'খুনি' পুলিশের বিরুদ্ধে রাস্তায় আম জনতা! কেন জ্বলছে গোটা ফ্রান্স?
France Violence: নাহেল মারজোকের বাঁ হাত আর বুকের মধ্যে দিয়ে সোজা চলে গিয়েছে একটিই গুলি। তাতেই শেষ, ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় নাহেল।

বয়স মাত্র ১৭। রাগবি খেলতে ভালোবাসে। শিকড় তাঁর এই শহর নয়, এই দেশ নয়। পিঠে অভিবাসীর স্ট্যাম্প। পুলিশের গুলিতে এখন লাশ বছর সতেরোর আস্ত জীবন। আর এই লাশ হয়ে যাওয়া কিশোরকে ঘিরে জ্বলছে ফ্রান্স! এমন অশান্ত শহর বহুদিন দেখেননি নাগরিকরা। ১৭ বছরের কিশোর নাহেল মারজোককে একজন পুলিশ অফিসার গুলি করে হত্যা করার পর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর জুড়ে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে। গোটা ফ্রান্স উত্তাল ব্যাপক বিক্ষোভে যার একটা বড় অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশের তরুণ-তরুণীরাই। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরতলির বঞ্চনার গল্প উঠে আসছে, উঠে আসছে দীর্ঘদিনের নানা অভিযোগের কথা। অন্য নানা দেশের অভিবাসী বংশোদ্ভূত মানুষদের বাস যেখানে সেই অঞ্চলে কীভাবে জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এই মানুষদের, পুলিশ কীভাবে অত্যাচার চালায়- ফ্রান্সের পরিচ্ছন্ন 'ইমেজ' ভেঙে উঠে আসছে ভেতরের সেই সব গল্প।
নাহেল মারজোককে কেন গুলি করা হলো?
নাহেল আসলে আলজেরিয়া এবং মরক্কোর বংশোদ্ভূত। বর্তমানে অবশ্য সে ফরাসি নাগরিকই। নাহেল মারজোকের বাড়ি প্যারিসের শহরতলির নান্তেরের এক শ্রমজীবী এলাকায়। বাড়ির একমাত্র সন্তান, মা একাই বড় করে তুলছিলেন তাঁকে। রাগবি খেলত নিয়মিত, পড়াশোনায় তেমন মন নেই। ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে মেকানিক হওয়ার। নাহেল বাস চলাচলের লেনে গাড়ি চালাচ্ছিল। ট্রাফিক আইন ভাঙার জন্য পুলিশ অফিসাররা তাকে থামানোর চেষ্টা করলে জোরে গাড়ি চালিয়ে পালিয়ে যায় নাহেল। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারে না। একটু এগিয়েই যানজটে আটকা পড়ে। পুলিশ অফিসাররা গাড়ির কাছে গিয়ে সোজা গুলি করে দেন এক ১৭ বছরের কিশোরকে।
নাহেল মারজোকের বাঁ হাত আর বুকের মধ্যে দিয়ে সোজা চলে গিয়েছে একটিই গুলি। তাতেই শেষ, ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় নাহেল। আর তাঁর গাড়ি তল্লাশি করে কোনও বিপজ্জনক উপাদান বা অবৈধ ওষুধ কিছুই পাওয়া যায়নি। তাহলে গুলি চলল কেন? পুলিশ ফরাসি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে, ওই কিশোর নাকি দুই পুলিশ কর্মকর্তার গায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ওই ঘটনার একটি ভিডিও ফাঁস হয়ে যায় তাতে দেখা যায়, যে অফিসার গুলি চালিয়েছিলেন তাঁর তো কোনও বিপদের সম্ভাবনা ছিলই না। গাড়িটি বেশ দূরেই ছিল। তাহলে কী এমন ঘটল যে গুলি চালিয়ে ফেললেন পুলিশ আধিকারিক?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টেনিস-দর্শকের হৃদয়-সিংহাসনে কায়েমি হয়ে সেরেনা বসে পড়েছেন চিরকালের জন্য।

