মোদি সরকার বনাম ট্যুইটার, সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের নেপথ্যে যে কারণ লুকিয়ে
২০২২-এর ২৮ জুন মাসে ট্যুইটারকে ফের একটি তালিকা ধরানো হয়। তাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের একগুচ্ছ অ্যাকাউন্ট এবং লেখা ব্লক করতে নির্দেশ দেওয়া হয় ট্যুইটারকে।

উচ্চশিক্ষার সুযোগ হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া সেই অভাব অনেকটাই মিটিয়েছে। পাল্টে গিয়েছে চারপাশকে দেখার, বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন। তিনি যেমন, সেভাবেই তাঁকে আপন করে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র স্বপ্ন ফেরি করতে নেমে সাত বছর আগে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোয় ফেসবুকের সদর দপ্তরে, মার্ক জাকারবার্গের মুখোমুখি হয়ে এই কথাই শোনা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে। দিল্লির মসনদে সেই সময় সাকুল্যে এক বছর সাত মাস কাটিয়েছেন তিনি। আট বছর পর সেই সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গেই এবার সরাসরি আইনি লড়াইয়ে মোদি সরকার। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা খর্বের অভিযোগে আদালতের দরজায় পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্যুইটার।
কর্নাটক হাই কোর্টে মোদি সরকারের বৈদ্যুতিন, তথ্য এবং প্রযুক্তি মন্ত্রকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ট্যুইটার। তথ্য-প্রযুক্তি আইনে সাইবার অপরাধ দমনের ৬৯-এ অনুচ্ছেদের আওতায় ট্যুইটারে লেখা একাধিক পোস্ট আটকানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ মাইক্রোব্লগিং সাইটের। অথচ আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রের এই নির্দেশ ত্রুটিপূর্ণ বলে দাবি ট্যুইটারের দাবি। তাদের অভিযোগ, আইন অনুযায়ী, কারও লেখা পোস্ট আটকানো বা তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ওই ব্যক্তিকে নোটিস দিতে হয়। এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। শুধু তাই নয়, যে-সমস্ত পোস্ট নিয়ে আপত্তির কথা জানানো হয়েছে, তার অধিকাংশই ওই আইনের এক্তিয়ারে পড়ে না বলে দাবি করেছে ট্যুইটার। তাদের মতে, পোস্টগুলি আটকাতে কেন্দ্রের তরফে যে কার্যকারণ দেখানো হয়েছে, তা দেখানো হয়েছে, তা ‘অনির্দিষ্ট’, ‘খামখেয়ালি’ এবং ‘অসামাঞ্জস্যপূর্ণ’।
কেন্দ্রের তরফে যে পোস্টগুলি আটকানোর বা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলির মধ্যে কিছু কোনও না কোনও রাজনৈতিক নেতার অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা। সেগুলি তুলে নেওয়ার অর্থ বাকস্বাধীনতার অধিকার খর্ব করা। যদিও কেন্দ্রীয় রেল, জনসংযোগ তথা বৈদ্যুতিন, তথ্য এবং প্রযুক্তিমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণোর কথায়, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম। আজকের দিনে আমাদের জীবনে এর বিপুল প্রভাব রয়েছে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার দায়-দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা বৈধ। একাধিক দেশ সেই পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াকে দায়বদ্ধ করে তোলা কীভাবে সম্ভব? প্রথম পদক্ষেপ হলো আত্মসংযম। যে পোস্ট থেকে সমাজে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা নিজে থেকেই তুলে নেওয়া উচিত ট্যুইটারের। সোশ্যাল মিডিয়া যাতে সেই দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে, তেমন বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে।’’
২০২২ সালে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মুহূর্তে অনুগামীর সংখ্যার নিরিখে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পর বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় রাজনীতিক মোদি। কিন্তু গত দু’বছর ধরে বার বার ট্যুইটারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে মোদি সরকার। এই বছর জুন মাসে ৮০টি অ্যাকাউন্টের একটি তালিকা প্রকাশ করে ট্যুইটার, মোদি সরকারের নির্দেশে যেগুলি ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। ওই তালিকায় মানবাধিকার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থা ফ্রিডম হাউসের নাম ছিল। ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল তারা। এছাড়াও মোদি সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত প্রখ্যাত সাংবাদিক, রাজনীতিক, তাবড় কৃষক আন্দোলনের সমর্থকের নামও ছিল তালিকায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'কালী’ নামক একটি তথ্যচিত্রের পোস্টার নিয়ে তুমুল বিতর্ক। চলচ্চিত্রকার লীনা মনিমেকলেই ২ জুলাই ট্যুইটারে এই পোস্টার শেয়ার করেন। তারপর এই নিয়ে উত্তাল হয় দেশ। কী আছে এতে?
