রোজের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য বদল কমাবে দুশ্চিন্তার ভার! কী খাবেন, কী খাবেন না
Food Habit: মানসিক স্বাস্থ্যর সঙ্গে জড়িয়ে খাদ্যাভ্যাসও।

স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা। এই একটি শব্দ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। এই স্ট্রেসের সমস্যা ও পরিণতি আজ ২০২২-এ দাঁড়িয়ে আরও প্রকট হয়ে উঠছে, এবং পরবর্তী সময়ে বা ভবিষ্যতে যে তা আরও ভয়ানক হয়ে আমাদের জীবনে আসতে চলেছে, তা টাইমমেশিন-এ ভ্রমণ না করেও আমরা সকলেই আজ নিশ্চিত। 'স্ট্রেস' কথাটি আজ এতটাই ব্যবহৃত ও প্রযোজ্য যে, এর সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হয়!
স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা কী?
প্রথমেই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কথা হিসেবে এটা জানিয়ে রাখা ভালো যে, রোজকার জীবনে প্রতিনিয়ত চলতে থাকা হাজারও চাপ আর 'স্ট্রেস' নামক অসুখকে কিন্তু গুলিয়ে ফেললে চলবে না। রোজকার জীবনে চাপ নেই, এমন ব্যক্তি আজকের পৃথিবীতে বিরল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মানসিক চাপ সহ্যক্ষমতার বাইরে গিয়ে যখন ক্ষতি বা অসুখের আকার নেয়, তাকেই স্ট্রেস বলা হয়।
শারীরিক কিংবা মানসিক, যাইই হোক না কেন, স্ট্রেস আধুনিক ব্যস্ত জীবনের একটি অনিবার্য অংশ। এর শুরু যদিও মন দিয়ে, তবে এর প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, পুরো শরীরকে প্রভাবিত করে। জীবন আছে মানে সমস্যা থাকবেই। কারও সমস্যা বড়, কারও ছোট, আবার কারও মাঝারি। তবে সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক। বহু ক্ষেত্রে সমস্যার পাশ কাটিয়ে জীবনে ঢুকে পড়ে দুশ্চিন্তা। কারণ আমরা সমস্যা থেকে দূরে যেতে চাই। আর সেই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় সমস্যা, যার নাম স্ট্রেস! সামান্য চিন্তা সবার জীবনেই থাকতে পারে। তবে দুশ্চিন্তা আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করলে দেখা দেবে সমস্যা। এক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা একটি মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। দেখা দিতে পারে মানসিক অবস্থার অবনতি। ফলাফল আরও গভীরে। এক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে শারীরিক সমস্যা। দুশ্চিন্তার কারণে হতে পারে ডায়াবিটিস, হাই ব্লাডপ্রেশার, হার্টের রোগ-সহ অন্যান্য অসুখ।
খাবারের সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক
খাবারের সঙ্গে যে শারীরিক পুষ্টির যোগ রয়েছে, এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যর সঙ্গে খাবারের কী সম্পর্ক! সম্পর্ক আছে, কারণ আমাদের শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ, স্নায়ু, কার্যসম্পাদন ক্ষমতা সবই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই আমরা যে খাদ্যই গ্রহণ করি না কেন, তা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, খাবার হতাশা এবং উদ্বেগ-সহ মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার বিকাশ, প্রতিরোধ এবং পরিচালনায় অবদান রাখে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যদি খাদ্যাভাস বদলে ফেলা যায়, তবেই বহু মানুষকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
