বাজার যখন কসাইখানা: ক্রেতা কি সত্যিই রাজা নাকি কর্পোরেট দাবার ঘুঁটি?

Consumer Rights: শ্রিঙ্কফ্লেশন (Shrinkflation) নামের এক নীরব চোরও আছে। আপনার প্রিয় বিস্কুটের প্যাকেটের দাম ১০ টাকাই আছে, কিন্তু ওজন কমে গেছে ১০ গ্রাম। আপনি ভাবছেন দাম বাড়েনি, অথচ আপনি আসলে ঠকছেন প্রতি কামড়ে।

inscript
৬ মিনিট
বাজার যখন কসাইখানা: ক্রেতা কি সত্যিই রাজা নাকি কর্পোরেট দাবার ঘুঁটি?

১৫ মার্চ বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় ‘ভোক্তা অধিকার দিবস’। ঘটা করে সেমিনার হয়, সরকারি বিজ্ঞাপনে ‘জাগো গ্রাহক জাগো’ স্লোগানটি আবারও আমাদের কানে বাজে। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালির থালায় যখন ভেজাল তেলের রান্না, দুধের গ্লাসে ভেজাল দুধ ওঠে, কিংবা অনলাইন শপিং অ্যাপ থেকে আসা পার্সেলটি খুললে যখন ইটের টুকরো বেরোয়— তখন সেই ‘রাজকীয়’ সম্মানের কঙ্কালসার চেহারাটা প্রকট হয়ে পড়ে। অতএব প্রতিদিনের এই প্রতারণার সময় প্রশ্ন ওঠে আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভোক্তা কি সত্যিই সুরক্ষিত, নাকি তিনি এক সুপরিকল্পিত শোষণের লক্ষ্যবস্তু মাত্র?

​ভারতের ‘উপভোক্তা সুরক্ষা আইন, ২০১৯’ (Consumer Protection Act 2019) কাগজে-কলমে অত্যন্ত শক্তিশালী। এতে ই-কমার্সকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের জন্য তারকাদের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ কোথায়?

কারণ​ বাজারের দিকে তাকালেই দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। চালের বস্তায় পাথরের গুঁড়ো কিংবা মশলায় ক্ষতিকারক রং—এগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বাঙালির মাছ ভাত খাওয়ার মতোই এক নিয়মিত অভ্যাস। কিন্তু এখন তো আবার সেই মাছের গায়ে ফরমালিনের প্রলেপ।

ভারতের ন্যাশনাল কনজিউমার হেল্পলাইনের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যে ভেজালের অভিযোগ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ২০২২-২৩ সালে যেখানে ৪,৩৩০টি অভিযোগ ছিল, সেখানে ২০২৩-২৪-এ ৪,৭৩৫টি এবং ২০২৪-২৫-এ ৭৭% বেড়ে ৭,৭০৫টি ; এর মধ্যে ৫,৯৫২টির সমাধান হয়েছে। ই-কমার্সে নকল পণ্যের অভিযোগ ২০২৫ সালে ৭,২২১টি। কিন্তু তার মধ্যে বিচার হচ্ছে কতগুলোর? পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতে আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে মাত্র ৭-১০% গ্রাহক শেষ পর্যন্ত আদালতের দরজায় কড়া নাড়েন। বাকিরা ‘ছেড়ে দাও, মারের চেয়ে ধাক্কা বেশি’—এই মানসিকতায় হার মেনে নেন। আর এই হার মেনে নেওয়াটাই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় জয়।

ডিজিটাল ডার্ক প্যাটার্ন: ​বর্তমানে আমরা এক ‘ডিজিটাল কার্টেল’-এর যুগে বাস করছি। আপনি যখন কোনো ই-কমার্স সাইটে কিছু কিনছেন, তখন আপনার অজান্তেই আপনার উপর প্রয়োগ করা হচ্ছে ‘ডার্ক প্যাটার্ন’।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নিষ্কৃতি মৃত্যুর অধিকার কি আমাদের পাওনা নয়?

