সুইসাইড নোটেও জীবনের কথাই লিখেছিলেন এই কবি

প্রিয়া সামন্ত
৫ মিনিট
সুইসাইড নোটেও জীবনের কথাই লিখেছিলেন এই কবি

মিলান শহরের অদূরে শিয়ারাভেল অ্যাবি। বরফের উপর শুয়ে থাকা এক মহিলার অবয়ব, সদ্য নামা ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় পথচারীদের অস্বস্তিতে ফেলছে বারবার। বারবিচুরেট ড্রাগের প্রভাবে তখন মহিলার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে অনন্ত হিম। অতীতের দখলদারিতে পৌঁছতে পৌঁছতে তবু ৩রা ডিসেম্বর হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর কোটের পকেট থেকে পাওয়া, বন্ধু ভিত্তোরিও সেরেনির ‘Diana’ কবিতাটির শেষাংশে লেখা ছিল -“And the song you had in the evening/ returns to ache within here, / breathes on the memory/ to reprove you for dying.”

বিগত দশকে ইতালীয় কবিতার জগতে এক বিস্ময়ের মতো বারবার উঠে এসেছে আন্তোনিয়ার নাম। আন্তোনিয়া পোসসি। যাঁর মৃত্যুদৃশ্যকে ধারণ করে আছে উপরের অনুচ্ছেদটি। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে আত্মহত্যাকারী এই কবির বেঁচে থাকার দিনগুলিতে, তাঁর কোনও কবিতাই প্রকাশের মুখ দেখেনি। তাঁর কবিতার পাঠক ছিল মূলত আলপাইন পর্বতমালার, গ্রিগনা পাহাড়ের কোলে অলস শুয়ে থাকা পাস্তুরো গ্রামের ঝোরাগুলি, পাহাড়ি বাঁকের মুখে ফুটে ওঠা নামহীন ফুলেরা, ছেলেবেলার বন্ধু ইয়ুলিও য়াদেন কিংবা বন্ধুত্ব ছাপিয়ে ক্রমে ভাই হয়ে ওঠা ভিত্তোরিও সেরেনি।

আইনজীবি রবার্তো পোসসি চেয়েছিলেন মেয়ের জীবনকে নিজের শর্তে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে। মেয়ের সঙ্গে তার থেকে প্রায় চোদ্দ বছরের বড়ো শিক্ষক তথা বন্ধু আন্তোনিয়ো মারিয়া সার্ভি-র প্রেমের সম্পর্ককে তাই বাবা হিসাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি রবার্তো। মিলান থেকে বারবার দূরে সরিয়ে সুদূর পাস্তুরো গ্রামে থাকতে পাঠিয়েছেন মেয়েকে। কিন্তু সেই পাস্তুরো গ্রাম, আলপাইন পর্বতের উপত্যকা, ছায়াচ্ছন্ন ঝোরা, ফসলের খেতে কাজ করতে আসা মেয়েদের দল আর তার প্রিয়তম আন্তোনেল্লো কীভাবে তার মেয়ের লেখায়, ডায়রিতে ক্রমেই ঢুকে পড়েছে, তার হদিশ পেতে রবার্তোকে অপেক্ষা করতে হয়েছে মেয়ের মৃত্য অবধি। আর তারপর কঠিন হাতে বাবার ভূমিকায় মঞ্চে নেমেছেন রবার্তো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, কড়া হাতের কলম চালিয়ে মেয়ের লেখা থেকে মুছে দিয়েছেন আন্তোনিয়ো সার্ভি সহ এমন যে কোনও প্রসঙ্গ, যা পোসসি পরিবারের নামের গায়ে সামান্যতম ধুলো ছুঁড়ে দিতে পারে! কাটাছেঁড়া করা সেইসব কবিতা ‘Parole’ নামে প্রকাশ করলেও, তবু শেষরক্ষা হয়নি। পরবর্তীকালে ইয়ুজিনিও মোতেল, ভিত্তোরিও সেনেরি, গ্রাজিয়েলা বার্নাবো সহ অনুবাদক পিটার রবিনসনের তৎপরতায় শেষমেষ প্রকাশ পায় আন্তোনিয়ার মূল কবিতা, ডায়রি ও চিঠিগুলি।

