রক্তাক্ত পঞ্চায়েত: বাড়ছে মৃত্যুমিছিল, বোমাবাজি-গুলি-বিক্ষিপ্ত অশান্তি তবু পুনর্নির্বাচন 'নির্বিঘ্নেই'
West Bengal Panchayat Repoll 2023: সোমবার রাজ্যের ৬৯৬টি বুথে পুনর্নির্বাচন। ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হয়েছে সকাল থেকেই। প্রায় প্রতিটি বুথেও মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে উলুখাগড়ার প্রাণ যাওয়ারই কথা। তাই বলে উলুখাগড়াদের কথা ভেবে রাজারা তো আর যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন না? তাই রক্তমাখা পঞ্চায়েত শেষে ফের পুনর্নির্বাচনের সকাল হয়। ত্রস্ত, বিধ্বস্ত স্বজনহারানো ভোটাররা আবার ছোটেন ভোটকেন্দ্রে। গণপ্রতিনিধি বেছে আনবেন বলে। ভোটের রাতি পোহালেই সেই গণপ্রতিনিধি হয়ে যান রাজনীতিক কর্মী। যিনি কাটমানি খান, দুর্নীতি করেন, নিজের আখের গোছান। রাজনীতির ময়দানে এই সংখ্যাটা আজও নেহাৎ কম নয়।
তার পরেও গণতন্ত্রের 'মোচ্ছব' হয়। বাংলায় ভোট আসে, কেন্দ্রীয় বাহিনী আসে, আসে বহিরাগত, পিস্তল-বোমা। বুথে বুথে দেদার ছাপ্পা, বন্দুক নিয়ে শাসানি, বুথ দখলের লড়াই, অশান্তি, রক্তপাত, এ যেন ভোটপুজোর ঢাকের বাদ্যি। অন্তত এ রাজ্যের ভোটে তো বটেই। আর সে ভোট যদি পঞ্চায়েত হয়, তাহলে তো কথাই নেই। আরও একটা রক্তপাতের পঞ্চায়েত ভোট পেরিয়ে এল বাংলা। পঞ্চায়েত ভোটের দিনই এ রাজ্যে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৫ জনের। কমিশনের খাতা বলছে দশ। পঞ্চায়েত ভোটের ঘোষণা হতে না হতেই এ রাজ্যে ঢাকের বাদ্যি বেজে গিয়েছিল। জায়গায় জায়গায় অশান্তি, মারপিট, গুন্ডামি। ভোট এবং ভোটপূর্ব অশান্তি মিলিয়ে পঞ্চায়েত-হোমে এখনও পর্যন্ত আহুতির সংখ্যা চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। কমিশন, শাসক, বিরোধীদের মধ্যে সেই সংখ্যা নিয়ে খেলাধুলা চলছে, চলবে। এরই মাঝে আবার রমরমিয়ে চলে এল পুর্ননির্বাচন। এ রাজ্যে পুনর্নিবাচন যেন দুর্গাপুজোর পরে লক্ষ্মীপুজো, শীতের পরে বসন্তটি। 'ইফ ইলেকশন কাম, ক্যান রি-ইলেকশন বি ফার বাহাইন্ড?' গত কয়েক বছরের রেকর্ড বলছে, পারে না। এ যেন নিয়তি, অশান্তি কিংবা মৃত্যুর মতোই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Panchayat Poll 2023: বছরের পর বছর ধরে এমন অসংখ্য ভোট পার করে এসেছে বাংলা। রাজায় রাজায় লড়াই বেঁধেছে। আর রাস্তায় কেটে ছড়িয়ে পড়ে থেকেছে হাজার হাজার 'সস্তা' মানুষের শরীর। এ দৃশ্যের কোনও বদল নেই।
পঞ্চায়েতের যত বেশি বুথে পুনর্নিবাচন, বুঝে নিতে হবে, তত বেশি বুথের বুকে থেকে গিয়েছে অশান্তি, রক্তপাতের ছাপ। আর এই ভোটে সেই সংখ্যাটা কার্যত রেকর্ড। এ বছর পুনর্নির্বাচন হচ্ছে রাজ্যের অন্তত ৬৯৬টি ভোটে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন অঙ্কটা। আসলে এর চেয়েও বেশি সংখ্যক বুথ সেদিন অশান্তি, রক্তপাত দেখেছে। কোথাও মারা গিয়েছেন শাসক দলের কর্মী, কোথাও বিরোধী দলের নেতা। কোথাও বা সাতে পাঁচে না থাকা নিরিহ ভোটার, যে বা যাঁরা গণতান্ত্রিক দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার কর্তব্যটুকু পালন করতে এসেছিল সেদিন ভোটে। কোথাও বা অশান্তির জন্য জমিয়ে রাখা বোমায় হতাহত হয়েছে দুটি শিশু, যাদের ভোট-উৎসবে অংশগ্রহণের অনুমতিটুকুও নেই।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া এমন ভয়াবহ ভোট উৎসব আর কোথাও হয় কিনা বলা মুশকিল! কিন্তু এখানেই এগিয়ে বাংলা। সোমবার রাজ্যের ৬৯৬টি বুথে পুনর্নির্বাচন। ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হয়েছে সকাল থেকেই। প্রায় প্রতিটি বুথেও মোতায়েন করা হয়েছে কড়া নিরাপত্তা। নেমেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। অথচ শনিবার, পঞ্চায়েত ভোটের দিন তাদের টিকিটিও দেখা যায়নি। বরং কেন্দ্রীয় বাহিনীর বদলে সিভিক পুলিশের উপরেই বেশি আস্থা রাখতে দেখা গিয়েছিল রাজ্যের শাসক শ্রেণিকে। অথচ অশান্তি বাঁধলে কার্যত বুথ থেকে ৫০ মিটার দূরে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল তাদের। তবে এ বাংলায় ভোট শব্দটার সঙ্গেই যে অশান্তি শব্দটি জড়িয়ে রয়েছে, তা ভুললে চলবে কেন! ফলে পঞ্চায়েত ভোটের পরে পুনর্নির্বাচনও যে পুরোটাই শান্তিপূর্ণ হচ্ছে, তা বললে