বর্ষার আগেই কেন ভারতে ডেঙ্গুর আশঙ্কা বাড়ছে?
India dengue: বর্ষা শেষ হলেও কেন থামছে না ডেঙ্গুর প্রকোপ? জলবায়ু পরিবর্তন ও বদলে যাওয়া আবহাওয়ার কারণে কি ভারতের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে? কেন বছরের প্রায় সব সময়েই বাড়ছে সংক্রমণ, আর এই ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?
ভারতে ডেঙ্গু আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়। একসময় জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ত, আর শীত পড়তেই সংক্রমণ কমে যেত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বছরের প্রায় সব সময়েই ডেঙ্গুর রোগী পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, যে সব অঞ্চলে আগে এই রোগ খুব একটা দেখা যেত না, সেখানেও এখন ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং মশার পরিবর্তিত বিস্তারের ফলে ভারতের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নতুন ও আরও জটিল রূপ নিচ্ছে।
গত দুই দশকে ভারতে ডেঙ্গুর বিস্তার এমনভাবে বেড়েছে যে এটিকে এখন দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে যেখানে কয়েক হাজার ডেঙ্গু সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় আরও অনেক বেশি হতে পারে, কারণ দেশের বহু এলাকায় এখনও যথাযথ রিপোর্টিং ব্যবস্থা নেই।
ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস ইজিপ্টি মশা। এই মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির জলে বংশবিস্তার করে। আগে বর্ষাকালে জমে থাকা জল তাদের প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। শহরের ছাদে রাখা জলের ট্যাঙ্ক, নির্মাণস্থলে জমে থাকা জল, প্লাস্টিকের পাত্র, পুরনো টায়ার কিংবা বাড়ির আশপাশের ছোট জলাশয় সারা বছরই মশার বংশবিস্তারের সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে বর্ষা শেষ হলেও মশার সংখ্যা কমছে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dengue Symptoms: চক্ষুবিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গিতে সাবকনজাংটিভাল হেমারেজ, ম্যাকুলার কোরিওরিটিনাইটিস, ম্যাকুলার এডিমার মতো মারাত্মক কিছু চোখের সমস্যা হতে পারে। যা ক্রমশ চোখ নষ্ট করে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পিছনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় কারণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার জীবনচক্র দ্রুত হচ্ছে এবং ভাইরাসও দ্রুত ছড়াতে পারছে। আগে যে তাপমাত্রায় মশার বংশবিস্তার সীমিত থাকত, এখন সেই বাধা অনেকটাই কমে গিয়েছে। দীর্ঘায়িত বর্ষা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উষ্ণ আবহাওয়া মশার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, বরং বছরের প্রায় প্রতিটি মাসেই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। একসময় ডেঙ্গু মূলত বড় শহর ও সমতল অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন পাহাড়ি এলাকাতেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে মশা নতুন নতুন অঞ্চলে টিকে থাকতে পারছে। ফলে আগে যেসব এলাকা ডেঙ্গুমুক্ত বলে মনে করা হতো, সেখানেও এখন সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।
দ্রুত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। ভারতের শহরগুলি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সেই হারে উন্নত হয়নি নিকাশি ব্যবস্থা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নির্মাণকাজের জন্য তৈরি হওয়া অসংখ্য জল জমার স্থান মশার প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। শহরতলি এবং আধা-শহুরে এলাকাগুলিতে এই সমস্যা আরও বেশি। ফলে ডেঙ্গু শুধু মহানগর নয়, ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Dengue Update Kolkata: নতুন উপসর্গের পাশাপাশি চিকিৎসকদের চিন্তার কারণ ডেঙ্গুর ডেন থ্রি প্রজাতি। ডেন থ্রি আক্রান্তরা বেশীরভাগই উপসর্গহীন। থাকছে না জ্বর।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক ধরন বা সেরোটাইপ রয়েছে। একজন ব্যক্তি একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে আবার সংক্রমিত হতে পারেন। দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে রোগের জটিলতা বাড়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে। চিকিৎসকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন সেরোটাইপ একসঙ্গে ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই সতর্ক করছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে ভারত বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, জলবায়ুগত পরিবর্তন এবং নগরায়ণের চাপ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ শুরুতে সাধারণ জ্বরের মতোই মনে হতে পারে। জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, শরীরে তীব্র যন্ত্রণা, বমি ভাব এবং দুর্বলতা এর সাধারণ উপসর্গ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত গুরুতর রূপ নিতে পারে। রক্তে প্লেটলেট কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো জটিলতা প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের আগে ডেঙ্গু হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র এখনও প্রতিরোধ। বাড়ির আশপাশে কোথাও জল জমতে দেওয়া যাবে না। সপ্তাহে অন্তত একবার জল সংরক্ষণের পাত্র পরিষ্কার করতে হবে। মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা পোশাক পরা এবং মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সরকারি ফগিং বা ওষুধ ছিটিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। জনসচেতনতা এবং স্থানীয় স্তরে সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ডেঙ্গু সংকট আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কী ভাবে মানুষের স্বাস্থ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করছে তার একটি বড় উদাহরণ। তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে শুধু ডেঙ্গুই নয়, আরও নানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই ডেঙ্গুকে শুধুমাত্র একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সময় শেষ। বর্ষা এলেই সতর্ক হওয়ার দিন শেষ। এখন বছরের প্রতিটি সময়েই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।