“Oh, make me worthy of you, /Poetry, watching over me.”–তাঁর ‘Prayer to Poetry’ কবিতায় লিখেছিলেন আন্তোনিয়া। আর এই কবিতাকে সঙ্গী করেই আন্তোনিয়া গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজস্ব পৃথিবী, যেখানে প্রকৃতির প্রাণময়তার সঙ্গে অনায়াস মিশে যেত তাঁর একাকিত্ব। জন্মাতে না পারা শব্দের কান্নাদের, সূর্যের স্বপ্নের দিকে ভেসে যাওয়া দেখতে দেখতে, ঢুকে পড়তেন চিরন্তন এক রাত্রির দরজা ঠেলে। অজাত শব্দেরা তাঁর আত্মার কাছে মুক্তির করুণ আর্তিসহ হাজির হত, যাদের শাসন না করতে পারার যন্ত্রণায় ফেটে পড়তেন আন্তোনিয়া।

একদিকে যেমন শব্দের নিজস্ব সত্তা গড়ে দেবার আনন্দকে ধারণ করত তাঁর কবিতা, তেমনই অন্যদিকে তার কবিতায় ফিরে ফিরে আসত পাহাড়ী গ্রামের কথা, উপত্যকার বুকে ফুটে থাকা অনামা ও বিখ্যাত সব ফুলের কথা, ঝরনা, জল আর ছায়া্র কথা, হাওয়া আর রোদের কাটাকুটি খেলার কথা, ফসলকুড়ানি মায়ের ছেলে কাঁখে হাস্যমুখ দাঁড়িয়ে থাকার কথা, দূর সমুদ্রের অন্ধকারে একলা এক তারার জেগে থাকার কথা, তুষারপাতের শহরে সন্ধ্যায় ফুল বিক্রেতা কিশোরী মেয়েটার কথা, হেমন্তের নক্ষত্রমালার কথা, অন্ধকার ও সীমাহীন রাতের কথা, বিষণ্ণতা ও একাকিত্বের কথা, তাঁর নিজস্ব পৃথিবী এবং ভালোবাসার কথা।

আন্তোনিয়া এক দ্বিধাগ্রস্ত সময়ের নারী এবং সেইসঙ্গে কবি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতালির প্রায় ভেঙে পড়া সামাজিক পরিকাঠামোয় দাঁড়িয়ে, ব্যক্তিগত জীবনে অভাব কাকে বলে তিনি দেখেননি। অথচ সেই তিনিই, পাস্তুরো গ্রামে গিয়ে দেখছেন এমন এক মাকে, যার কাছে ফুটন্ত গরমজলের পাত্রে পড়ে যাওয়া সন্তানের অন্তিম সংস্কারে যাওয়ার জন্য সময় নেই। কেননা কৃষকরমণীর জীবনে সন্তানশোক তৎকালীন ইতালীতে এক বিলাসিতা। সমাজের উপরতলার শ্রেণির মানুষ হয়ে শুধুমাত্র বিলাস নয়, জীবনের রক্তাক্ত, আহত দিকটিকেও আন্তোনিয়া সমানুভূতির সঙ্গে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। লিখেছিলেন- “Sisters, don’t you mind that/ I follow/ your path again tonight? … The silence against your heart/ like the deepest life/ just by listening to yours, souls to go.”। এক যুদ্ধ থেকে সদ্য উঠে আরেক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া ইতালির অভাবদীর্ণ অবস্থা, নারীদের চাহিদার উত্তরে পাওয়া উপেক্ষা, অসুখের দিন আর মৃত্যুর পাশাপাশি এক চিরন্তন ভালোবাসার জন্য অপেক্ষার কথা তাই তাঁর কবিতার স্থায়ী অনুষঙ্গ।

