আমির খান বা অনুরাগ কাশ্যপের এই ছবিগুলি আজ মুক্তি পেলে বয়কটের ডাক উঠতই
একঝলক দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন ছবি আজকের দিনে মুক্তি পেলে বয়কটের ডাক উঠত অচিরেই।

আজকাল 'বয়কট বলিউড'-এর ধুম পড়েছে। 'আমির খান মুসলমান, ছবি বয়কট কর, শাহরুখের ট্রেলারে হালকা বিদেশি গন্ধ, ছবি বয়কট কর, উত্তর পূর্বাঞ্চলের সমস্যা দেখানো হয়েছে ছবিতে— এ ছবি কোনওভাবেই চলতে দেওয়া যাবে না, কাশ্মীরের সমস্যা দেখাল না কেন?— ইত্যাদি নানা গতে বাঁধা প্রশ্ন। 'ক্যানসেল কালচার' অবশ্যই ক্ষতিকর। সুস্থ সমালোচনার অবকাশ তাতে নষ্ট হয়। আবার বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে অর্ধশিক্ষা বা কুশিক্ষার ঝোঁক যে 'ক্যানসেল কালচার'-এর জন্ম দেয়, তা আরও ক্ষতিকর। এই কারণেই কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সব ছবির তুমুল সমালোচনা প্রয়োজন, চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রয়োজন সেই সব ছবি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যায়। 'কবীর সিং'-এর মতো ছবি, যেখানে অ্যাবিউজকে গ্লোরিফাই করা হয়, যার নির্দেশক খোলাখুলি মিডিয়ার সামনে বলেন, "চড়থাপ্পড় না মারতে পারলে আর কীসের প্রেম?", তা ভারতে হিট করে। হিট করে 'পুষ্পা', 'কেজিএফ'-এর মতো গোঁড়া পিতৃতান্ত্রিক ছবি। মহিলা চরিত্ররা যেখানে শুধুমাত্র পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য উপস্থিত। অথবা 'পতিব্রতা' দাসী, আদর্শ পিতৃতান্ত্রিক নারী। এসব দেখতে পছন্দ করে ভারতের একটি বৃহত্তর অংশ। অথচ প্রকৃত অর্থে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্যাকে প্রশ্ন করে যে ছবিগুলি তাদের ব্যান করে দেওয়া হয়। বর্তমানে 'ভাবাবেগে আঘাত' ছাড়াও বয়কটের রয়েছে আরও হাজারখানেক অজুহাত। একঝলক দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন ছবি আজকের দিনে মুক্তি পেলে বয়কটের ডাক উঠত অচিরেই, এমনকী, রিলিজের সময়েই বেশ খানিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
ব্ল্যাক ফ্রাইডে
এই ছবি তৈরির জন্য বিশেষ অসুবিধেয় পড়তে হয়েছিল অনুরাগ কাশ্যপকে। এমনকী, প্রাথমিকভাবে ব্যান করে দেওয়া হয়েছিল এই ছবি। ১৯৯৩ সালে মুম্বইয়ে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। তাই নিয়েই সিউডো-ডকুমেন্টারি আঙ্গিকে ছবি বানিয়ে ছিলেন অনুরাগ। শেষ অবধি সেন্সর বোর্ড এই মর্মে ছাড়পত্র দেয় যে, ছবির শুরুতে একটি বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। তাতে বলা থাকবে ছবিটি সম্পূর্ণরূপে একটি বই অবলম্বনে নির্মিত এবং এই ছবিতে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত চরিত্রগুলি দোষী না কি নির্দোষ— এমন কোনও ইঙ্গিতই করা হচ্ছে না। জ্বলন্ত বাস্তব সমস্যা নিয়ে তৈরি এই ছবি আটকে ছিল দুই বছর। অবশেষে সমস্ত শর্ত মেনে ছবিটি মুক্তি পায়। আজকের দিনে এই ছবি তৈরি হলে বয়কট তো বটেই, দাঙ্গাও লাগিয়ে দেওয়া হতো ছবিটি আটকানোর জন্য।
ফনা
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দাউদ আজও অধরা। মুম্বইয়ের সামান্য বস্তিজীবনে যে ছেলেটির অপরাধে হাতেখড়ি, সে আজ প্রৌঢ়।
