পাঠকমন, কী নির্জন
পাঠ আসলে একটা অসীমের দিকে যাত্রাশুরু। চিরনিরুদ্দেশ হওয়ার প্রতিশ্রুতি। নিজেকেই দেওয়া কথা।

বইমেলায় যারা বই দেখছি, কিনছি, তারা কেউই পাঠক নই। তাহলে আমরা কারা? কেন আমরা জড়ো হই মেলামাঠে? বই-দোকানে ঘুরি, চোখ চকচক করে ওঠে দু'একটা বই দেখে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে সূচিপত্র দেখি, সুবিধেমতো কিনেও নিই বইপত্তর। আমরা কারা? এই এত বই, তার মাঝখানে আমি ভ্রমি বিস্ময়ে, এই আমিটা তাহলে কে? যে বই দেখে, কেনে, সে যদি পাঠক না হয়, পাঠক তবে কে? দার্শনিক ভাবে পাঠকমনটিকে নিয়ে ভাবা যায় না? পাঠের ইতিহাসর দিকে তাকিয়ে পাঠ আর পাঠককে আলাদা করা যায় না? মেলা থেকে ফেরার পথে ভাবি।
হুজুগে মেলাঘুরে বাদ দিলে, বইমেলায় যায় এক অনুসন্ধানী মন। কালেক্টর, সংগ্রাহক, তাকে যে নামেই ডাকো, সে একজন জোগাড়ে। সে একজন ভাগ্যান্বেষী। সে ভাবে, পাইলেও পাইতে পারি অমূল্যরতন। তাকে ভাবাচ্ছে বাজার, প্রতিনিয়ত প্রচার, নানা প্রলোভন, আলো। আর ভাবাচ্ছে একজন, যে জন আছে অন্তরালে। সে-ই তাকে ফাইফরমাশ খাটতে বের করেছে। যে বসে আছে সবার অলক্ষ্যে, বইঘরে। ঘুরে ঘুরে বইসফর সেই অপেক্ষমান অস্তিত্বের জন্যে। মেলাঘুরে বই কেনে এই পাঠকমন নামক চরিত্রটিকে সন্তুষ্ট করার অভীপ্সায়। পাঠকমনই আমার শরীরকে ঠেলে মেলায় পাঠায়। ওই অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে যে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে পাঠক নয়। যে বই বগলদাবা করে বাড়ি ফিরছে, সে প্রকাশকের খদ্দের, পাঠকের পোস্টম্যান। পাঠক নয় সে। সে কিনছে- পাঠক নামক একটি সত্তাকে সন্তুষ্ট করতে। তাকে আয়োজনটা বুঝিয়ে দিতে। তার জন্যে একটি নিরিবিলি, ব্যক্তিগত মুহূর্তের বন্দোবস্ত করা হলো, এই বার্তা দিতে।
আমার শরীর মেলায় গিয়ে যা কিনে এনেছে, এই বৈভব হাতের সামনে পেয়েই পাঠকমন রসাস্বাদনে নেমে পড়বে এমন ব্যাপার নয়। সে দেখে। সে প্রস্তুতি নেয়। একটি পাঠক্রম সে সাজায় নিজের মতো করে। কখন কোন বইয়ে তার অবগাহন ঘটবে, তা নির্ভর করছে তার পাঠের ইতিহাস, সময়, সামাজিক বোঝাপড়া, রাজনৈতিক বোধের উপর। সে পড়বে একা, নিজের ঘরে, গোপনে, নগ্ননির্জন হয়ে। যে ঘুরে দেখে বই কিনে এনেছিল আর বই যে পড়ছে-তারা দু'জন যেন আলাদা লোক। এখন এই পাঠসময় যখন সমাগত, ওই ক্রেতাটির সঙ্গে পাঠকমনের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়েছে। দরকারে তাকে আবার বাজারে পাঠানো যাবে। কবে থেকে সে পড়ছে?