২০২১-এর প্রথম ছ’মাসের আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা রিপোর্টে ট্যুইটার জানায়, আইনের দোহাই দিয়ে লেখা তুলে নেওয়ার যত অনুরোধ-আদেশ তাদের কাছে জমা পড়েছে, তাতে ভারতের স্থান চতুর্থ। ওই ছ’মাসে তাদের কাছে ৪৩,৩৮৭টি আইনি নোটিসে ১,৯৬,৮৭৮টি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট হওয়া নির্দিষ্ট কিছু লেখা তুলে নেওয়ার নির্দেশ আসে বলে জানায় ট্যুইটার। এর মধ্যে ১১ শতাংশ নোটিস ভারত থেকে জমা পড়ে বলে জানানো হয়। ওই ছ’মাসে ট্যুইটারে অ্যাকাউন্ট ব্লকের হার ছিল ১০৬০ শতাংশ, যার জন্য ভারত সরকারের নির্দেশ অনেকাংশে দায়ী বলে জানায় ট্যুইটার। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মোদি সরকারের নির্দেশে ৫০০ অ্যাকাউন্ট চিরকালের জন্য বন্ধ করে দেয় ট্যুইটার। ওই বছর জুন মাসে সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের জন্য অতিরিক্ত অন্তর্বর্তী নির্দেশিকা তথা আচরণবিধি চালু করে মোদি সরকার। তার আওতায় অজস্র লেখা তুলে নিতে ট্যুইটারকে ৩৬ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। তার আগে, ওই বছর ফেব্রুয়ারি মাসেও মোদি সরকারের সমালোচক, কৃষক আন্দোলনের সমর্থক কয়েকশো অ্যাকাউন্ট তুলে নেওয়ার বাতিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
শুরুতে তাতে রাজি হননি ট্যুইটার কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বাধ্য করতে ভারতে কর্মরত ট্যুইটার আধিকারিক-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় মোদি সরকারের তরফে। ব্লগস্পটে তা নিয়ে সরব হন ট্যুইটার কর্তৃপক্ষ। মোদি সরকারের নির্দেশ ভারতের বাকস্বাধীনতা এবং ভিন্নমত পোষণ আইনের পরিপন্থী বলে জানায় তারা। সেই পরিস্থিতিতে ২৪ মে দিল্লি পুলিশ ট্যুইটারের দফতরে হানা দেয়। বিজেপি নেতা সম্বিত পাত্রের একটি লেখাকে ‘বিকৃত’ আখ্যা দেওয়া ঘিরেই ট্যুইটারের সঙ্গে মোদি সরকারের ঝামেলা শুরু হয় বলে জানা যায়। ট্যুইটারের সঙ্গে কংগ্রেসের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ তোলে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশে মুসলিম বৃদ্ধের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে লেখা, ভিডিও রাখায় ভারতে সংস্থার প্রধানকে জেরাও করতে উদ্যোগী হয় বিজেপি-শাসিত ওই রাজ্যের পুলিশ। সেই সময় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় ট্যুইটার। এর পর ২০২১-এর ২৬ মে নয়া ডিজিটাল আচরণবিধি কার্যকর করে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ফেসবুক-সহ (যাদের সঙ্গে বিজেপি-র আঁতাত নিয়ে সরব হয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও) একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ওই সংক্রান্ত লেখা, ভিডিও পোস্ট হলেও, বেছে বেছে শুধু ট্যুইটারকেই নিশানা করা হয়। এছাড়াও ভারতের মানচিত্র বিকৃত করার অভিযোগও তোলা হয় ট্যুইটারের বিরুদ্ধে।
