সোহরাবুদ্দিন থেকে অযোধ্যা, প্রধান বিচারপতি ইউ ইউ ললিতের উত্থানের নেপথ্যে যা কিছু
49 th chief justice of India: বিচারপতি ললিত (Uday Umesh Lalit) ১৩ আগস্ট, ২০১৪ থেকে ২৬ আগস্ট, ২০২২ পর্যন্ত; প্রায় ৮ বছর দেশের শীর্ষ আদালতের (Supreme Court Of India) অন্যতম বিচারপতি হিসেবে কাজ করেছেন।

দেশের শীর্ষ আদালতের ৪৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত। শনিবার সকালে রাইসিনা হিলসে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু শপথ বাক্য পাঠ করান নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি ইউ.ইউ ললিতকে। বিচারপতি ললিত (Uday Umesh Lalit) ১৩ আগস্ট, ২০১৪ থেকে ২৬ আগস্ট, ২০২২ পর্যন্ত; প্রায় ৮ বছর দেশের শীর্ষ আদালতের (Supreme Court Of India) অন্যতম বিচারপতি হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর শপথের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাক্তন হলেন দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি এনভি রমানা। যিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলা সামলেছেন, রায় দিয়েছেন কার্যকালের শেষদিন পর্যন্ত। নয়া প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েই দেশের বিচারব্যবস্থা এবং তাঁর সাম্প্রতিকতম অবস্থান নিয়ে মুখ খুলেছেন বিচারপতি ইউইউ ললিত।
যদিও বিচারপতি ললিতের (UU Lalit), প্রধান বিচারপতি (Chief Justice Of India) হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের অনেক আগে থেকেই জল্পনা চলছিল, তাঁর পরবর্তী প্রধান বিচারপতি হওয়া নিয়ে। শীর্ষ আদালতের অন্যতম কাউন্সিল (Senior Counsel) থেকে সরাসরি শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন উদয় উমেশ ললিত। যা সুপ্রিম-ইতিহাসে ৬ষ্ঠ। আগামী নভেম্বর পর্যন্ত নিজের পদে বহাল থাকবেন তিনি।
কিন্তু কে এই উদয় উমেশ ললিত? কী তাঁর জীবনের ইতিহাস? কেন বিতর্কও হয়েছিল তাঁকে নিয়ে? মহারাষ্ট্রের সোলাপুরের যুবক কী ভাবে হয়ে উঠলেন দেশের বিচারবিভাগীয় প্রধান?
১৯৫৭ সালের ৯ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের (তখন বম্বে) সোলাপুরে, বিচারপতি ইউআর ললিতের ঘরে জন্ম নেন উদয় উমেশ ললিত। বাবা ইউআর ললিত (UR Lalit), বম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চের সহকারী বিচারক ছিলেন, সঙ্গে আদালতের অন্যতম কাউন্সিল সদস্য। ঠাকুরদাদা রঙ্গনাথ ললিত সমকালের বিশিষ্ট আইনজীবী ছিলেন। এমনকি মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত জহরলাল নেহরু ঘনিষ্ঠ ছিলেন রঙ্গনাথ। সোলাপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসেও ভূমিকা ছিল আইন জগতের ললিত পরিবারের।
বরাবর আইন পরিবারের সদস্য উদয় উমেশ ললিতও আইনকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চান। ছোট থেকেই শখ ছিল আইনজ্ঞ হবেন তিনি। বাবা, ঠাকুরদাদার আদর্শে অনুপ্রাণিত উদয় ছোট থেকেই ছিলেন মেধাবী। নিজের এলাকায় স্কুলের পাঠ চুকিয়ে মুম্বইয়ের সরকারি আইন কলেজে ভর্তি হন তিনি। পড়াশুনা শেষ করে বম্বে হাইকোর্টের দোরগোড়ায় প্রবেশ করেন উদয় উমেশ। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই মহারাষ্ট্র এবং গোয়ার বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে নথিভূক্ত হন উদয় উমেশ ললিত। প্রখ্যাত আইনজীবী এম.এ রানে, যাঁর সামাজিক অবদান নিয়েও সেই সময় চর্চা ছিল ভারতজুড়ে। তাঁর অধীনেই শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে বিয়ে করেন বন্ধু অমিতাকে।
