ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের নিচেই জন্ম নিল শিশুকন্যা! কান্নার মধ্যেও যে অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী তুরস্ক
Turkey Earthquake Newborn Baby : এই মৃত্যু বিভীষিকার মধ্যেই যে সে জন্মগ্রহণ করেছে! আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর জন্ম হয়েছে এই ছোট্ট শিশুটির।

“নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে দীর্ঘশ্বাস।” কিন্তু তুরস্কে এখন দীর্ঘশ্বাস নয়, চারিদিকে ছড়িয়ে আছে হাহাকারের ছবি। হাজার হাজার বাড়ি ভেঙে গিয়েছে। সেই বিশাল কংক্রিটের চাঙড়গুলির নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ৬ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে, তাঁদের ঘুমের মধ্যেই হাজিরা দেয় ভয়ংকর ভূমিকম্প। তার জেরে এখন ধ্বংসস্তূপ তুরস্ক-সিরিয়া। মৃতের সংখ্যা ২৪,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। যত সময় এগোচ্ছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এই সংখ্যা। ধ্বংসস্তূপের ওপর বসেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন অজস্র মানুষ। কারোর পরিজনের রক্তাক্ত, প্রাণহীন দেহ পাওয়া গিয়েছে। কেউ কেউ এখনও খুঁজেই চলেছেন।
বেশ কয়েকদিন পেরিয়ে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনও ছবিটা একইরকম ভয়ংকর। বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল এসে হাত লাগাচ্ছে। এই মৃত্যুর স্তূপের মধ্যেই ঘটে চলেছে একের পর এক অলৌকিক ঘটনা। কখনও ৮০ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ছয় বছরের ছোট্ট মেয়েকে উদ্ধার করা হচ্ছে। আবার কখনও নাওয়া খাওয়া ভুলে আটকে পড়া মা ও তাঁর সন্তানকে সুস্থভাবে নিয়ে আসা হচ্ছে। তবে এই সমস্ত ছাপিয়ে গিয়েছে ছোট্ট আয়ার ঘটনা। ছোট্ট শিশুকন্যাটির বয়সই বা কত হবে! মাত্র কয়েকদিন! অথচ সেই আয়া-ই তুরস্কের বুকে নতুন মিরাকলের জন্ম দিল। ছোট্ট দুধের শিশুটির জীবনের মতোই অলৌকিক ঘটনা ঘটুক জীবনে, চাইছেন সবাই। কেন? এই মৃত্যু বিভীষিকার মধ্যেই যে সে জন্মগ্রহণ করেছে! আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর জন্ম হয়েছে এই ছোট্ট শিশুটির।
আরবি ভাষায় ‘আয়া’ (Aya) শব্দের অর্থ অলৌকিক। মাত্র কয়েকদিনের এই শিশুটির জন্মলগ্ন থেকেই জুড়ে গেল এই শব্দটি। উদ্ধারকারীরারাই তার এমন নাম রেখেছে। ঠিক কী ঘটেছে? ভূমিকম্পের পর তুরস্কের যে জায়গাগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার মধ্যে একটি হল জিনদায়রিস (Jindayris)। সেখানেই থাকতেন আয়া-র বাবা-মা। সেইসঙ্গে থাকত আয়া-র চার ভাইবোনও। মা ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। শীঘ্রই নতুন এক অতিথি বাড়িতে আসবে, তাই আনন্দও ছিল অঢেল। সেই আনন্দই বদলে গেল কান্নায়। ভূমিকম্পের জেরে ভেঙে গেল সেই সাধের বাড়ি। কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ল গোটা পরিবার।
এরপর পুরো এলাকাজুড়ে শুরু হয় উদ্ধারকাজ। সেই সময় হঠাৎই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার করা হয় ফুটফুটে, ছোট্ট এক শিশুকন্যাকে। তখনও তার নাড়ি জড়িয়ে রয়েছে মায়ের গর্ভের সঙ্গে। কিন্তু মা আর বেঁচে নেই। আশেপাশে ছড়িয়ে রয়েছে বাবা আর চার ভাইবোনের মৃতদেহও। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া অবস্থাতেই সন্তানের জন্ম দেন ওই মহিলা, তারপরই মারা যান – এমনই ধারণা উদ্ধারকারীদের। সঙ্গে সঙ্গে ওই নবজাতিকাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড় লাগায় স্থানীয়রা। ওইটুকু শিশুর শরীরেও রক্ত, চোট-আঘাত, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে শরীর। কিন্তু তখনও দেহে প্রাণ রয়েছে। সেটাই ভরসা।
শেষমেশ যুদ্ধ জিতে ফিরল সেই মেয়েটি। উদ্ধারকারীরা নাম রাখলেন ‘আয়া’। জন্মের মুহূর্ত থেকেই পরিবারহারা, অনাথ সে। তার গল্প, ভিডিও আর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসতেই মুহূর্তে ভাইরাল সেই খবর। এখন বিশ্বব্যাপী অজস্র মানুষ এগিয়ে এসেছেন ওই একরত্তি শিশুকে দত্তক নেওয়ার জন্য। একটা দুর্ঘটনা ওর পরিবার কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সুস্থ জীবন পাওয়ার অধিকার তো সবার। তাই সবাই সাহায্য করতে প্রস্তুত।
এই মুহূর্তে হাসপাতালে সুস্থ রয়েছে আয়া। ছোট্ট ছোট্ট চোখে পৃথিবী চেনার কাজ করছে। হাসপাতালের ডাক্তার থেকে নার্স, ম্যানেজার সবাই আগলে রেখেছে তাকে। ম্যানেজারের স্ত্রী নিজে এগিয়ে এসে তাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। এতদিন খাবার, জল ছাড়া ধ্বংসস্তূপে আটকে ছিল সে। তাই তাকে পুরোপুরি সুস্থ করাই এখন সবার আগে দরকার। আয়া যে জন্ম থেকেই লড়াকু! এই লড়াইও তাকে জিততে হবেই!