Harish Rana euthanasia case: আধুনিক বিশ্বে 'প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া' বা পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে প্রথম বড় আইনি লড়াই শুরু হয় আমেরিকার কারেন অ্যান কুইনল্যান-এর হাত ধরে।

বিভিন্ন ধরনের ফেক আরজেন্সির শিকার হই আমরা। যেমন- “মাত্র ২ মিনিট বাকি আছে এই অফারের!”—আসলে সেই অফার হয়তো সারাদিনই থাকে। বা আজকেই অফারের শেষ দিন, কিন্তু তারপরও হয়তো সেই অফার আরও এক মাস চলে।

বিভিন্ন ধরনের হিডেন কস্টও থাকে। যেমন- বিলের শেষ ধাপে গিয়ে দেখা যায় ‘কনভিনিয়েন্স ফি’ বা ‘প্যাকিং চার্জ’-এর নামে অতিরিক্ত ৫০-১০০ টাকা যোগ হয়ে গেছে।

শ্রিঙ্কফ্লেশন (Shrinkflation) নামের এক নীরব চোরও আছে। আপনার প্রিয় বিস্কুটের প্যাকেটের দাম ১০ টাকাই আছে, কিন্তু ওজন কমে গেছে ১০ গ্রাম। আপনি ভাবছেন দাম বাড়েনি, অথচ আপনি আসলে ঠকছেন প্রতি কামড়ে।

LocalCircles এবং National Consumer Helpline থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত তিন বছরে ভারতে ই-কমার্স ও টেলিকম সংক্রান্ত অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ৩০০%। জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৬ লক্ষের বেশি মামলার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে ৫-৬ বছর ধরে ৫০০ টাকার রিফান্ডের জন্য লড়াই করা কার্যত অসম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর এক পুরনো কিন্তু প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রতি ১০টি ওষুধের মধ্যে ১টি নিম্নমানের বা নকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ভারতে এই চিত্রটি আরও ভয়ংকর কারণ জীবনদায়ী ওষুধের গুণমান পরীক্ষার পরিকাঠামো আজও অপ্রতুল।

কেন বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে ভোক্তার অধিকার?

ক. বড় বড় ডিস্ট্রিবিউটার বা সিন্ডিকেটগুলো অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে। ফলে ছোটখাটো জরিমানা দিয়ে তারা বড় অপরাধ থেকে পার পেয়ে যায়।

খ. প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানের তালিকা (Ingredients) কতজন সাধারণ মানুষ পড়তে পারেন বা বোঝেন? ক্যালরি, প্রিজারভেটিভ বা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের তথ্যগুলো এত ছোট করে লেখা থাকে যে তা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গ. বিচার পেতে যে সময় এবং অর্থ ব্যয় হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পণ্যের দামের চেয়ে বেশি। ফলে ‘রাইট টু রেড্রেসাল’ বা প্রতিকার পাওয়ার অধিকারটি কেবল অভিজাতদের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

​ঘ. সবচেয়ে বড় ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘিত হয় আবাসন শিল্পে। হাজার হাজার মানুষ তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রমিস করা ‘সুইমিং পুল’ বা ‘জিম’ কেবল ক্যাটালগেই সীমাবদ্ধ। ডব্লিউবি-হিরা (WBHIRA) বা বর্তমানের রেরা (RERA) থাকা সত্ত্বেও প্রোমোটারদের গাফিলতি ও লুকানো চার্জের কারণে সাধারণ মানুষ আজ সর্বস্বান্ত। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি একটি মানুষের স্বপ্নের অধিকার লঙ্ঘন।

সবশেষে প্রশ্নটা ঘুরেফিরে সেই একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়—কাগজে-কলমে ‘ক্রেতাই রাজা’ এই আপ্তবাক্যটি কি তবে আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিহাস? প্রতি বছর ১৫ মার্চ ক্যালেন্ডারের পাতায় উৎসবের মতো আসে আর চলেও যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে ভোজ্য তেলের ঝাঁঝ কমে না, ওষুধ কিনতে গিয়ে ওষুধের গুণমান নিয়ে সংশয় কাটে না, আর ই-কমার্স অ্যাপের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায় শখের জিনিসের জন্য জমানো টাকা।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।