যে মানুষটির জন্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হল না

Amit Pratihar
৫ মিনিট
যে মানুষটির জন্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হল না

আপনি এই আর্টিকেলটা পড়ার আগের মুহূর্তে যে মানুষটার সঙ্গে বাক্যালাপে ব্যস্ত ছিলেন সেই মানুষটাকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন এক ব্যক্তি। আপনি এই আর্টিকেলটা পড়ার পর যে মানুষটার সঙ্গে কথা বলবেন, সেই মানুষটাকেও প্রাণে বাঁচিয়েছেন সেই একই ব্যক্তি। এমনকি আপনিও যে জীবিত অবস্থায় এই লেখাটা পড়তে পারছেন, আপনার এহেন সৌভাগ্যের জন্য, দায়ী সেই একই ব্যক্তি। শুধু আপনার না, আপনার, আমার, আমাদের পরিচিত থেকে অপরিচিত বৃত্তের সমস্ত মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন এই একই ব্যক্তি। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে। সুপারহিরো নামে আমরা যে সব কাল্পনিক চরিত্রদের চিনি তারা হলেন ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান ইত্যাদি। অথচ আসল জীবনে যারা লোক চক্ষুর আড়ালে ঘটিয়ে চলেন একের পর এক নায়কচিত ঘটনা, সৃষ্টি করেন মহাজাগতিক আলোড়ন তাদের খুব একটা চেনা হয়ে ওঠে না। আমাদের আজকের গল্প এমনই এক আনসাং হিরোকে নিয়ে যিনি নিজের সিদ্ধান্তে পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন।

সময়টা ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাস। তখন 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' নামক কোল্ড ওয়ার শুরু হয়েছে আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে। কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস কী? এইসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল আমেরিকান সমুদ্ররেখার থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে, কিউবা তে একটি নিউক্লিয়ার আর্মড সোভিয়েত মিসাইল প্রতিস্থাপনা করতে; যা তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন কেনেডি সমর্থন করেননি। ফলস্বরূপ একটি দীর্ঘ পলিটিক্যাল পর্যালোচনা বোর্ড গঠন করা হয় দুই দেশের সদস্যদের নিয়ে। দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই এক অঘোষিত কোল্ড ওয়ার শুরু হয়ে গেছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে দুই দেশই যুদ্ধের মহড়া শুরু করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ কেউ রাশিয়ার সমর্থন করছেন তো কেউ আমেরিকার। পরিস্থিতি খুবই গরম। যে কোনও মুহূর্তে শুরু হতে পারে যুদ্ধ।

এমতাবস্থায় ক্যারিবিয়ান মহাসাগরের ভূগর্ভপৃষ্ঠে আমেরিকান নেভি আবিষ্কার করলো তিনটে লুকিয়ে থাকা রাশিয়ান সাবমেরিন। প্রেসিডেন্ট কেনেডির তীক্ষ্ণ নির্দেশ, কোনও রাশিয়ান সাবমেরিন কে কিউবা অবধি পৌঁছাতে দেওয়া যাবে না। অতঃপর শুরু হলো সাবমেরিনগুলোকে লক্ষ্য করে বোমা গ্রেনেড বর্ষণ। একটার পর একটা গ্রেনেডের আঘাতে সাবমেরিনগুলো দুলে উঠছে, কেঁপে উঠছে। সাবমেরিনের ভিতরের উষ্ণতা ছুঁয়েছে প্রায় ১০০°, এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম ভেঙে পড়েছে বোমার আঘাতে। সাবমেরিনের ভিতরের মানুষগুলো ভেবেই নিয়েছে অদ্যই শেষ রজনী, কালকের প্রভাত আর দেখা হবে না। আমেরিকান নেভির ১১টা জাহাজ চারিদিক দিয়ে তখনও বোমাবর্ষণ করেই চলেছেন, আর সাবমেরিনগুলোকে নির্দেশ দিচ্ছেন সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে ওঠার। ওদিকে সাবমেরিনের ভিতরের লোকেরা মস্কো থেকে হাই কম্যান্ডের থেকে নির্দেশ ছাড়া ভেসে উঠতেও পারবেন না সাবমেরিন নিয়ে। মস্কোর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ফলত নির্দেশ আর আসবে না। অগত্যা তিনটি সাবমেরিনের মধ্যে একটি সাবমেরিনের সোভিয়েত ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিন সাভিতস্কি ধরেই নিলেন তাঁরা মৃত্যুবরণ করতে চলেছেন।

এখানেই শুরু হচ্ছে এই ঘটনার আসল রোমাঞ্চ। একের পর এক বোমাঘাতে মৃত্যু যখন প্রায় সুনিশ্চিত তখন ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিন নির্দেশ দিলেন আমেরিকানদের উদ্দেশ্যে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করার। কিন্তু কী সেই ব্রহ্মাস্ত্র? আমেরিকান নেভিরা রাশিয়ান সাবমেরিনের উদ্দেশ্যে বোমা বর্ষণ করার সময় যা জানতেন না তা হলো, ওই সাবমেরিনগুলোতে আছে নিউক্লিয়ার ওয়েপন, যার মারণক্ষমতা হিরোশিমা নাগাসাকির নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণের থেকেও ভয়ংকর। একের পর এক বোমার আঘাত সহ্য করতে করতে দীর্ঘদিন ধরে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন, মস্কো হাই কমান্ডারদের থেকে বিচ্ছিন্ন রাশিয়ান নেভি কমান্ডাররা সাবমেরিনের ভিতরে বসে ভাবলেন বাইরে হয়তো যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে, তাই আমেরিকান নেভি তাদের ওপর হামলা করেছে। ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিন নার্ভ ধরে রাখতে পারলেন না এবং চেঁচিয়ে অর্ডার করলেন, 'মনে হয় বাইরে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা এদের ধ্বংস করে দেবো। আমরা মরবো, কিন্তু এদের প্রত্যেককে মেরে মরবো'। যদি সেদিন সেই মুহূর্তে রাশিয়া নিউক্লিয়ার আঘাত করতো আমেরিকার বিরুদ্ধে, যদি তারা আমেরিকান নেভির কিছু জাহাজ ধ্বংস করতো নিউক্লিয়ার ওয়েপন দিয়ে তবে নিশ্চয়তার সাথেই আমেরিকা আরও দ্বিগুন শক্তিসমেত নিউক্লিয়ার আক্রমণ করতো রাশিয়াকে। এবং শুরু হতো পৃথিবীর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কোটি কোটি সিভিলিয়ান মারা যেতো। গোটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তো নিউক্লিয়ার যুদ্ধের মারণ রেশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফল ভোগ করতো এই বিশ্বযুদ্ধের।