সেন্ট অগাস্টিন কনফেশনস-এ, তাঁর মায়ের পরামর্শদাতা বন্ধু, মধ্য-চল্লিশের এক যাজক অ্যামব্রোজের কথা তুলে আনেন। মিলান শহরের যাজক অ্যামব্রোজ। কনস্ট্যানটাইনের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে অগাস্টিন রোমে যান। রোমে তিনি খুব সুবিধে করতে পারেননি, কয়েক বছরের মধ্যেই মিলানে চলে যান। মিলানেই তাঁর পরিচয় শহরের বিশপ অ্যামব্রোজের সঙ্গে। অগাস্টিনের অনুতাপ, তিনি অ্যামব্রোজকে ধর্মবিশ্বাস সংক্রান্ত বহু প্রশ্ন করতে পারেননি। কারণ, খাওয়া এবং মানুষের সঙ্গে কথাবার্তার সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টা তিনি পড়েন। কেমন দেখায় তাঁকে? অগাস্টিন বলছেন,
উনি যখন পড়েন, ওঁর চোখ প্রতিটি পাতা ছানবিন করে, ওঁর আত্মা অর্থ অনুসন্ধান করে। উনি পড়েন নীরব হয়ে। ওঁর জিভ স্থবির হয়ে যায়। অবশ্য যে কেউ ওঁর কাছে যেতে পারে। কারণ উনি জোরে জোরে পড়েন না। নীরবে, একমনা হয়ে পড়েন।
যার চোখ আর আত্মা একসঙ্গে সক্রিয়, যে পৃথিবীর লয়ের বিপ্রতীপে স্থির, ভিড়ে যার মন নেই, যার কোনও শারীরিক সরণ নেই, অগাস্টিনের চোখে সেই পাঠক। অগাস্টিন কেন তাঁর কথা এত ঘটা করে লিখলেন? কেনই বা তাঁর কথা বলছি? কারণ, সে সময়ে পাঠনিভৃতি, ব্যক্তিপাঠক সত্তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। সকলেই ভিড়ে, জোরে জোরে পড়ত। শুধু পাশ্চাত্যেই নয়, প্রাচ্যে, এই ভারতে রাজসভায়, টোলে জোরে পড়াই ছিল দস্তুর, রাজাকে সংবাদ পড়ে শোনাতেন দূত। অগাস্টিনকে টানে অ্যামব্রোজের নিভৃতপাঠ। সাহিত্যে চোখ রাখলে পাশ্চাত্যে প্রথম নিভৃত পাঠকের দৃষ্টান্তই তিনি। এমনইই নীরব-নিভৃত পাঠের উদাহরণ রয়েছে, প্লুটার্কের বর্ণনায়। তিনি দেখান, আলেকজান্ডার নীরবে মায়ের চিঠি পড়ছেন, রাজপেয়াদারা এই দৃশ্য দেখে কার্যত অবাক। মধ্যযুগ পর্যন্ত লেখকরা ভেবেছেন, তাদের লেখা সমবেত ভাবে পড়া হবে। পাঠক একক, নিভৃত হয়েছেন ক্রমে। পাঠ ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে ক্রমে, একক পাঠ-পরিসর গড়ে তোলা, আধুনিকতার একটি অন্যতম লক্ষণ।
১৮৮৬ সালে ফরাসি শিল্পী এমানুয়েল বেনের নগ্নিকা মেরি ম্যাগদালেনকে আঁকলেন। প্রবল যৌন আবেদন সেই আশ্চর্যময়ীর। তিনি মরুভূমির গুহায় লুকিয়ে আছেন। ছবিতে তাঁর আসল পরিচয় তিনি একজন পাঠক। তিনি জোরে পড়ছেন না, একা পড়ছেন, পাঠের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। বাইরে কী হচ্ছে, এমনকী গুহার মধ্যেই অন্যত্র কী ঘটছে, তিনি জানেন না, তার অভিনিবেশ শুধুই অক্ষরে।

পাঠরতা মেরি ম্যাগদালেন