কিন্তু ভুল বলা হবে। পুনর্নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই জায়গায় জায়গায় দেখা গেল সন্ত্রাসের ছবি। কোথাও চলল প্রবল বোমাবাজি, গুলি, কোথাও হুমকি। কোথাও বিরোধী নেতার বাড়িতে চলল হামলা। কোথাও আবার ভোটচলাকালীন স্ট্রংরুমে ঢুকে পড়লেন প্রার্থী স্বয়ং। বহিরাগত ভোট থেকে ভুয়ো ভোটার, ব্যালট বাক্স লুঠের চেষ্টা থেকে পুলিশকে মারধর, কী নেই পুনর্নিবাচনে। যদিও বহু বুথেই কেন্দ্রীয় বাহিনী পেয়ে বুকে বল পেয়েছেন ভোটাররা। আর সেই ভরসা বুকে নিয়েই বুথমুখী হয়েছেন জনতা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Panchayat Election 2023: সমস্ত নিরাপত্তা সতর্কতার মুখে ছাই দিয়ে রেজিনগরে সকাল সকাল আরেক মৃত্যু প্রমাণ করে দিল, রক্ত থামবে না।

এদিকে আবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে অশান্তি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন রাজ্যের কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। একগুচ্ছ আবেদন রয়েছে তাঁর। রাজ্যের পঞ্চায়েত ভোট সুষ্ঠু ভাবে সম্পাদন করতে কেন প্রয়োজনীয় সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হল, সেই ঘটনার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, ভোটহিংসায় নিহতদের দেহ যাতে শান্তিপূর্ণ ভাবে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেন, সেই দাবিও তুলেছেন কংগ্রেস নেতা। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসার সমস্ত খরচ যাতে সরকার বহন করে, সেই আর্জিও তুলেছেন তিনি মামলায়। যদিও এসব বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনায় আমূল দিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। তাদের দাবি, এখনও পর্যন্ত মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ভাবেই মিটছে পুনর্নির্বাচন। আসলে এত রক্ত, এত লাশ দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি আমরা, ফলে সামান্য বোমাবাজি, গুলি কিংবা অশান্তিকে আর তেমন কিছু বলে মালুমই হয় না আমাদের। বরং এ সমস্ত কিছুকেই 'নিতান্ত ছোট ঘটনা' বলতেই শিখে গিয়েছি আমরা। তেমনটাই তো শেখানো হয়েছে আমাদের বিগত দশ-বিশ বছরে।
এই ব্যাপক হিংসা, তুমুল রক্তপাতের পঞ্চায়েত ভোট শেষে কী দাঁড়িয়ে রয়েছে রাস্তার শেষে? রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও কি এর প্রভাব পড়বে? বদলে যাবে সমীকরণ? কী বলছেন বিশেষজ্ঞেরা? ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের দিকে তাকালেই কিন্তু আমরা প্রায় একই রকম ছবি দেখতে পাব। পঞ্চায়েত ভোটকে কেন্দ্র করে ব্যাপক হিংসা, মারপিট, অশান্তি, রক্তপাত এ সমস্তটাই তো ২০১৮ সালের রদেভু আজকের বাংলায়। একই রকম ছাপ্পা, একই রকম মৃত্যুমিছিল এবং তার পর একই রকম পুনর্নির্বাচন। পঞ্চায়েত ভোটের সন্ত্রাসের জবাব এসেছিল পরবর্তী লোকসভা ভোটে। বিপুল ভাবে ব্যবধান কমিয়ে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল বিজেপি। বাম-কংগ্রেস জোট কিছুটা ভোট কেটেছিল বলে বাঁচোয়া, নাহলে এ বাংলায় মুখ পুড়তেই পারত তৃণমূলের। কারণ পঞ্চায়েত ভোট জুড়ে হিংসায়-রক্তপাতে যে গর্ত খুঁড়ছে শাসক দল, সে গর্তে মাটি ফেলেই গ্রামাঞ্চলে মানুষের মন জেতার চেষ্টার করবে বিরোধীরা।
গত বারের সেই অশান্তির পরেই পার্টিকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্য়মন্ত্রী ও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানিয়ে দিয়েছিলেন, পঞ্চায়েত ভোট ঘিরে হিংসা ছড়ানোর কোনও রকম চেষ্টাকে রেয়াত করবেন না তিনি। কড়া ব্যবস্থা নেবেন বলেও হুঙ্কার ছেড়েছিলেন তিনি। তবে সেই হুঁশিয়ারির মেয়াদ বোধহয় ছিল তার পরের ক'দিনই। কারণ এ বছর পঞ্চায়েত ভোটে তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পেলাম না এতটুকু। বরং পঞ্চায়েত-হিংসার গুঁড়ো উড়ে এসে লাগল পুর্ননির্বাচনের চোখেও। 'ছোটো ঘটনা', 'সামান্য ঘটনা' বলে চোখ বুজে নিলাম আমরা। বড় বড় দেশে এসব হয়। নাহলে বাঙালির রাজনীতিপ্রিয় জাতি হিসেবে কীসের নাম! মাঝখান থেকে মাঝমাঠে চলে গেল কিছু নিরপরাধ প্রাণ। অবশ্য এমনটাই ঘটে। বড় বড় কাজে এমন ছোটখাটো প্রাণ যায়ই। 'কোলাটোরাল ড্যামেজ' যাকে বলে আর কি!