আমির এবং কাজল অভিনীত সেই বিখ্যাত ছবি। 'ফনা' আজ পর্যন্ত গুজরাতে নিষিদ্ধ। কিন্তু কেন? কুণাল কোহলি নির্দেশিত সিনেমাটি মূলত প্রেমের গল্প। সঙ্গে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ ও রাজনীতির মিশেল। উপাদান এবং রাজনীতি নিয়ে সমস্যা তো ছিলই, তার ওপর 'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন'-কে সমর্থন করেছিলেষ আমির। সরাসরি 'সর্দার সরোবর ড্যাম'-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন অভিনেতা। ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা সঙ্গে সঙ্গে ছবিটিকে বয়কট করে। মজার ব্যাপার, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা যায়নি ছবিটি। তবে গুজরাতের কোথাও এই ছবি চালানো হয়নি। বলা হয়েছিল, সর্বসমক্ষে আন্দোলন সমর্থনের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে আমিরকে। আমির খান পাত্তা দেননি। একে ধর্মে মুসলমান, তার ওপর সরাসরি গুজরাতের তৎকালীন সরকারের বিরোধিতা, সালটা ২০২২ হলে সরাসরি প্রাণের হুমকি আসত। ছবি মুক্তি পাওয়া তো অনেক দূরের কথা।
পরজানিয়া
রাহুল ঢোলাকিয়ার ছবি 'পরজানিয়া'। সারিকা এবং নাসিরুদ্দিন অভিনয় করেছিলেন। আজহার মোদি নামে এক পার্সি কিশোরের ওপর সত্য ঘটনা অবলম্বনে ছবিটি তৈরি হয়েছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০২, গুলবার্গ সোসাইটি ম্যাসাকারে নিখোঁজ হয়ে যায় আজহার। তখন গুজরাত দাঙ্গায় উত্তপ্ত। সিনেমার গল্প পিঠাওয়ালা পরিবারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে খুঁজে পাওয়ার আকুল চেষ্টা বাবা-মায়ের। শোনা যায়, গুজরাতের দাঙ্গায় রাহুলের ব্যক্তিগত পরিসরেও এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। সেই দুর্ঘটনা থেকেই ছবিটি বানাতে উদ্বুদ্ধ হন রাহুল। ফের গুজরাত ব্যান করে এই ছবি। বিশেষত বজরং দলের হুমকি। একটি সিনেমা হলও ছবিটি দেখাতে রাজি হয়নি। তবে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ঠিকই। বর্তমান পরিস্থিতিতে মুক্তি পেলে লোকে এই ছবির মধ্যেও কাশ্মীরী পণ্ডিতদের সমস্যা খুঁজত। না পেয়ে বয়কটের ডাক দিত।
ইনশাল্লাহ কাশ্মীর
'কাশ্মীর ফাইলস'-এর উচ্চারণ এখন যত্রতত্র। সর্বঘটে কাঁঠালিকলার মতো মিশ খেয়ে যায় নামটা। কখনও কখনও ইট-পাটকেলের মতো প্রতিপক্ষর মাথা বরাবর ছুড়ে দেওয়ারও কাজে লাগে। রাজনৈতিক সমস্যার কথা বাদ দিলেও শুধুমাত্র জঘন্য চিত্রনাট্যর জন্য ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায় ছবিটিকে। অথচ রীতিমতো 'পবিত্র' হয়ে উঠেছে ছবিটি ভক্তদের কাছে। আদতে কাশ্মীরের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ এইসব মানুষের কাশ্মীরের মানুষদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে কোনও উৎসাহই নেই। কেবল ট্যুরে গিয়ে কিঞ্চিৎ কাশ্মীরী সজ্জায় সজ্জিত হয়ে ফোটো তোলা। এইমাত্র। অথচ, কাশ্মীরের মানুষের জীবনযাত্রা, তার জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে অশ্বিন কুমার একটি ছবি করেছিলেন। কাশ্মীরের মানুষের রোজকার জীবন, এক্স-মিলিট্যান্টদের ওপর সেনাবাহিনীর অকথ্য অত্যাচার নিয়ে নির্মিত ছবিটিকে রিলিজ করতেই দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে আন্তর্জালে ছবিটি ছেড়ে দিয়েছিলেন নির্দেশক। সেই ছবি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল।
এর থেকেই মোটামুটি বোঝা যায়, বিনোদনের ক্ষেত্রটিও কীভাবে ক্রমশ উন্মাদনার অধীনে চলে যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদী পিতৃতান্ত্রিক ছবি, 'ভাবাবেগে আঘাত' না দেওয়া ছবি— ইত্যাদি হাজার শর্ত মেনে ছবি হলে তবেই দর্শক দেখবে। নতুবা কারণে-অকারণে ছবি বয়কটের ডাক আসবে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অভিনেতাদের বয়কটের ডাক আসবে। আসবে ট্রোলের পর ট্রোলের ঢেউ। আপাতত নিশ্চিন্ত চিত্তে এক গভীর খাদের দিকে আমরা এগিয়ে চলেছি।
















