হলেও, ভোটের ঠিক আগে কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে এই শোরগোল বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

যদিও আইনি বা প্রশাসনিকভাবে শ্রীজাতের গ্রেফতারির খবরটি নস্যাৎ করা হয়েছে, তবুও ভোটের আবহে একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এই ধরনের অস্থিরতা বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের উপর এক অদৃশ্য ছায়া ফেলেছে। কবির কলমকে আইনি জাঁতাকলে পিষ্ট করার চেষ্টা হোক বা গুজব ছড়িয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা—উভয়ই মুক্তচিন্তার পথে অন্তরায়। গণতন্ত্রের উৎসবে রাজনৈতিক দড়িটানাটানির মাঝে সৃজনশীলতার কণ্ঠস্বর যাতে রুদ্ধ না হয়, সেই দাবিই আজ বাংলার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গুণীজনদের কণ্ঠে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।