আমাদের মুড পরিচালিত হয় ব্রেনের মাধ্যমে, মস্তিষ্কের মধ্যের নিউরোট্রান্সমিটারস দ্বারা। আর এই নিউরোট্রান্সমিটারস কতটা ভারসাম্য রেখে কাজ করবে, তা নির্ভর করে আমরা কী খাচ্ছি, তা হজম হচ্ছে কি না, তার ওপর। এই প্রসঙ্গে মনোরোগ-বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রামের কথায়, "মুড ইজ ডিসাইডেড বাই নিউরোট্রান্সমিটারস। আর নিউরোট্রান্সমিটার লেভেল নির্ভর করছে আমরা কী খাচ্ছি, তার ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সাধারণভাবে বলা যায়, ভিটামিন, মিনারেল-সমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীর ভাল থাকবে। কিন্তু নির্দিষ্ট করে বলা যায় না যে, অমুক জিনিসটা খেলে মুড ভাল হয়ে যাবে। আমরা জানি, খাবার মনের ওপর নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলে, কিন্তু ছোলা খেলে মন ভালো হবে না কি আমন্ড খেলে, ওই পর্যায়ের মাইক্রোনলেজ আমাদের এখনও নেই।"
খাদ্যাভ্যাসের রদবদল কীভাবে মানসিক উদ্বেগ বাড়ায়
মনখারাপ হলে অনেকেই বিঞ্জ ইটিং বা কমফর্ট ইটিং করেন। আবার কেউ কেউ আছেন, এরকম পরিস্থিতিতে একসঙ্গে অনেক কিছু খেয়ে নেন। তার পর বুঝতে পারেন, খাওয়া উচিত হয়নি। তখন হয়তো গলায় আঙুল দিয়ে বমি করলেন, যাকে ‘বুলিমিয়া’ বলা হয়। এটি একটি ইটিং ডিজ়অর্ডার, যা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। মনখারাপের কারণে প্রতিনিয়ত বেশি খাওয়ার ফলে ওবেসিটির সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে এক্সারসাইজ় বাদ পড়ে রোজকার রুটিন থেকে। আর চেহারা খারাপ হলে মনের ওপরেও তার প্রভাব পড়ে। পছন্দের খাবার খেলে স্বাভাবিকভাবেই মন ভাল হয়ে যায়। মনের মধ্যে একটা তৃপ্তিবোধও কাজ করে।
চোখের আড়াল তো মনের আড়াল! যে কোনও প্রিয় খাবার চোখের সামনে যদি থাকে, তাহলে লোভ সামলানো কঠিন হয়ে যায়। খাবার টেবিলে রাখা সুস্বাদু Chocolate Cake বা Chips যখন হাতছানি দিয়ে ডাকবে, তখন জিভকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া মানসিক চাপে থাকলে অনেক সময় চটকদার খাবার খেতে ইচ্ছে হয়। মানুষ মনের এই অশনি সংকেত বুঝতে না পেরে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখরোচক লোভনীয় খাবারের দিকে। মন খারাপে সময়ে কাটাতে অনেকেই কফি-র দিকে হাত বাড়ান। কেউ কেউ আবার এই সময় সাহায্য নেন অ্যালকোহলের। কিন্তু নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যরও বারোটা বাজাচ্ছেন তাঁরা। প্রায়শই খেতে ইচ্ছে হওয়া এই মুখরোচক খাবার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কুপ্রভাব ফেলে। কিন্তু কীভাবে?
