বুথে বুথে উত্তেজনা, রেকর্ড ভোটদান | দ্বিতীয় দফায় যা দেখল বাংলা
West Bengal Assembly Election 2026: শেষ দফার ভোটে রেকর্ড ছুঁল বাংলা, প্রায় ৯২.৪৭ শতাংশ ভোটদান। সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন, গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। দ্বিতীয় দফায় যা দেখল বাংলা
বুধবার সকাল সাতটা থেকে শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটগ্রহণ। দিন যত গড়িয়েছে, তত ভোটদানের হার বেড়েছে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের হিসেব বলছে, রাজ্যের ১৪২টি আসনে ভোট পড়েছে ৮৯.৯৯ শতাংশ। অর্থাৎ কার্যত ৯০ শতাংশের দোরগোড়ায়। ২০১১ সালের ৮৪.৩৩ শতাংশের পুরনো রেকর্ড অনেকটাই পিছনে পড়ে গিয়েছে। প্রথম দফাতেও নজিরবিহীন ভোট পড়েছিল, দ্বিতীয় দফাতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকল।
এ বারের ভোটে সকাল থেকেই বুথে বুথে লাইন ছিল। বৃষ্টি মাথায় নিয়েও মানুষ দাঁড়িয়ে থেকেছেন। শহর-গ্রাম সর্বত্র একই ছবি। সাধারণত শেষ দফার ভোটে দুপুরের পর গতি কিছুটা কমে। কিন্তু এ দিন তা হয়নি। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে পূর্ব বর্ধমানে, ৯২ শতাংশেরও বেশি। তার পরেই হুগলি, নদিয়া। তুলনায় কম হলেও দক্ষিণ কলকাতাতেও ভোট পড়েছে আশাতীত। কেন এত ভোট? শুধুই কি নতুন সরকার গড়ার প্রশ্ন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এ বারের এই রেকর্ড ভোটদানের পিছনে মূলত দু'টি কারণ কাজ করেছে। প্রথম কারণ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা, ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ এবং বিরোধীদের মেরুকরণের প্রচার—সব মিলিয়ে অনেকের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ভোট দিতে না গেলে বা ভোট না দিলে বিপদ হতে পারে। সেই আশঙ্কা মানুষকে বুথমুখী করেছে। দ্বিতীয় কারণ, উত্তরবঙ্গের প্রথম দফার পর দক্ষিণবঙ্গের শেষ দফার ভোটে মহিলা ভোটারদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বেশি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মহিলাদের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারের বিভিন্ন ভাতা ও প্রকল্পের প্রভাব এ বারের ভোটে পড়েছে। অনেক মহিলা ভোটার সেই কারণেই বেশি সংখ্যায় বুথে গিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকে আবার 'অভয়া ফ্যাক্টর'কেও সামনে আনছেন।
পানিহাটি এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০২১ সালে সারাদিনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৭৮.৫ শতাংশ, এ বার বিকেল ৫টা পর্যন্তই ভোট ৮৯.৫৬ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলেছিল। শুধুমাত্র এই কেন্দ্রেই ১০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, অভয়ার জন্যই ঢেলে ভোট দিল পানিহাটি?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জেলা সদর এবং মফস্বলীয় শহরাঞ্চলের এক বড় অংশ চিরাচরিত কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বা পারিবারিক জমি ভিত্তিক যৌথ জীবনযাপন থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। অন্য এক অংশ শহরের কারখানা নির্ভর যে নিশ্চিন্ত জীবনযাপন ছিল, তা থেকেও বেশ কিছুকাল ধরে বিচ্যুত। বাদবাকি অংশগুলিও এখন নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
এই দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪২টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর ছিল দু’টি কেন্দ্রে—পানিহাটি এবং ভবানীপুরে। পানিহাটিতে একদিকে ছিল তৃণমূলের শক্তিশালী সংগঠন, অন্যদিকে বিজেপির জোরালো প্রচার। এই টানটান রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রভাব ভোটের দিনও স্পষ্ট দেখা গেল। সকালের পর থেকেই বুথে মহিলাদের দীর্ঘ লাইন, যুব এবং বৃদ্ধ ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।
অন্য দিকে ছিল ভবানীপুর। এই কেন্দ্রে একদিকে প্রার্থী স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে বিজেপির প্রধান মুখ শুভেন্দু অধিকারী। ফলে শুরু থেকেই এই আসন ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই ছিল নজরকাড়া। তাই ভোটের দিন সকাল থেকেই এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ির ঘন ঘন টহল, মিডিয়ার ভিড় ছিল।
বিকেলে ভোট দিতে এসে মমতা অভিযোগ করেন,
