বাড়ির পড়ে থাকা জায়গায় মাশরুম চাষ, মোটা আয়ের সুবর্ণসুযোগ

সীমিত বিনিয়োগের সঙ্গে লাভজনক ব্যবসা করতে চান? এক্ষেত্রে আপনার জন্য একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে মাশরুম চাষ। প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকার কম বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনি অয়েস্টার ফার্মিং ব্যবসায় প্রতি মাসে কমপক্ষে ২৫,০০০ টাকা উপার্জন করতে পারেন। কিন্তু কীভাবে করবেন মাশরুমের চাষ?

 

অয়েস্টার মাশরুমের সুবিধে হল, এটা খুব সহজেই বৃদ্ধি পায় এবং খেতেও খুব সুস্বাদু হয়। অন্যান্য মাশরুমের মতো অয়েস্টার মাশরুম চাষের জন্য নির্দিষ্ট কোনও জলবায়ুর দরকার হয় না। যে কোনও প্রাকৃতিক পরিবেশেই আপনি এই মাশরুমের চাষ করতে পারেন। অয়েস্টার মাশরুমের নিজস্ব কিছু গুণ রয়েছে। প্রথমত, এটিতে কম চর্বিযুক্ত উপাদান রয়েছে। তাই সাধারণত এই মাশরুম খেলে আপনার ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণে থাকে। দ্বিতীয়ত, এই বিশেষ মাশরুম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও খুব উপকারী।


মাশরুম চাষের প্রয়োজনীয় জলবায়ু
অয়েস্টার মাশরুম চাষের জন্য মোটামুটি গড় তাপমাত্রা ২০-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হলেই চলবে, যা আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোর সাধারণ তাপমাত্রার মধ্যেই পড়ে। সবথেকে ভালো মাশরুম চাষ হয়, যখন বাতাসে প্রায় ৫৫-৭০ শতাংশ আর্দ্রতা থাকে। আবার পার্বত্য অঞ্চলে মার্চ বা এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর, বা এমনকী অক্টোবর পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো অয়েস্টার মাশরুমের চাষ হয়। সমতল ভূমিতে এই মাশরুম চাষের আদর্শ সময় হল সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে মার্চ বা এপ্রিল। অয়েস্টার মাশরুম বিভিন্ন কৃষিজাত বর্জ্য, যেমন ধানের খড়, গম/রাগি, ডাঁটা ও ভুট্টার পাতা, বাজরা এবং তুলা, ব্যবহৃত সিট্রোনেলা পাতা, আখের বাগাস, করাত ধুলো, পাট ও তুলার বর্জ্য, ব্যবহৃত চা পাতার বর্জ্যের ওপর বেড়ে উঠতে পারে। আবার শিল্পজাত বর্জ্য, যেমন পেপার মিল স্লাজ, কফির উপজাত, তামাক বর্জ্য ইত্যাদিও মাশরুম চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

আরও পড়ুন: অল্প পুঁজিতে বিশেষ মুরগি পালন, লক্ষ টাকা রোজগারের হাতছানি, জেনে নিন কীভাবে

 

অয়েস্টার মাশরুম চাষে কী কী দরকার?
মাশরুম চাষের প্রথম ধাপ হল একটি ঘর জোগাড় করা, যাকে বলা হয় 'মাশরুম হাউস'। সেখানে মাশরুমের স্পনগুলি স্তুপ করা হয় এবং ধীরে ধীরে সেগুলি বেড়ে ওঠে। মাশরুম স্পন হল এমন একটি পদার্থ, যা বৃদ্ধির জন্য মাইসেলিয়াম টিকা দেওয়া হয়েছে। স্পনটি মাইসেলিয়ামকে যে কোনও উপাদানে রূপান্তরিত করতে ব্যবহৃত হয়, যেখান থেকে মাশরুম বৃদ্ধি পাবে। মাশরুম রাখার জন্য ঘর পাওয়া যাওয়ার পরে দেখতে হবে, ঘরটিতে যেন কোনও গর্ত না থাকে। যদি ঘরটিতে গর্ত বেশি থাকে, সেক্ষেত্রে খড় বা পলিথিন ব্যাগ ইত্যাদি দিয়ে ভেন্ট বা গর্তগুলো ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করুন। এটি ঘরকে ঠান্ডা করতে সাহায্য করবে। ঘরটিতে ৩০ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা বজায় রাখা মাশরুম চাষের জন্য প্রয়োজনীয়। এতে মাশরুম সঠিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

