গোরস্থানে অজানা এক 'মা'-এর কবর ঘিরে আজও দানা বেঁধে রয়েছে রহস্য

কবরখানার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন না। পুরনো নথি ঘেঁটেও এই মহিলার ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। তবে লোকমুখে শোনা যায় যে, এটাই এখানকার একমাত্র বেনামী কবর নয়।

Raktim Dey
৩ মিনিট
গোরস্থানে অজানা এক 'মা'-এর কবর ঘিরে আজও দানা বেঁধে রয়েছে রহস্য

'গোরস্থানে সাবধান'-এ সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরখানায় ঢুকতে গিয়ে লালমোহনবাবু বলেছিলেন, "ছোটবেলায় মেজজ্যাঠা বুঝিয়েছিলেন ওটাকে বলে গোরস্থান কারণ ওখানে গোরাদের সমাধি আছে। এখন মনে হচ্ছে নামটা হওয়া উচিৎ গেরোস্থান। এমন গেরোয় পড়েছি কখনও আগে?" লালমোহনবাবুর মেজজ্যাঠার গোরস্থানের নামের ব্যাখ্যার বিচার না করলেও অনেকেই জানেন যে, সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরখানার একটি কবরের ফলকে সত্যি গেরো রয়েছে।

'গোরস্থানে সাবধান' গল্পের একটি অলংকরণ। শিল্পী: সত্যজিৎ রায়

প্রায় তিনশো বছরের পুরনো আর্কিওলজিক‍্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া দ্বারা সংরক্ষিত এই সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরখানা। সেখানে প্রায় দুই হাজারের বেশি কবর রয়েছে। যদিও সেই দু'হাজারের মধ্যে ধাঁধার মতো লুকিয়ে একটি কবর। কবরখানায় ঢুকে সোজা গিয়ে বাঁদিকে একটু এগোলেই একটা ফাঁকা জায়গা আছে। সেই ফাঁকা জায়গায় রয়েছে ৩৬৩ নম্বর কবর। উইলিয়াম জোনস, হিন্দু স্টুয়ার্ট অথবা ডিরোজিওর কবরের মতো সাজানো না। খুবই সাদামাটা এবং যত্নের অভাব লক্ষ করা যায়। এই কবরের বিশেষত্ব রয়েছে তার ফলকে। নামের বদলে লেখা রয়েছে 'এ ভারচুয়াস মাদার।' এই ফলকে শুধু নাম নয়, মানুষটার জন্মসাল সম্পর্কেও কিছু লেখা নেই। শুধু রয়েছে একটা মৃত্যুসাল, ১৮২৫। কালের প্রকোপে এবং যত্নের অভাবে সেই ফলক প্রায় ভেঙে গিয়েছে, কিন্তু এখনও আবছাভাবে লেখাটা পড়া যায়।

সাধারণত প্রথমবার দেখে এই ফলকের গুরুত্ব বোঝা যায় না। মানুষের মনে হতেই পারে যে, ফলকে নাম না থাকাটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। একটু তলিয়ে ভাবলে এখানেই ফেলুদার মতো যে কারও মাথায় তিনটে খটকা লাগবে। প্রথমত, এই একটা কবর বাদে বাকি সব কবরেই নাম লেখা রয়েছে। কিছু কবরের ফলক ভেঙে গেলেও তাতে নাম ছিল। তাহলে এই কবরে নেই কেন? দ্বিতীয়ত, 'ভার্চুয়াস মাদার' থেকে প্রমাণিত হয় যে, কবরটি কোনও মহিলার। এই কবরখানায় বাকি যত মহিলার কবর রয়েছে, সব জায়গায় তাদের কারও স্ত্রী অথবা মেয়ে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের স্বামী অথবা বাবার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কেবলমাত্র এই একটিমাত্র কবরে স্ত্রী অথবা মেয়ে না, মহিলাকে মা বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তাহলে কি এই মহিলা সেই সময়ের সমাজের বিশেষ কেউ ছিলেন? তৃতীয়ত, এই কবরখানায় যখন কবর দেওয়া হতো, তখন ব্রিটিশ শাসন চলছে এবং কলকাতা তাদের রাজধানী। এই কবরখানায় কেবলমাত্র ব্রিটিশদের কবর দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকের কবরে তাঁদের পরিচয় ফলাও করে বলা থাকলেও এই মহিলা অথবা তাঁর পরিবার এই মহিলার পরিচয় কেন গোপন করেছিলেন? এই মহিলা কি এমন কিছু করেছিলেন, যার ফলে পরবর্তীকালে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

প্রশ্ন অনেক হলেও উত্তর কারও কাছেই নেই। জ্ঞানী গুগল এখানে খুব সহজেই হার মেনে নিয়েছে। কবরখানার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন না। পুরনো নথি ঘেঁটেও এই মহিলার ব্যাপারে কিছু জানা যায় না। তবে লোকমুখে শোনা যায় যে, এটাই এখানকার একমাত্র বেনামী কবর নয়।

প্রাচীন কলকাতার এই এলাকায় জঙ্গল ছিল এবং সেই জঙ্গলে মানুষখেকো বাঘ ছিল। জনশ্রুতি রয়েছে যে, এই এলাকায় অনেক মানুষ বাঘের পেটে গিয়েছিল। সেই সময় এই এলাকায় বাঘের আক্রমণে মারা যাওয়া অনেক মানুষেরই আধখাওয়া দেহ উদ্ধার হয়েছিল। সেই দেহের মধ্যে যেগুলো শনাক্ত করা যেত না, সেগুলো ওই জঙ্গলের মধ্যে বেনামী কবর দিয়ে দেওয়া হতো। এই এলাকায় যে জঙ্গল এবং বাঘ ছিল সেই তথ্যের সমর্থন পুরনো নথি থেকে পাওয়া যায়। কথিত আছে যে, শিয়ালদহ এলাকায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে মাটির নিচে অনেকগুলো সুন্দরী গাছের অংশ পাওয়া গিয়েছিল। প্রাচীন কলকাতার বাঘের নামের সঙ্গে শুধু এই এলাকা নয়, চৌরঙ্গী এলাকার নাম জুড়ে গিয়েছে। লোকমুখে শোনা যায় যে, সন্ধের পর চৌরঙ্গী এলাকার জঙ্গলে বাঘের ডাক শোনা যেত। বাঘ ছাড়াও বুনো মোষ, হায়না, নেকড়ে, বাঘরোল এক সময় কলকাতার বুকের বিস্তীর্ণ জঙ্গলে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াত। বাঘ, হায়না, বাঘরোল অথবা বুনো মোষের জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসার বহু ঘটনা শোনা যায়, যার মধ্যে বাগবাজারে রবার্ট ক্লাইভের সেনার ওপর বুনো মোষের দলের আক্রমণ খুবই পরিচিত একটা ঘটনা।

কলকাতা আজ আধুনিক হয়েছে। প্রাকৃতিক জঙ্গল ছেড়ে সে কংক্রিটের জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। মাটির ওপর এবং নিচের খোলনলচে পাল্টে ফেলে সে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে। তবুও কলকাতার আনাচকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে এইরকম না-জানা অনেককিছুই, যা পুরনো কলকাতার অজানা গল্প নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।