নারী দিবসের প্রেক্ষিতে মহিলা সংরক্ষণ বিল ফিরে দেখা

Gautam Roy
৩ মিনিট
নারী দিবসের প্রেক্ষিতে মহিলা সংরক্ষণ বিল ফিরে দেখা

নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে সংসদীয় রাজনীতিতে সংরক্ষণের বিষয়টি এইচডি দেবেগৌড়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন একটি বহুল চর্চিত রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে উঠে আসে। ভারতের সংবিধান প্রবর্তনের সময়কাল থেকেই তপশিলি জাতি, উপজাতি দের জন্য সংসদীয় ব্যবস্থায় সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী আজ পর্যন্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে। যদিও ক্ষমতা হস্তান্তরের পরবর্তী সময় কালে তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের মতই অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া অংশ, মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে, চাকরি-বাকরি, কোনো ক্ষেত্রেই কোনো রকম সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়নি।

দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর, রাজনীতিক থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের একটা বড় অংশের ভেতরে নারীর ক্ষমতায়নে সংসদীয় ব্যবস্থায় সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উঠে আসতে শুরু করে। এই পর্বেই দেবেগৌড়া র প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে সাংসদ গীতা মুখোপাধ্যায় নেতৃত্বে তৈরি হয় যৌদ সংসদীয় কমিটি। সেই যৌথ সংসদীয় কমিটি অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে গোটা দেশজুড়ে পর্যবেক্ষণ চালায়। তৎকালীন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই যৌথ সংসদীয় কমিটির অন্যতম সদস্যা ছিলেন। যদিও তিনি সংশ্লিষ্ট জেপিসির মাত্র একটি বৈঠক কে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লালবাতি এলাকার মহিলারা রক্ত দিয়ে জেপিসির চেয়ারপারসন গীতা মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি লিখে মেয়েদের জন্য সংরক্ষণের প্রশ্নে জড়ালে সওয়াল করেছিলেন।

গীতা মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন যৌথ সংসদীয় কমিটি মহিলাদের জন্য আইনসভায় ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব করে ।এই প্রস্তাব ভারতীয় রাজনীতির পুরুষতান্ত্রিকতার আসল চেহারা একদম প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। মুলায়ম সিং যাদব ,লালু প্রসাদ যাদবের মত রাজনীতিকেরা কার্যত রে রে করে তেড়ে আসেন গীতা মুখোপাধ্যায় যৌথ সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কংগ্রেসের ভেতরকার অনেক সদস্যই মন থেকে মেয়েদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। একই অবস্থা সমস্ত অবাম রাজনৈতিক দলগুলির ভেতরেও হয়েছিল।

ফলে গত শতাব্দীর নয়ের থেকে আজ পর্যন্ত সংসদ একাধিকবার এই মহিলা সংরক্ষণ বিল পেশ করা সত্ত্বেও তা অনুমোদন করানো কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হয়নি ।পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকাকালীন, স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনে মেয়েদের জন্য সংরক্ষণ প্রথাটি লাগু করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত এবং পৌরসভাগুলিতে মেয়েদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দর হলেও, কার্যক্ষেত্রে সেটা কতখানি নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নের সহায়ক হয়েছে ,তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারা যায়।

পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনে মেয়েদের জন্য আসন সংরক্ষণের বিষয়টি চালু হওয়ার পর থেকেই লক্ষ্য করা গেছে , যে আসনগুলি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হচ্ছে, সেই আসনগুলিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, যে পুরুষটি সেখান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, বা সেই এলাকায় ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক দলের যে পুরুষ সদস্য রয়েছেন ,হয় তার স্ত্রী, নয় তার কন্যা, ভগিনী, নয় তার পরিবারের কাউকে প্রার্থী করা হয়েছে। সামনে থেকে দেখতে গেলে ,একজন মহিলা নির্বাচিত হয়েছেন অবশ্যই, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই মহিলাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে পুরুষতন্ত্রই সব থেকে বেশি সক্রিয় থেকেছে।

এই প্রবণতা দক্ষিণপন্থী দলগুলো যেমন রয়েছে, তেমনিই বামপন্থী দলগুলো এই প্রবণতা পুরোপুরি অতিক্রম করতে পেরেছে, এমনটা জোর গলায় বলা যায়না। বহু ক্ষেত্রেই পঞ্চায়েত বা পৌরসভায় একটি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ার পর, সেই আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যে সমস্ত মহিলা প্রার্থী হয়েছেন, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষ নন। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের পরিবারের কোনো পুরুষ, তা তিনি যে দলেরই হোক না কেন। সেই পুরুষের ইচ্ছানুসারে, সংশ্লিষ্ট মহিলা প্রার্থী হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হলে, তাকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পূর্বের পুরুষ জনপ্রতিনিধির বিশেষ ভূমিকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া গেছে।

নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এই মহিলা সংরক্ষণ যে কার্যত কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে ,তা নিয়ে একটা ঘোরতর সন্দেহ থেকেই যায়। তাই এক্ষেত্রে বলতে হয়, গীতা মুখোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন যৌথ সংসদীয় কমিটি ,সংসদের মহিলা দের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের যে সুপারিশ করেছিল ,সেই সুপারিশ মোতাবেক মহিলা সংরক্ষণ বিল যদি আদৌ সংসদে আসে, তাহলে সময়ের প্রেক্ষিতে ,সেটির যুগোপযোগী সংস্কার একান্ত জরুরি।

মহিলা সংরক্ষণের সুযোগ নিয়ে, মহিলাকে সামনে পুতুল হিসেবে রেখে, ক্ষমতার রাশ যাতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার হাতেই না থাকে, সেদিকে আমাদের নজর দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন।গীতা মুখোপাধ্যায় যখন তাঁর যৌথ সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিলেন ,তখন কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই মহিলা সংরক্ষনের কোন অভিজ্ঞতা ,কারো তৈরি হয়নি। ফলে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একটা বড় অংশই যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কে সবার উপরে ঠাঁই দিয়ে ,নারীকে একটা খেলার পুতুল হিসেবে সামনে রেখে ,ক্ষমতা নিজের হাতে রাখবে- এই ধারণা গীতা মুখোপাধ্যায়ের হয়নি। তাই সে সম্পর্কে রক্ষাকবচ তাঁর প্রতিবেদনের মধ্যে ছিল না। আজকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই মহিলা সংরক্ষণ বিল আবার যদি সংসদে আসে, সে ক্ষেত্রে মহিলাদের খেলার পুতুল করে রেখে ,তাদের উপলক্ষ হিসেবে উপস্থাপিত করে,আসলে পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে সংসদীয় ব্যবস্থাকে বেঁধে ফেলার প্রবণতা বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ রেখেই, তাকে আনা দরকার।

লিখেছেন
Gautam Roy
Gautam Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।