১৯৮৫ সাল নাগাদ আর মহারাষ্ট্রে নয়, এবার মুম্বই থেকে দিল্লি যান আইনজীবী উদয়। স্বপ্ন আইনজীবী হিসেবে নিজেকে বিশেষ করে তোলার। দিল্লি পাড়ি দিয়েই আইনজীবী হিসেবে কাজে যোগ দেন, নামজাদা আইনজীবী প্রবীণ পারেখের সঙ্গে। তারপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি, অভিজাত পরিবারের সন্তান, সোলাপুরের উদয় হয়ে উঠলেন পরিচিত। মেধাবী আইনজীবী। বড় সুযোগ এল সামনে। আইনজীবী হিসেবে ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২, প্রায় এই ৬ বছর কাজ করলেন দেশের প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল সলি সরব্জের সঙ্গে।
৩ মে, ১৯৯২। উদয় উমেশ ললিতের জীবন মোড় নিল অন্য পথে। দেশের শীর্ষ আদালতের আইনজীবী হিসেবে নথিভূক্ত হল তাঁর নাম। চলল লড়াই। একের পর এক মামলায় লড়াই। কোনও কোনও মামলায় জয়, আবার কোনও টাই হার। ভেঙে পড়েননি উদয় উমেশ। লড়েছেন। একটা সময় বদলে গেল সময়। নিজের যোগ্যতায় ২০০৪ সালের ২৯ এপ্রিল শীর্ষ আদালতের সিনিওর আইনজীবী হিসেবে নথিভূক্ত হলেন উদয় উমেশ ললিত।
প্রায় ৭ বছর এভাবে কেটে যাওয়ার পরে, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় লড়াইয়ের পর, তাঁর জীবন নতুনভাবে মোড় নিল ২০১১ সালে। 'টুজি স্পেকট্রাম দুর্নীতি'র (2G Spectrum Corruption) আবহে। দেশজুড়ে ওই দুর্নীতি নিয়ে তীব্র টানাপড়েন, তোলপাড়ের মধ্যেই দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় এবং জিএস সিংভীর ডিভিশন বেঞ্চ অভিজ্ঞ আইনজীবী উদয় উমেশ ললিতকে সিবিআইয়ের (CBI) বিশেষ আইনজীবী হিসেবে হিসেবে নিযুক্ত করলেন। সেই সময় মহামান্য বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, মামলার সঠিক এবং স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য ইউ.ইউ ললিতের এই নিযুক্তি।
দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ক্রমশ সামনে আসতে থাকে উদয় উমেশ ললিতের নাম। ২০১৪ সালে সোহরাবুদ্দিন মামলায় দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হয়ে মামলা লড়েছিলেন আইনজীবী ললিত। ওই বছরই শীর্ষ আদালতের কলেজিয়াম-প্রধান রাজেন্দ্র মল লোধার সুপারিশে শীর্ষ আদালতের বিচারপতি হিসেবে দায়ভার গ্রহণ করেন ইউইউ ললিত। এখানেও ইতিহাস গড়েন তিনি। দেশের ষষ্ঠ কাউন্সিল সদস্য, আইনজীবী হিসেবে সরাসরি শীর্ষ আদালতের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি।
২০১৭ সালের বিতর্কিত তিন তালাক (Triple Talaq) মামলায় পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের সদস্য ছিলেন বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত। বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ, আর.এফ নরিম্যান, জে.এস খেহার, আব্দুল নাজির; যাঁরা তিন তালাককে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন।
২০১৯ সালে অযোধ্যা মামলায় (Ayodhya Case) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বিচারপতি ইউইউ ললিত। কিন্তু পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন বিচারপতি ললিত। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংহ বিষয়ক বিতর্ক আদালতের সামনে আনেন ওই মামলার আইনজীবী রাজীব ধবন। তার পরেই সরে দাঁড়ান বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত। যা নিয়েও বিতর্কও হয়েছিল বিস্তর।
এমনকি ২০২০ সালের জুলাইয়ে পদ্মনাভস্বামী (Padmanabhan Temple) মন্দিরের অধীনতা নিয়েও বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রার সঙ্গে দুই বিচারপতির বেঞ্চে ছিলেন তিনি। ত্রিভাঙ্কর রাজ পরিবারের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দেন বিচারপতি উদয় উমেশ ললিতের ডিভিশন বেঞ্চ।
