“অবাধ ভোটের নামে অত্যাচার চলছে। মহিলা-শিশুদেরও মারা হয়েছে। আমি জীবনে এমন নির্বাচন দেখিনি।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পশ্চিমবঙ্গে নারী ভোটারদের ভূমিকা ক্রমশই নির্ধারক হয়ে উঠছে। ২০১৯ সাল থেকে মহিলাদের ভোটদানের হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আর ২০২৬-এর প্রথম দফায় তা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে— বিশেষত যাঁদের নাম বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)-এর পরেও তালিকায় রয়েছে।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, ভবানীপুর ভদ্রলোকদের জায়গা, ছোটলোকদের নয়। যাঁরা এগুলি করছেন ভালোই করছেন, আমার ভোট আরও বাড়বে।
ভোটের এই বিপুল হারকে ঘিরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপি বলছে, এত বেশি ভোট মানে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। তৃণমূল বলছে, মানুষ ভয় দেখানো সত্ত্বেও গণতন্ত্র বাঁচাতে ভোট দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও সাধারণ মানুষের আলোচনায় এই বিপুল ভোটদানের হার নিয়ে “২০১১-র হাওয়া ফিরছে কি?” এমন প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে।
তবে শান্তিপূর্ণ ভোটের দাবি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রাজ্যজুড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে ভোটারকে চড় মারা, বাগদায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথে ভোটারদের মারধর, গাইঘাটায় লুঙ্গি পরে আসায় বৃদ্ধ ভোটারকে ফিরিয়ে দেওয়া—এসব ঘটনা এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ভোট দিতে এসে পোশাকের জন্য অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে নাতির প্যান্ট পরে আবার বুথে আসতে হয়েছে ওই বৃদ্ধকে।
শুধু ভোটার নন, বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক দলের ক্যাম্পও কেন্দ্রীয় বাহিনীর রোষে পড়েছে বলে অভিযোগ। চুঁচুড়া, মিনাখাঁ, বকজুড়ি, তালবেরিয়া, বকুলতলা—একাধিক জায়গায় তৃণমূল, বিজেপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, এমনকী বামেদেরও অভিযোগ, ১০০ মিটারের বাইরে থাকা ক্যাম্পে ভাঙচুর চালিয়েছে বাহিনী, চেয়ার-টেবিল ভেঙেছে, ভোটার তালিকা ছুড়ে ফেলা হয়েছে। ফলে দিনভর প্রশ্ন উঠেছে,কেন্দ্রীয় বাহিনী কি শুধুই নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে, নাকি ভোটের পরিবেশে আরও সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় রয়েছে?
এই নিয়ন্ত্রণের আবহেই সামনে এসেছে একের পর এক ইভিএম বিতর্ক। ফলতা, বজবজ, ডায়মন্ড হারবার, নবদ্বীপ—বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ ওঠে, কিছু বোতামে টেপ মারা, কোথাও মেশিন বিকল, কোথাও ভোট শুরুর আগেই ভিভিপ্যাট খারাপ। বিজেপি সরাসরি কারচুপির অভিযোগ আনে। ফলতা ও বজবজে অভিযোগ ওঠে, ইভিএমের বোতামে টেপ মারা ছিল, এখানে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছে বিরোধীরা।
প্রায় প্রতি ঘণ্টাতেই রাজ্যের কোথাও না কোথাও অশান্তির খবর এসেছে। নদিয়ার নবদ্বীপে বুথের সামনে বিজেপি কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খানাকুলে আইএসএফ ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। বালিতে ইভিএম বিকল হওয়াকে ঘিরে লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছে। ভাঙড়ে নওশাদ সিদ্দিকীকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। আবার বাসন্তীতে তৃণমূলের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে দিনভর ছড়িয়ে ছিটিয়ে অশান্তির ছবি সামনে এসেছে। যদিও বড়সড় প্রাণহানির খবর মেলেনি, তবু ভোট যে ভয়ের আবহের মধ্যেই হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ভোটের দিন রাজনৈতিক বক্তব্যও ছিল সমান ধারালো। সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফেসবুকে পোস্ট করে, রেকর্ড ভোটদানের আবেদন জানান। বিজেপির তরফে শুভেন্দু অধিকারী সনাতনী হিন্দু ভোটারদের উদ্দেশে কার্যত অস্তিত্বের লড়াইয়ের ডাক দেন। তৃণমূলের তরফে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট দিয়ে বেরিয়ে অভিযোগ করেন, কমিশন হুমকি দিয়ে ভোট করাচ্ছে।
এই পুরো নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল। ২.৩ লক্ষের বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী, ৩৮ হাজারের বেশি রাজ্য পুলিশ, হাজার হাজার স্পর্শকাতর বুথে ওয়েবকাস্টিং ছিল। কমিশনের দাবি, অবাধ ভোট নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা। কিন্তু দেখা গেল, নিরাপত্তার এই অতিরিক্ত উপস্থিতিই বহু জায়গায় ভয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। তার মধ্যেও মানুষ ভোট দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের ২৩টি লোকাল ট্রেন বাতিল হওয়ায় বহু মানুষ নাজেহাল হলেও বুথমুখী জনস্রোত থামেনি। ৪ মে ফল বেরোবে। কে জিতবে, কে হারবে, সেটা তখনই জানা যাবে। কিন্তু ২৯ এপ্রিল বাংলার শেষ দফার ভোট ইতোমধ্যেই ইতিহাসে জায়গা করে নিল রেকর্ড ভোটদানের কারণে।