একজন পাঠক হোর্হে লুইস বোর্হেস। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে সম্পূর্ণ দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন বোর্হেস। তাঁর পাঠ আর দৃষ্টিনির্ভর রইল না। শ্রুতিনির্ভর হয়ে গেল। কিন্তু বুঝতে হবে দৃষ্টি বা শ্রুতি- ইন্দ্রিয়সামর্থ্যের উপর পাঠক হয়ে ওঠা নির্ভর করে না। নির্ভর করে বিচ্ছিন্নতার শক্তির উপর, নীরব এক সংলাপে দখলদারির উপর। তাই এদোয়ার্দো কোমাসনার তোলা বোর্হেসের ছবিতে দেখি তিনি চোখ বুঝে একমনা হয়ে রয়েছেন। তাঁর সমস্ত মন যেন গিয়ে পড়েছে একটি বিন্দুতে। পাঠে। তিনি শুনছেন, পড়ছেন, ভাবছেন। দর্শনের পরে কর্টেক্সে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটার কথা, সেই একই ঘটনা ঘটছে তিনি শোনার পর।

একটি পাঠমুহূর্তে হোর্হে লুই বোর্হেস।
পাঠক আর পাঠ একটা সময় অন্তর্লীন, এক হয়ে যায়। দেকার্তে সেই কবে বলেছেন, আই থিংক দেয়ারফোর আই অ্যাম। আমি ভাবি, আর সেই ভাবনাই আমার সত্তা। আমি তা-ই যা আমি ভাবি। আর আমায় ভাবায় কে? আমার পাঠ। সুতরাং, আমি আর আমার পাঠ আলাদা নই, এক। মনে পড়ছে, চার্লস ল্যাম্ব বলছেন,
আমি পড়ছি। আমি স্থির হয়ে বসে ভাবতে পারি না। আমি শুধু পড়ি। বই আমার হয়ে ভাবে।
আমি আমার পড়া এক হয়ে যে যাত্রাপথের আনন্দগান তার কোনও শেষ নেই। আমার সামগ্রিক পাঠ আমার অন্তরে একটা মহাগ্রন্থের জন্ম দিয়েছে। আমি যা বলছি, যা করছি, যে ভাবে দেখছি তার অনেকটাই এই মহাগ্রন্থের কোনো অধ্যায় থেকে শেখা। এই মহাগ্রন্থ পুড়ে ছাই হবে আমার মরণে। প্রত্যেক পাঠক আসলে অন্তরে এমন একটি গ্রন্থ বহন করেন যা অনন্য, যা তাঁর সঙ্গেই ক্রমে যেন ফুটে ওঠে।
একটি নিভৃতঘর, একজন পাঠক আর তাঁর কাঙ্খিত বই-এ এক সংলাপের ব্যবস্থা। যে প্রিয় লেখকের বই পড়ছে নিভৃতে, সে একটা লম্বা কথাবার্তায় জড়িয়ে পড়ছে। সে জানে এই লেখাটা সে লিখতে পারবে না, চাইবেও না। কিন্তু পাঠকসত্তা তাকে বড় অধিকার দিয়েছে। সংলাপের অধিকার দিয়েছে। সে মনে মনে বইটির সঙ্গে, চরিত্রগুলির সঙ্গে কথা বলে, কথা বলে লেখকের সঙ্গে। এমনকী বইটি ফুরিয়ে যাওয়ার পরে, সারাজীবন এই সংলাপ জারি থাকতে পারে। সে নিরুচ্চারে জানিয়ে দেয় তার চাওয়াপাওয়া। বইটির লেখক-চরিত্র পাঠকের কাছে এক ধরনের পরিত্রাণ-অভ্যাস। প্রতিটি পাঠ একজন পাঠককে একটু একটু করে বদলে দেয়।
পাঠক কি স্রেফ বইয়ে রাখা অক্ষর-শব্দ বিন্যাসে ঘোরে? মনে হয় না। বইপড়ার মধ্যে রয়েছে একটা না-পড়াও। একজন পাঠক একটি বইয়ের কাছে যাচ্ছেন মানে তিনি কিছু সময়কে বন্দি করতে চাইছেন। এর মধ্যে পড়া ছা়ড়াও রয়েছে ভাবার সময়, যে কথা বলা হলো না তা খোঁজার সময়। বইয়ের সাদা অংশে, যেখানে কিছুই লেখা হয়নি সেখানে নিজের বোঝাপোড়া লিখে রাখার সময়। বই বন্ধ করে আরও কিছুক্ষণ ভাবার সময়। যা পড়লাম, জীবনছন্দে তাকে লালন করার মহাসময়। পাঠ আসলে একটা অসীমের দিকে যাত্রাশুরু। চিরনিরুদ্দেশ হওয়ার প্রতিশ্রুতি। নিজেকেই দেওয়া কথা।
বইমেলা থেকে বাড়ি ফিরেছি। আমি, যে ক্রেতা, মেলাঘুরে, বই-বাজারের খদ্দের, ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণে আমার মৃত্যু আসন্ন, ঘাতক এই পাঠকমন। এই শীতের রাত, পাঠকমনের জেগে ওঠার আদর্শ সময়।
