এর পর ট্যুইটারকে টক্কর দিতে তাদের আদলে তৈরি দেশীয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘কু’ (Koo)-কে প্রাধান্য দিতে শুরু করে মোদি সরকার। নেতা-মন্ত্রী, শাসকদলের তাবড় নেতা, অনুগামীরা দলে দলে কু-তে যোগ দেন। ট্যুইটার বয়কটের ডাক ওঠে। ট্যুইটারও মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা খর্বর অভিযোগ তুলতে থাকে। ২০২১-এর জুন মাসেই ট্যুইটারের গ্লোবাল হেড বিজয়া গড্ডে জানিয়ে দেন, ট্যুইটার নিজের নীতিতেই অটল থাকবে। ভারত সরকার যে পদক্ষেপই করুক না কেন, বাকস্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করে যাবে তারা। তিনি বলেন, ‘‘ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী মনে হওয়ায় একাধিক নির্দেশ পালন করিনি আমরা। সমাজকর্মী, সাংবাদিক এবং বিরোধী দলগুলিকে নিশানা করা হচ্ছে, যা ভারতীয় আইনের পরিপন্থী। তাই সরকারি আপত্তি সত্ত্বেও বহু অ্যাকাউন্ট এবং পোস্ট সরাইনি আমরা।’’
এর পর ২০২১-এর নভেম্বর মাসে ট্যুইটার এবং মোদি সরকারের মধ্যে সংঘাত চরমে ওঠে। সংবাদমাধ্যম,।লেখক, সমাজকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে শামিল হন ট্যুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাক্তন সিইও জ্যাক ডর্সি। সেখানে দলিত সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে স্বক্ষেত্রে খ্যাত মহিলারাও শামিল ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে তোলা একটি ছবিতে জ্যাকের হাতে একটি পোস্টার লক্ষ করা যায়, যাতে লেখা ছিল ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী পিতৃতন্ত্র গুঁড়িয়ে দাও’। ছবিটি সামনে আসার পর দক্ষিণপন্থীরা কার্যতই জ্যাক এবং ট্যুইটারকে আক্রমণ করতে নেমে পড়েন। জ্যাক সাম্প্রদায়িক অশান্তিতে ইন্ধন জোগাচ্ছেন, কেন মুসলিম পিতৃতন্ত্রর কথা বলছেন না, এমন বাক্যবাণ ছুড়তে শুরু করেন সকলে। এর পর ট্যুইটারের তরফে বিবৃতি জারি করে ক্ষমাপ্রার্থনা করা হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, এক দলিত সমাজকর্মী ওই পোস্টারটি জ্যাককে উপহার দিয়েছিলেন। সেটি হাতে নিয়েই ছবি তোলেন তিনি। কারও পক্ষপাতিত্ব নয়, সব পক্ষের ভাবনা-চিন্তা অনুধাবন করাই সংস্থার নীতি।
তার পরও লাগাতার মোদি সরকারের সঙ্গে ট্যুইটারের সংঘাত বেধেছে। ২০২২-এর ২৮ জুন মাসে ট্যুইটারকে ফের একটি তালিকা ধরানো হয়। তাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের একগুচ্ছ অ্যাকাউন্ট এবং লেখা ব্লক করতে নির্দেশ দেওয়া হয় ট্যুইটারকে। ৪ জুলাইয়ের মধ্যে সেই কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে বলে নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রক। অন্যথায় ট্যুইটার কর্তৃপক্ষ জেল-জরিমানার আইনি রক্ষাকবচ হারাবেন, অপরাধ আইনে তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অলাভজনক ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন কেন্দ্রের এই নয়া ফরমানের বিরুদ্ধেই কর্নাটক হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন ট্যুইটার কর্তৃপক্ষ। এমনকি ট্যুইটারের কাছে এটাই শেষ সুযোগ বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ সংস্থার। তাতেই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি আদালতে গিয়েছে ট্যুইটার।







