বিশ্বকে আরও একটা যুদ্ধের সামনে ঠেলে দেওয়া কেন? পুতিনের সাফাইয়েই লুকিয়ে উত্তর

Sindhu Som
৩ মিনিট
বিশ্বকে আরও একটা যুদ্ধের সামনে ঠেলে দেওয়া কেন? পুতিনের সাফাইয়েই লুকিয়ে উত্তর

রাশিয়ান আক্রমণের প্রথম দিনেই ইউক্রেনের ১৩৭ জন সেনা ও নাগরিক মারা গিয়েছেন, শয়ে শয়ে মানুষ আহত। ক্রমেই মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। স্থলপথে, জলপথে এবং আকাশপথে গত বৃহস্পতিবার রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। প্রসঙ্গত দীর্ঘদিন ধরেই এই আক্রমণের পরিকল্পনার দাবিকে নস্যাৎ করে আসছিলেন পুতিন। কিন্তু সম্প্রতি রাশিয়ার জনগণের উদ্দেশ্যে টেলিভিশনের একটি ভাষণে সাফ যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি।

ভাষণে নিজের অবস্থান নিয়ে সম্পূর্ণ পরিষ্কার পুতিন। রাশিয়ার ‘সম্মৃদ্ধ জারশাসনে’র উল্লেখ করে ইউক্রেনকে রাশিয়ারই অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, ইউক্রেনকে রাশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মিক ক্ষেত্রটির অন্যতম অংশ বলেও দাবি করেন। তাঁর বয়ান অনুযায়ী, “আধুনিক ইউক্রেনের জনক রাশিয়া। বিশেষত বলশেভিক কম্যুনিষ্ট দলের অবদান সবটাই। ১৯১৭-র বিপ্লবের পরপরই এর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু লেনিন এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা ইউক্রেনকে রাশিয়া থেকে আলাদা করে দিয়ে ঘোরতর অবিচার করলেন। ঐতিহাসিক ভাবে এ রাশিয়ার মাটি। রাশিয়ার প্রতি, রাশিয়ার মানুষের প্রতি এই অবিচার লেনিনের শুধু বিরাট বড় ভুলই নয়, আরো নিকৃষ্টতর যদি কিছু থাকে, তবে তাই। ১৯৯১-এ সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে এটা সবাই হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। …কিন্তু তারপরেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমানে যে ইউক্রেনকে আমরা দেখছি, তা সম্পূর্ণ লেনিনের হাতে গড়া। …স্ট্যালিনের আমলে কম্যুনিষ্ট পার্টির মতাদর্শকে এক এবং অদ্বিতীয় করে তোলা, সম্পূর্ণ ক্ষমতা কম্যুনিষ্ট পার্টির আওতায় আনা, পরিকল্পিত অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয়করণ–এ সমস্তই ইতিপূর্বে সরকারের ঘোষীত নীতিগুলিকে শুধুমাত্র খাতায় কলমে ঠেলে দিয়েছিল। বাস্তবে ইউনিয়ন রিপাবলিকে কারো কোনও মৌলিক অধিকার ছিল না। শক্ত হাতে একীভূত একটি মাত্র রাষ্ট্র ছিল তখন। …কিন্তু স্ট্যালিনকে করুণা করি। আমাদের রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ভিত ওঁর বিপ্লবী স্বপ্ন আর ইউটোপিয়ায় ভেসে গেল। যতটা সাফ-সুতরো করা যেত, তার কিছুই হল না। এসব দুর্বলতা সমস্ত রাষ্ট্রকে শেষ করে দেয়। আর আজ এই অকৃতজ্ঞ সন্তান লেনিনের মূর্তি উপড়ে ফেলছে? বলছে ‘ডিকম্যুনাইজেশন’? দেখতে চাও সত্যি সত্যি ‘ডিকম্যুনাইজেশন? আমরা দেখিয়ে দিচ্ছি। হচ্ছে যখন পুরোটাই হোক।”

পুতিনের মতে ইউক্রেনের পৃথক পরিচিতি সম্পূর্ন ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়াই হবে তাদের ‘ডিকম্যুনাইজেশনে’র দাবির প্রতি সুবিচার।

যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই আক্রমণের নেপথ্যে রয়েছে আরো গুরুতর কারণ। ইউক্রেন একটি গণতান্ত্রিক দেশ, যার জনসংখ্যা ৪ কোটি ৪০ লক্ষ। রাশিয়ার পরে এটি ইউরোপের বৃহত্তম দেশ। হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে ইউক্রেনের। সোভিয়েতের পতনের পর মস্কৌর শাসনের অধীনে থাকতে তারা অস্বীকার করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও নেটোয় যোগ দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছে তার সময়ে সময়ে। এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ পুতিন পশ্চিমের দেশগুলি এবং ইউক্রেনের কাছে দাবি করেন, কোনোমতেই ইউক্রেন যেন নেটোর সঙ্গে যুক্ত না হয়। সেই দাবি ইউক্রেনকে সেনাহীন এবং নিউট্রাল স্টেট করে ফেলা অবধি পরিবর্ধিত হয়।

কিন্তু গত বছর জানুয়ারিতে ইউক্রেনিয়ান প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেন্সকি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের কাছে আবেদন করেন যেন ইউক্রেনকে নেটোতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন পুতিন। ইউক্রেনের মতো আয়তনে বিশাল প্রতিবেশী দেশ ইউরোপের কোনও জোটের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারটিকে ভালোভাবে নেয়নি রাশিয়া। আসলে ইউক্রেনকে এমন একটা দেওয়াল বলে মনে করা হয় যার দু'প্রান্তে বিশ্বের দুই অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তির অবস্থান। এছাড়াও কয়েক শতক রাশিয়ান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকায় একে এখনও নিজের ক্ষমতাধীন মনে করে থাকে রাশিয়া। এমনকি জন্মপরিচয়ে ইউক্রেনিয়ান–এমন বহু ব্যক্তির মাতৃভাষা রাশিয়ান। সোভিয়েত রিপাবলিকে থাকা বেশিরভাগ দেশই এখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা নেটোয় যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪র বিদ্রোহে যখন ইউক্রেনের রাশিয়া-প্রেমী রাষ্ট্রপতির পতন হয়, তখন থেকেই প্রমাদ গুনছে রাশিয়া।

সে সময়েই ইউক্রেনের ক্রিমিন অঞ্চল দখল করে নেয় রাশিয়া। যদিও তা সরাসরি হামলা ছিল না। তবে পরের মাসেই এই অঞ্চলের বিচ্ছিন্নবাদীরা ইউক্রেনের সীমারেখা থেকে মুক্ত হয়ে রাশিয়ায় যুক্ত হতে চাইলে, মস্কৌ তাতে সায় দেয়নি। রাজনৈতিক ভাবে এই অঞ্চলটিকে বেনামী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল তাদের, যা দিয়ে ভয় দেখিয়ে রাশিয়াকে আটকে রাখা যাবে নেটোর প্রলোভন থেকে। যদিও ইউক্রেনের তরফ থেকে বারবার অভিযোগ উঠেছে যে রাশিয়া বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নানাভাবে সাহায্য করছে, কিন্তু এ পর্যন্ত সে সবই উড়িয়ে দিয়ে আসছিল রাশিয়া।

সেবারও ট্যাঙ্ক নিয়ে, ভারী অস্ত্রাদি সমেত যুদ্ধবিমানে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হামলা চালিয়ে ছিল। যুদ্ধচলাকালীন ১৭ জুলাই, মালয়েসিয়া এয়ারলাইন ১৭ নামক বিমানটিকে উড়িয়ে দেয় হামলাকারীরা। ২৯৮ জন যাত্রীর প্রত্যেকে মারা গিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক তদন্তে উঠে আসে ব্যবহৃত মিসাইলটি রাশিয়াই সরবারহ করেছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের। কিন্তু সেবারও সমস্ত যোগাযোগ অস্বীকার করে মস্কো। কিন্তু এবার আর রাখঢাক নেই। সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে একটি লম্বা ভাষণে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি সাজিয়ে তারপরই আক্রমণ করেছেন পুতিন।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।