১. অ্যালকোহল বা মদজাতীয় নেশাদ্রব্য: সাময়িক প্রশান্তি ও উৎকর্ষর জন্য গ্রহণ করা এই অ্যালকোহল বা মদই উলটে আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিতে পারে। মদ আমাদের শরীরে ঘুমের ব্যাঘাত এবং ডিহাইড্রেশন, অর্থাৎ, জলের ঘাটতি ঘটায়, যা কি না এই উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া মদ মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক একটি হরমোন এবং নিউরনের সংবেদনশীলতাকে প্রভাবিত করে, যা আরেকটি কারণ হতে পারে শরীরে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তোলার। এই কারণে অনেকে মদের নেশা কেটে যাওয়ার পর আরও তীব্রভাবে দুশ্চিন্তার সমস্যা অনুভব করে থাকেন।
২. ক্যাফেইন: সকালে ঘুম থেকে উঠেই এককাপ গরম গরম কফি খেতে অনেকেই খুবই পছন্দ করেন, কিন্তু এই কফিতে বিদ্যমান ক্যাফেইন আমাদের শরীরে উদ্বেগজনিত সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। এমনকী, ক্যাফেইন মস্তিষ্কে নিঃসৃত হওয়া হ্যাপি হরমোন সেরোটোনিনের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও বিষাদ বাড়িয়ে দিতে পারে। পরিমিত মাত্রায় ক্যাফেইন সেবন এজন্য খুবই জরুরি। দিনে ৪০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন গ্রহণ শরীরে কোনও সমস্যা তৈরি করে না বলে জানিয়েছে FDA (The Food & Drug Administration)। এজন্য কফি এবং ক্যাফেইন বিদ্যমান আছে এমন খাবার যেমন চা, চকোলেট ও বিভিন্ন মাথাব্যথার ওষুধ সেবনে সচেতনতা বজায় রাখতে হবে।
৩. Added Sugar বা চিনিমিশ্রিত খাবার: খাবারকে একশোভাগ চিনিমুক্ত রাখা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব কেননা প্রাকৃতিকভাবেই অনেক খাবার এবং প্রায় সব ফলেই চিনি মিশ্রিত থাকে। তবে আসল সমস্যা হয় সেসব চিনিমিশ্রিত খাবারে, যেগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে মনে হয় চিনিবিহীন। কারণ যেহেতু আমরা জানি না সেগুলোতে চিনি মেশানো আছে- আমরা না বুঝেই অনেক বেশি পরিমাণ চিনি গ্রহণ করে ফেলি। যেমন: টমেটো সস, পাস্তা সস, কর্ন ফ্লেকস ইত্যাদি। চিনি শরীরে রক্ত চলাচল হুট করে বাড়িয়ে দেয় এবং তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদান করে, যা কিছুক্ষণ স্থায়ী হওয়ার পর চলে যায়। তখন আমরা আবার বিষণ্ন ও আলসে অনুভব করতে শুরু করি, যা আমাদের দুশ্চিন্তা পরোক্ষভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। এজন্য এই সমস্ত খাবার যতটা সম্ভব আমাদের এগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা উচিত।
৪. রিফাইনড কার্বস বা প্রক্রিয়াজাত শর্করা: শস্যদানাকে কয়েকধাপ পরিশোধনের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এই রিফাইনড কার্বস। রিফাইনিং বা পরিশোধনের মাধ্যমে শস্যদানা থেকে এর ফাইবার আলাদা করে ফেলা হয়, যা এর পুষ্টিগুণ অনেক কমিয়ে ফেলে। কিছু রিফাইনড কার্বস-জাতীয় খাবারের উদাহরণ হলো: সাদা পাঁউরুটি, সাদা ভাত, বিভিন্ন কেক ও পেস্ট্রি, তরল পানীয় বা বেভারেজ ড্রিংকস, পাস্তা ও নুডলস এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাতীয় তৈরি খাবার। এই রিফাইনড কার্বসজাতীয় খাবার স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো রোগের সৃষ্টি করে এবং পাশাপাশি বিষাদের সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। এজন্য সাদা আটা ও ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার যেন পরিমিত মাত্রায় গ্রহণ করা হয়, সে-ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
৫. প্রসেসড মিট এবং চিজ: বিভিন্ন প্রসেসড মিট এবং চিজ আমাদের শরীরে ইনফ্ল্যামেশন বাড়িয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া এসব খাবারে ফাইবার অনেক কম পরিমাণে থাকে তাই নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে এই সব প্রসেসড ফুড থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. প্রক্রিয়াজাত তেল: অনেকেই ফাস্ট ফুডকে ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, এসব খাবারে প্রক্রিয়াজাত তেল ব্যবহার করা হয়। পুষ্টিবিজ্ঞানী এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ উমা নাইডুর কথায়, খাবারে প্রক্রিয়াজাত তেল ব্যবহারের ফলে আমাদের শরীরে উদ্বেগজনিত সমস্যা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এর মধ্যে ভুট্টার তেল এবং সোয়াবিন তেল সবথেকে বেশি বিপজ্জনক। তাই এইসব তেল পরিহার করা জরুরি।







