আসিফ, মাহফুজদের পদত্যাগ: বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন তরুণ নেতারা?
Bangladesh politics: আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক রুটিন নয়, এ যেন আসন্ন নির্বাচনের আগে তরুণ নেতৃত্বের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ সংকেত।

ঢাকার রাজনীতিতে আজ যেন হাওয়া খানিক অদ্ভুত ভাবে বদলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মহম্মদ মাহফুজ আলম এবং স্থানীয় সরকার ও যুব-ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগ পত্র জমা দেওয়ার ঘটনা শুধু প্রশাসনিক রুটিন নয়, এ যেন আসন্ন নির্বাচনের আগে তরুণ নেতৃত্বের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ সংকেত। দু’জনেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির ছাত্রনেতা। তাঁদের হাতে ছিল বদলের মশাল, আর আজ সেই দুই মুখই নতুন পথের খোঁজে। প্রশ্ন উঠছে, এই পথ কি বিএনপির দিকে, নাকি এনসিপির দিকে?
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পদত্যাগপত্র গ্রহণের সময় অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তাঁদের ভূমিকার প্রশংসা করে যে আবেগপূর্ণ কথা বলেছেন তাতে স্পষ্ট, অন্তর্বর্তী সরকার ব্যথিত হলেও ক্ষুব্ধ নয়। বরং এই দুই তরুণের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বিশাল ভূমিকা থাকবে বলেই সরকারের বিশ্বাস। এই দুই ছাত্রনেতার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবনের মঙ্গল কামনা করে বলেন, ‘অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে তোমরা যেভাবে জাতিকে ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তির পথে অবদান রেখেছ তা জাতি মনে রাখবে। আমি বিশ্বাস করি ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও বিকাশে তোমরা একইভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সবসময় তোমাদের অবদান স্মরণ করবে। আমি তোমাদের সুন্দর ও শুভ ভবিষ্যৎ কামনা করি। এত অল্প সময়ে তোমরা জাতিকে যা দিয়েছ তা জাতি কখনও ভুলবে না। তিনি বলেন, এটি একটি রূপান্তর মাত্র। আমি আশা করি, আগামীতে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে তোমরা আরও বড় অবদান রাখবে।
নিজেদের কর্মের মাধ্যমে দেশের মঙ্গলে নিয়োজিত থাকার আহ্বান জানিয়ে দুই ছাত্রনেতার উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘সরকারে থেকে যে অভিজ্ঞতা তোমরা অর্জন করেছ, তা ভবিষ্যৎ জীবনে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।' কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ কোন দলে গড়ে উঠবে? এখানেই জল্পনা সবচেয়ে তীব্র।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tarique Rahman Still Cannot Return to Bangladesh: দলের নীতিগত অবস্থান না বদলালে তারেক ফিরতে পারবেন না, এমন ইঙ্গিত করছেন বিশ্লেষকরা। ফেরার আগে ব্রিটেনের অনুমতি লাগবে, এটিও একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাজনৈতিক অন্দরে জোরালো প্রশ্ন উঠছে কারণ, আসিফ মাহমুদ নূরুল হক নূরের সঙ্গে সম্প্রতি দেখা করেছেন। নির্বাচনের তফসিল প্রকাশের ঠিক আগে দেখা করার স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আসিফ কি তবে এনসিপির দিকে ঝুঁকছেন? গণঅভ্যুত্থানের পর এনসিপি নিজেকে তরুণ-নেতৃত্বনির্ভর বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দলটির সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বহু প্রশ্ন আছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদেরই এনসিপির উপর আস্থা না থাকে, তবে সাধারণ ভোটার কেনই বা রাখবে?
গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা তরুণরা যে আদর্শিকভাবে বিএনপির সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, এমন নয়। কিন্তু রাজনীতিতে দীর্ঘদিন দুর্বল থাকার পর বিএনপি আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে, সেই বার্তাও ভেতরে ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মনে করেন, অভিজ্ঞ সংগঠন, মাঠে সক্রিয় প্রচার চালানোর ক্ষমতা এবং বহু বছরের পরিচিত রাজনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে বিএনপি এখনও দেশের বড় শক্তি। এই কারণেই কিছু তরুণ নেতাদের কাছে বিএনপিকে ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি স্বাভাবিক ও সুবিধাজনক পছন্দ বলে মনে হতে পারে।
আবার অন্য ব্যাখ্যাও আছে। অনেকে বলছেন, আসিফ-মাহফুজরা কেউই এখনই বড় দলে যোগ দিতে চান না। বরং নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে ভবিষ্যতের জন্য রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিপরিষদে থাকা, জাতীয় সঙ্কটকালে নেতৃত্ব দেওয়া— এসব অভিজ্ঞতা তাঁদের রাজনৈতিক বাজারমূল্য বাড়িয়েছে। তাই হয়ত তাঁরা এখন ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ অবস্থান নিয়ে বিএনপি ও এনসিপি দুই পক্ষের কাছ থেকেই বার্তা শুনতে চাইছেন।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যদি তাঁরা সত্যিই এনসিপির দিকে না যায়, তবে কি এর অর্থ এই যে তরুণ নেতারা এনসিপির নেতৃত্বে আস্থা পাচ্ছে না? নূরের দল যে নিজেকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, তা ঠিক; কিন্তু দলীয় গণতন্ত্র, নীতি-সংগত অবস্থান, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা— এসব নিয়ে এনসিপির দুর্বলতা বরাবরেরই আলোচনার বিষয়। তরুণরা যদি সত্যিই নতুন বিকল্প খুঁজতে চায়, তবে এনসিপির দ্বারা সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও এখন বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
শেষে প্রশ্নটা একই জায়গায় ফিরে আসে, বিএনপি না এনসিপি, কার হাত ধরবেন আসিফ-মাহফুজরা? নির্বাচনের প্রাক্কালে এই প্রশ্নের উত্তরই হয়ত নতুন রাজনৈতিক জোট ও সমীকরণের ভিত্তি নির্ধারণ করবে। তাঁদের রাজনৈতিক পরবর্তী পদক্ষেপ শুধু ব্যক্তিগত নয়, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্বের মানচিত্র কীভাবে পুনর্গঠিত হবে, তা-ও নির্ভর করবে তাঁদের সিদ্ধান্তের উপর।
এই মুহূর্তে উত্তর অজানা। তবে আসিফ ও মাহফুজ যে দিকেই ঝুঁকবেন, তা নিছক দলবদল হবে না; বরং তা হবে নতুন রাজনৈতিক ঘোষণা।