কিন্তু এ'সবের কিছুই হয়নি, কারণ এ'খানেই ঢুকছেন এই ঘটনার মুখ্য চরিত্র ভ্যাসিলি আলেকসান্দ্রভিচ আর্খিপভ।

তিনি তখন বছর ৩৪ এর সুদর্শন যুবক, মাথা ভর্তি চুল, শান্ত, ধীর স্থির প্রকৃতির। নিউক্লিয়ার ওয়েপনগুলো শত্রু ঘাঁটির উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করার আগের একটা প্রশাসনিক নিয়ম ছিল। তা হলো উপস্থিত তিনটি সাবমেরিনের তিন ক্যাপ্টেন কম্যান্ডারকেই সহমত পোষণ করতে হবে যা তারা শত্রুপক্ষকে নিউক্লিয়ার আঘাত দিতে প্রস্তুত। কেউ একজন সহমত পোষণ না করলে নিউক্লিয়ার ওয়েপন নিক্ষেপ করা যাবে না। ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিন নিজে রাজি ছিলেন, অন্য আর এক কমান্ডারও রাজি ছিলেন, শুধু বেঁকে বসেন ভ্যাসিলি আর্খিপভ। তিনি সে দিন ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিনকে কী বুঝিয়েছিলেন কেউ জানেন না! কিন্তু তিনি পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে আমেরিকান নেভির উদ্দেশে আঘাত হানতে দেননি এটা গোটা বিশ্ব জানে।

সেদিন সাবমেরিনে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী, 'তিনটি সাবমেরিনের তিন ক্যাপ্টেন এবং তিন জন কমান্ডারকেই রাজি হতে হতো নিউক্লিয়ার ওয়েপন ডিপ্লয় করার আগে। ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিন এবং অন্য সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন রাজি থাকলেও, রাজি হলেন না তৃতীয় ক্যাপ্টেনভ্যাসিলি। তিনি ক্রমাগত বলে চললেন এটা আমাদের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে না। ওরা আমাদের কে সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে ওঠার নির্দেশ দিচ্ছে। আক্রমণ করলে সাবমেরিনের ডানদিক বা বাঁ-দিকে বোমা নিক্ষেপ না করে সোজা সাবমেরিনেই আঘাত করতো। বাইরে যুদ্ধ এখনও শুরু হয়নি কিন্তু আমরা নিউক্লিয়ার আঘাত করলে, বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হবে...'

ভ্যাসিলি আর্খিপভ কীভাবে সেদিন তাঁর নার্ভ ধরে রেখেছিলেন আমরা কেউ জানি না, কীভাবে তিনি ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিনকে সামলেছিলেন আমরা কেউ জানি না, আমরা যেটা জানি তা হলো তিনি নিশ্চিত ভাবেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন এই নিউক্লিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে তার ফল ভুগতে হবে গোটা বিশ্বকে। এই ঘটনার এক বছর আগে ভ্যাসিলি তখন সাবমেরিন কে-১৯-এর দায়িত্বে আছেন। হঠাৎ-ই সাবমেরিনের কুলেন্ট সিস্টেম ভেঙে পড়ে। যায় ফলে সাবমেরিনে উপস্থিত নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর মেল্ট ডাউন করতে শুরু করে। আশু বিপদ আন্দাজ করে ভ্যাসিলি এবং তাঁর সহকর্মীরা তাঁর নির্দেশে হাই লেবেল ওপেন রেডিয়েশনের মধ্যেই নেমে পড়েন রিপেয়ার করতে। সেই সাবমেরিনে উপস্থিত সমস্ত স্টাফই বছর দুয়েকের মধ্যেই মারা যান। ভ্যাসিলিও পরে অতিরিক্ত রেডিয়েশন শোষণ করার ফলে, কিডনির ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন।

২০১৭ সালে, 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' এর ৫৫ বছর পর, ভ্যাসিলিকে 'Future of Life Award' এ ভূষিত করা হয়। লোকে কত মানুষকেই কত নামে চেনে। কত মানুষের কত ডাক নাম। যে মানুষটা কোটি কোটি মানুষকে সেদিন মরতে দিলেন না, যে মানুষটা নিউক্লিয়ার ওয়ার শুরু হতে দিলেন না, যে মানুষটা নিজের প্রাণের পরোয়া না করে আটকে দিলেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যে মানুষটা গ্লোবাল ডিভাস্টেশন শুরুই হতে দিলেন না সেদিন একটা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে, যে মানুষটা আমাদের প্রত্যেকের বেঁচে থাকার জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী, সে মানুষটাকে কী নামে ডাকা যায়??

আসুন আমরা ভ্যাসিলি আর্খিপভকে চিনি, 'যিনি পৃথিবীকে বাঁচিয়েছিলেন...', এই নামে।

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।