হঠাৎই হাতে এসে পড়ল লাঠির বাড়ি! পুলিশের যে ভয়াবহ রূপ দেখেছি যুবভারতীর বাইরে
Mohun Bagan and East Bengal Supporters' Protest: আমি লাঠিপেটার আওয়াজ শুনে অন্ধকার, মানে শেডের থেকে বাইরে ফুটপাথের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। আর ঠিক তখনই পুলিশ আমাদের কাছে এসে পড়ে এবং আমার পাশের ছেলেটিকে মারে।

আরজি কর কাণ্ডের ছায়ায় রবিবার বাতিল করে দেওয়া হল ডার্বি ম্যাচ। যে খেলায় মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের। ডার্বি বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ামাত্রই ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান সমর্থকেরা ঘোষণা করেন, ডার্বির নির্ধারিত সময়ের আগে জমায়েত করে প্রতিবাদ জানানো হবে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের প্রধান দরজার বাইরে। সেই ফুলকি দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল রবিবার দুপুরে। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহমেডান সমর্থকদের প্রতিবাদে অন্য আকার ধারণ করল যুবভারতীর চারপাশ। রবিবার যেন যুবভারতীর ভিতরে নয়, ডার্বি হল কার্যত বাইরে।
আমি অটো থেকে যখন বাইপাসে, রাস্তায় উঠেই দেখি অজস্র পুলিশ লাঠি হাতে ঘুরছে। জমায়েতের মধ্যে যাই, স্লোগান দেওয়া হয়। পুলিশ সাধারণত জমায়েতের থেকে খানিকটা দূরত্বে আলাদা করে থাকে। অনেক মিছিলেই সেটা দেখেছি। এখানে পুলিশ মিছিলের মধ্যে ছিল। জমায়েতের লোকজনের মধ্যে। রবিবার সকাল থেকেই গোটা শহরজুড়ে ছিল বৃষ্টি। কোথাও কোথাও জল জমে যায়। প্রতিবাদীরা তাতেও পিছিয়ে আসেননি। ছুটির দিন হওয়ায় দ্বিগুণ উৎসাহে দুপুর থেকেই দলে দলে সমর্থক মিছিল করে এসেছিলেন যুবভারতীতে। জানতে পারি, রবিবার বিকেল ৪টে থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ওই এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। যা আসলে ভারতীয় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার সমতুল্য।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Doctor Rape and Murder case : প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার মানুষ উগড়ে দিয়েছেন ,সেই ক্ষোভের আগুন এখনও জ্বলছে। এটি এত সহজে নিভে যাওয়ার নয়।
দিব্যি স্লোগানিং চলছিল আরজিকরের নির্যাতিতার বিচারের দাবিতে, ওই ভয়াবহ ঘটনার প্রতিবাদে। এরই মধ্যে প্রথমবার আমার পিছন থেকে অনেককে দৌড়ে আসতে দেখি। ওঁরা বলেন লাঠি চার্জ চলছে। সবাই দৌড়ে খানিকটা এগিয়ে যায়। আবার থেমে যায়। জমায়েতের দুটো অংশ ছিল। একটা অংশ রাস্তায় (স্টেডিয়াম নামাঙ্কিত মেট্রোর ব্রিজের নীচে) আর একটা অংশ ফুটপাথে। রাস্তার মধ্যেই পুলিশ তাড়া করতে থাকে, যার জেরে রাস্তায় থাকা লোকেরা ছোটাছুটি করে। মিছিলে থাকা অনেকেই বলছিলেন ঝামেলা হবে, ব্রিজের তলায় কোনো অন্ধকার জায়গায় কোনওভাবেই কেউ যেন না যায়।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
RG Kar Doctor Rape and Murder Case: আরজি করের জুনিয়র চিকিৎসকরা বার্তা দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবেই
দ্বিতীয়বার পুলিশ যখন আবার এই একই কায়দায় তাড়া করে তখন আমি মেট্রোর ওই ব্রিজের তলায় অপেক্ষাকৃত অন্ধকার একটা জায়গার মধ্যে দিয়ে দৌড়োচ্ছিলাম। আমি লাঠিপেটার আওয়াজ শুনে অন্ধকার, মানে শেডের থেকে বাইরে ফুটপাথের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। আর ঠিক তখনই পুলিশ আমাদের কাছে এসে পড়ে এবং আমার ঠিক পিছনে থাকা ছেলেটিকে লাঠির বাড়ি মারে। যে পুলিশ মারে, তাকে আমি ঘুরে প্রশ্ন করি— আপনারা মারছেন কেন? আমরা তো কিছু করিনি। সে আমাকে চার অক্ষরের একটা নোংরা গালি দেয় এবং পরমুহূর্তেই আমার হাতে লাঠির বাড়ি মারে। আমি চেষ্টা করি, কোনওমতে রাস্তা থেকে ফুটপাথের দিকে যাওয়ার। আর ঠিক এই সময় অনেক পুলিশ আমাকে ঘিরে ফেলে। একজন সাদা উর্দিধারী পুলিশ এই সব অন্য রঙের পোশাকে থাকা পুলিশদের মধ্যে থেকে আমার সামনে এসে নির্দেশ দেন, আপনি এখান থেকে চলে যান। ওখানে কোনও মহিলা পুলিশ ছিল না। আমি একাই মেয়ে ছিলাম। হ্যাঁ পাশে ছেলেরাও ছিলেন, যাঁরাও বিক্ষিপ্তভাবে পুলিশের মার খেয়েছিলেন।
আমি তখনও চিৎকার করছি, বারবার প্রশ্ন করছি— আপনারা মারছেন কেন? আর কী কী বলেছিলাম, মনে করতে পারি না। তারপর আমার পাশে থাকা সহ-আন্দোলনকারীরাই আমাকে ফুটপাথে নিয়ে যায়। যে পুলিশটি আমাকে মেরেছিল, আমি তার মুখ দেখলেও নাম দেখার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না। এই বিষয়টা সম্ভবত টিভিতেও দেখানো হয়েছে। আমার বাবা মা, পরিবার, সকলে উদ্বেগে যে এরপরেও যদি আমাকে চিহ্নিত করে ফের কোনও ক্ষতি করা হয় আমার। রবিবার পুলিশের যে আচরণ, যে ভয়ঙ্কর রূপ দেখেছি, তা যে একেবারেই অযাচিত ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কার্যত কিছুই করিনি কাল, কোনও হিংসা নয়, কিছুই নয়। খালি স্লোগানে গলা মেলাচ্ছিলাম।
হাতে হয়তো একটাই বাড়ি খেয়েছি কাল। কিন্তু যখন আমাকে একাধিক পুলিশ মিলে ঘিরে ধরেছিলেন, একবার মনে হয়েছিল আজকে প্রচুর মার খাবো। কিন্তু আমি মেয়ে বলেই হয়তো সাদা পোশাকের পুলিশটি বাকিদের মারে হাত থেকে আমাকে বাঁচান। পুলিশের কথা এবং আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, ওঁদেরকে বলেই পাঠানো হয়েছে মারার কথা। উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করার মতো কিছু একটা যেন ওদের বডি ল্যাঙ্গোয়েজেই ছিল। একটা শান্তিপূ্র্ণ মিছিলকে দমন করতে যে ভয়াবহ রূপ তারা কাল দেখিয়েছেন, তা যে আমার দেশের তা মানতে কষ্ট হচ্ছে কার্যত। এমন একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আমি একই সঙ্গে মর্মাহত ও বিস্মিত।
(সুরক্ষাস্বার্থে লেখকের নাম গোপন রাখা হল)