 


মাশরুমের স্পন ক্রয় এবং মাশরুম হাউস জীবাণুমুক্ত করার পদ্ধতি
মাশরুম চাষের পরবর্তী পদক্ষেপটি হল মাশরুম হাউসের ঘরের মেঝে এবং দেয়ালগুলিকে প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা, যাতে মাশরুমগুলি বিনা বাধায় বাড়তে পারে। ঘরের মেঝে ও দেয়ালে ফর্মালিন ও বেভিস্টিন স্প্রে করুন। তারপর জীবাণুমুক্তকরণে এই রাসায়নিক সারগুলি ব্যবহার করতে হবে। মাশরুমের চারাগুলি কোনও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বা অনলাইন ডিলারদের কাছ থেকে কেনা যায়। অনলাইনে মাশরুম চারা কিনলে খরচ পড়বে প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তুলনায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাশরুম চারা কেনা অনেক বেশি সস্তা ও সহজলভ্য। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিনলে এর দাম পড়ে প্রতি কেজি ৯০-১০০ টাকা। এই চারাগুলি অনেক বেশি উৎপাদনশীল। তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাশরুম চারা কেনা অনেক বেশি লাভজনক হবে। অয়েস্টার মাশরুমের জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত উপাদান হল খড়। ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী ১ কেজি মাশরুম উৎপাদন করতে প্রায় ২.২ কেজি শুকনো উপাদানের প্রয়োজন হয়। ঘরকে জীবাণুমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ফর্মালিন এবং বেভিস্টিনের খরচ এবং ৫০ কেজি চারা-সহ সারের দাম প্রায় ৫০০ টাকা।

 

মাশরুম চাষের পদ্ধতি
প্রাথমিকভাবে এই ব্যবসার জন্য ৫০ কেজি চারা কেনার মাধ্যমেই শুরু করা উচিত। মাশরুম হাউসের মেঝে এবং দেয়াল জীবাণুমুক্ত করার পর, সার জীবাণুমুক্ত করার পালা শুরু হয়। মোটামুটি ১০০ লিটার জলের ড্রামে সেই পরিমাণ সার রাখতে হবে, যাতে তা সম্পূর্ণরূপে জলে ডুবে যায়। এটি একদিনের জন্য রাখতে হবে এবং তারপরে ড্রাম থেকে সার বের করে নিয়ে মেঝেতে শুকোতে দিতে হবে। এর পরে পলিথিন ব্যাগে ১০০ গ্রাম করে মাশরুম চারা রাখতে হবে। এই প্রস্তুতির পরেই চারা বৃদ্ধির সময় সঠিক বায়ু প্রবাহের জন্য পলিথিন ব্যাগের নিচ থেকে ওপরে কমপক্ষে ১০-১২টি ছোট গর্ত তৈরি করতে হবে।

 

এরপর বাঁশ ও দড়ি দিয়ে তৈরি র‌্যাকে পলিথিনের ব্যাগে স্তুপীকৃত চারাগুলিকে কমপক্ষে ১৮-২০ দিন ঘরে রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। সাধারণত সম্পূর্ণভাবে মাশরুমে পরিণত হতে ৪৫ দিন সময় লাগে।


মাশরুম বিক্রির পদ্ধতি
দু'টি পদ্ধতিতে মাশরুম বিক্রি করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে মাশরুম চাষি নির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে কোনও একটি সংস্থা মারফত মাশরুমগুলি বিক্রির ব্যবস্থা করে। সম্পূর্ণ পরিমাণ বিক্রির পরে সংস্থাটি নিজেদের লাভ রেখে বাকি মুনাফা কৃষককে ফেরত দেয়।

আবার মাশরুম চাষিরা নিজেরাও মাশরুম বিক্রি করতে পারে। মাশরুম বিক্রির জন্য উৎপাদন ক্ষেত্রের কাছাকাছি বাজার বা মান্ডি থাকা প্রয়োজনীয়। নইলে পরিবহনে খরচ বাড়তে পারে।

এই পদ্ধতিগুলি মেনে আপনিও শুরু করতে পারেন মাশরুম চাষ!

More Articles

;