ভিত্তোরিও সেনেরির সঙ্গে চিঠির আলাপচারিতায় এক জায়গায় আন্তোনিয়া আক্ষেপ করেন যে, নিজস্ব যে কামনা তাঁকে নিয়ত বিহ্বল করে, তাঁর প্রিয় লেখক ফ্লবেয়ার কিংবা টমাস মানের মতো তিনি তাকে শব্দে প্রকাশের পথ খুঁজে পান না। প্রতি মুহূর্তে ভয় পান, তাঁর লেখা শুধুমাত্র লেখা হিসাবে নয়, সমালোচিত হবে নারীর লেখা হিসাবে। প্রতি মুহূর্তে ‘good Antonia’ হয়ে থাকতে গিয়ে নিজস্ব কবিতার প্রতি তাঁকে কড়া শাসকের ভূমিকা পালন করতে হয়। ডায়রিতে যেন বাধ্যতই লেখেন, “It is terrible to be a woman and to be 17 years old”। তাই দেখা যায়, আন্তোনিয়ো সার্ভি বা ইয়ুলিও য়াদেন বা ভিত্তোরিও সেনেরিকে লেখা চিঠিতে বা তাঁর ডায়রির পাতায় তিনি যতটা সাবলীল, সৎ ও দ্বিধাহীন, তাঁর কবিতা যেন ততটাই উপমা, রূপকের মোড়কে সালঙ্কারা। কবিতায় সেই এক ‘Ultrahuman’ হয়ে উঠতে চেয়ে তিনি বিশ্বাস করতেন “I live from poetry as veins live from blood”।

আন্তোনেল্লোর প্রতি আন্তোনিয়ার প্রেম তাঁকে পৃথিবীর খুঁটিনাটি সম্পর্কে আরও মনোযোগী করে তুলেছিল। শুধুমাত্র দেহজ রূপের মোহে নয়, জ্ঞান, মেধা ও বৌদ্ধিক সূক্ষ্মতায় সার্ভি, আন্তোনিয়ার কাছে ছিলেন “A great flame yearning for ever greater purity, unfortunately destined to dry up alone…”। আন্তোনিয়ার বাবার হস্তক্ষেপে তাঁদের মধ্যে স্থানিক দূরত্ব ঘনালেও, একে অপরের থেকে তাঁদের মানসিক দূরত্ব একচুলও বাড়েনি। ১৯৩০ সালের ১৩ই এপ্রিল এক চিঠিতে আন্তোনিয়া, সার্ভিকে লেখেন যে, আশংকা, দ্বিধা ও যন্ত্রণার মুহূর্তেরা তাঁকে মৃত্যুর কথা বলে, তবু তিনি সার্ভিকে উদ্দেশ্য করেই জোর গলায় বলতে পারেন “With the light, you too have returned, ... Antonello, next to you I build my real life; next to you is the sanctity of my existence.”। আন্তোনিয়ার মৃত্যুর বেশ কিছু বছর পর সার্ভি নিজেও আত্মহত্যা করেন।

এমন এক চূড়ান্ত প্রেমের থেকে অপ্রাপ্তির দূরত্বে থেকেও আন্তোনিয়া যেভাবে পৃথিবীর আলো-জল-হাওয়া সহ সমস্ত উপাদানকে প্রাণ ভরে ভালোবাসতেন, তা হয়তো তাঁর এক অপার সহানুভূতিশীল মননের জন্যই সম্ভব হয়েছিল। জীবনের থেকে বেশি কিছু দাবী নয়, নভেম্বরের তুষারপাতের শহরে তিনি আশা করেছিলেন – “Someone will cry/ who knows where-who knows where-/ someone will search out chrysanthemums / for me/ in the world/ when it happens that without return/ I’ll have to go away.”।

তাঁর মৃত্যুর পর ভিত্তোরিও সেরেনি 3rd December কবিতায় লিখেছিলেন – “You die a little every year/ on this particular day.”। কিন্তু এমন হতাশার বোধ থেকে সরে এসে ভবিষ্যতের পাঠকেরাই তাঁর কবিতাতেই তাঁকে আপন করে নিতে পারেন, যার পাশে বসে আন্তোনিয়া আপনমনে হেসে উঠে বলবেন- “…You whose sweet tears/ ran deep in the eyes/ if they looked up-/ and so I seemed more beautiful to you.”।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।