যুতসই উত্তর মেলেনি। মেলেনি বলেই ফ্রান্স জুড়ে অশান্তি! বিক্ষোভকারীরা এই পুলিশ হত্যার প্রতিবাদে গাড়ি, বাড়ি সর্বত্র আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। থানায় চলেছে ভাঙচুর। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে, প্রচুর পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। সারাদেশ এখন স্পষ্টত দ্বিধাবিভক্ত! পুলিশ বনাম সাধারণ মানুষের লড়াই দেখছে ফ্রান্স।
যে পুলিশ গুলি চালিয়েছেন নান্তেরের প্রসিকিউটর অফিস ঘোষণা করেছে, স্বেচ্ছায় হত্যার অভিযোগে সেই পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। আটক করে রাখা হয়েছে তাঁকে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্ত্র ব্যবহারের আইনি শর্ত মেনে চলেননি তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার কথাও জানিয়েছেন। তবে কোনও কিছুই বিক্ষোভকে থামাতে পারেনি। নাহেলের খুন উস্কে দিয়েছে ২০০৫ সালের একটি এমনই ঘটনার কথা। পুলিশের নাগাল থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই কিশোরের মৃত্যুতে বেশ কয়েক সপ্তাহ এমনই হিংসাত্মক বিক্ষোভ দেখেছিল ফ্রান্স। প্যারিসের দরিদ্র শহরতলির শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ গাড়ি এবং বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালের ২৭ অক্টোবর জায়েদ বেন্না, বউনা ট্রাওয়রে, মুহিত্তিন আলতুন এবং তাদের আরও ৭ জন বন্ধু ফুটবল খেলছিল মাঠে। রোজার উপবাস চলছে তখন। রোজা ভাঙতে বাড়ির পথেই রওনা দিয়েছিল সকলে। নির্মীয়মাণ একটি এলাকায় তারা ঢুকে পড়ে, গতিবিধি সন্দেহজনক বলে মনে হতে স্থানীয় এক বাসিন্দাই পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে ওই যুবকদের মধ্যে একজনকে গ্রেফতারও করে। ভয়ে পালিয়ে যায় জায়েদ, বউনা, মুহিত্তিন নামে তিন নাবালক। বৈদ্যুতিক একটি সাবস্টেশনে লুকিয়ে পড়ে তারা। সন্ধ্যায় বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যায় বছর সতেরোর জায়েদ আর বছর পনেরোর বউনা। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হয় বছর সতেরোর মুহিত্তিনকে।
ফ্রান্সের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মৃতদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তোলেন। অথচ মৃতদের বিরুদ্ধে চুরি বা সরকারি সম্পত্তি নষ্টের কোনও প্রমাণই পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার পরেই হিংসা ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্স জুড়ে। তিন সপ্তাহ ধরে চলা সেই বিক্ষোভে পুড়েছিল ১০ হাজার গাড়ি, আগুনে ছারখার হয়েছিল ২৩৩ টি সরকারি ভবন ও ৭৪টি ব্যক্তিগত বাড়ি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
France Football Team World Cup Players: বিশ্বকাপে কালোর দেশ হিসেবে উঠে এসেছে ফ্রান্সের ফুটবল দল। এই দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক।

তবে পুলিশের ভূমিকা বদলায়নি। পুলিশের অত্যাচার এবং পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু যে বেড়েছে নাহেলের মৃত্যুই তার প্রমাণ। শুধুই কি ট্রাফিক আইন ভঙ্গের সাজা? নাকি সেই চিরাচরিত সাদা চামড়া কালো চামড়ার মাথায় গেঁড়ে বসে থাকা ঘা! শুধুই আইন কানুন রক্ষা নাকি, আইন রক্ষার পর্দার আড়ালে 'বহিরাগত' অভিবাসীদের হত্যা করে জাত্যাভিমান রক্ষা? ফ্রান্সের মানবাধিকার রক্ষা বিভাগের একটি সমীক্ষা বলছে, কৃষ্ণাঙ্গ বা আরবের বাসিন্দা দেখলেই সেই মানুষদের ফরাসি পুলিশের আটকানোর সম্ভাবনা সাধারণ নাগরিকের থেকে ২০ গুণ বেশি। এবং এই মানুষদের মধ্যে অনেকেরই শিকড় কিন্তু প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশগুলিতে। তাঁদের বাস কিন্তু ঝাঁ চকচকে শহরে নয়। শহরের লাগোয়া বিমর্ষ সব শহরতলিতে।
ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক ইতিহাস
১৯ শতকের মাঝামাঝি, আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ধনীদের দেওয়া টাকায় তৃতীয় নেপোলিয়ন নগর পরিকল্পনাবিদ জর্জেস-ইউজিন হাউসম্যানকে চওড়া রাস্তা এবং একটি উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সহ নয়া প্যারিস তৈরির দায়িত্ব দেন। যাদের পয়সা ছিল না তাঁদের মূল শহরের বাইরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বহুতল নির্মাণ শুরু হয়, যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে অভিবাসন। যুগের পর যুগ ধরে এই শহরতলি এবং তার বাসিন্দারা ফ্রান্সের ঝাঁ চকচকে আলো হাওয়া থেকে বঞ্চিতই! নোংরা, ঘিঞ্জি এলাকা আর চাকরি না পাওয়া, সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এখানে।
ফ্রান্স ছিল ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তি। ১৬ শতক থেকে শুরু করে এই সেদিন, ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত ফ্রান্সের নেতারা বিশ্বাস করতেন ফ্রান্সই 'সভ্যতা'র পরাকাষ্ঠা এবং তাই সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশ এবং অঞ্চলগুলিকে জোরজবরদস্তি শোষণ করা ন্যায্য, এতে কোনও অপরাধ নেই।
১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব সমস্ত ফরাসি পুরুষদের (নারীরা অবশ্যই নয় সেভাবে) স্বাধীনতা, সাম্যের আশা দেখিয়েছিল। তবে দেখা যায় ঔপনিবেশিক মানুষ মাত্রই ফরাসি সংস্কৃতি এবং ভাষাকেই নিজের করে তুলতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষত আলজেরিয়ায় ফ্রান্সের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। উত্তর আফ্রিকার এই দেশটি ১৮৩০ সালে প্রথম উপনিবেশ হয় এবং তারপরে ফরাসি অঞ্চলেই টেনে নেওয়া হয়। আলজেরিয়া যখন স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু করে, লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ যায়, বেশিরভাগই আলজেরিয়ার। অবশেষে ১৯৬২ সালে ফরাসি শাসনের অবসান ঘটে আলজেরিয়ায়।
প্রায় একই সময়ে, ফ্রান্স তার অন্যান্য উপনিবেশগুলিকেও ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল সেই সব দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কাছে পরাস্ত হয়ে। তবে ফ্রান্স এখনও তার প্রাক্তন উপনিবেশগুলিতে, প্রধানত আফ্রিকা মহাদেশে নিজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রভাব বজায় রেখেছে।






