মাদুরো থেকে চাভেস: যেভাবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বারবার হস্তক্ষেপ
US Venezuela relations: একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে। ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উগো চাভেস ক্ষমতায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেন।
ভেনেজুয়েলার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস। এই ইতিহাসে একসঙ্গে জড়িয়ে আছে শক্তির প্রদর্শনের রাজনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদের দখল, রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াই এবং বড় রাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। এই ইতিহাস বুঝতে গেলে শুধু সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান বা রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, ফিরে তাকাতে হয় অন্তত দু'শতাব্দী পেছনে— যে সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে পশ্চিম গোলার্ধের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা শুরু করেছিল।
উনিশ শতকের প্রথম ভাগে ঘোষিত মনরো নীতি ছিল সেই সূচনাবিন্দু। প্রকাশ্যে এই নীতির বক্তব্য ছিল ইউরোপীয় শক্তিকে লাতিন আমেরিকা থেকে দূরে রাখা। কিন্তু আসলে লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধীরে ধীরে এই নীতির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ক্ষমতাশালী জায়গায় বসিয়ে, ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিকে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
ভেনেজুয়েলা তার ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এই প্রভাবক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ শতকের শুরুতে দেশে তেল পাওয়া গেলে ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। মার্কিন শক্তিধর জ্বালানি সংস্থাগুলি দ্রুতই দেশটির খনিজ সম্পদের দিকে নজর দেয়। সেই সময় থেকেই ওয়াশিংটনের কূটনীতি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সামরিক শাসক, কর্তৃত্ববাদী নেতা কিংবা নির্বাচিত সরকার— যেই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, যদি সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত, তবে চাপ তৈরি হত নানা উপায়ে।
ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এই চাপ আরও সুসংগঠিত রূপ নেয়। সমাজতন্ত্র কিংবা বামপন্থী চিন্তার উত্থানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখত। ফলে লাতিন আমেরিকার বহু দেশে অভ্যুত্থান, গোপন অভিযান এবং অর্থনৈতিক চাপ হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। ভেনেজুয়েলায় যদিও দীর্ঘদিন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেনি, তবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও কখনও থেমে থাকেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Venezuela conflic: বে অফ পিগস অভিযানের মতোই এবারও আলোচনায় রয়েছে সিআইএ-র ভূমিকা।
একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে। ভেনিজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট উগো চাভেস ক্ষমতায় এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেন। তেল শিল্পের জাতীয়করণ, সামাজিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংহতির ডাক ওয়াশিংটনের অস্বস্তি বাড়িয়ে তোলে। চাভেস স্পষ্ট করে দেন, ভেনেজুয়েলা আর বাইরের নির্দেশে চলবে না। সেই মুহূর্ত থেকেই সম্পর্ক প্রবেশ করে সংঘাতের পথে।
২০০২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ছিল সেই সংঘাতের প্রথম বড় প্রকাশ। ভেনেজুয়েলার সরকার অভিযোগ করেছিল, এই ষড়যন্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন তা অস্বীকার করে, তবে ঘটনাপ্রবাহ লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়। সেই সময় থেকেই ভেনেজুয়েলা ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের চোখে অবাধ্য রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়।
চাভেসের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার নেয়। মুদ্রাস্ফীতি, পণ্যের ঘাটতি, কর্মসংস্থানের অভাব— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্র একটি সুযোগ হিসেবে দেখে। নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য ছিল, এসব ব্যবস্থা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু বাস্তবে এসব পদক্ষেপ সংকট আরও ঘনীভূত করে।
ক্রমে মাদুরো সরকারকে 'নার্কো-স্টেট' আখ্যা দেওয়া হয়। মাদক চোরাচালান দমনের যুক্তি সামনে এনে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো শুরু হয় ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধজাহাজ, নজরদারি ব্যবস্থা, বিমানঘাঁটি— সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার চারপাশে এক অদৃশ্য বেষ্টনী তৈরি হয়। ভেনেজুয়েলা অভিযোগ করে, এটি সরাসরি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের শামিল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Donald Trump: ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
এই উত্তেজনা ২০২৫ সালে নতুন মাত্রা পায়।যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে গ্রেফতার করতে পুরস্কারের অঙ্ক বাড়ায় এবং তাঁকে ক্ষমতা ছাড়ার জন্য নানা প্রস্তাব দেয়। নিরাপদ বিদায়ের ব্যবস্থা, আইনি সুরক্ষা, পরিবারের নিরাপত্তা— এমন নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু মাদুরো সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিদেশি চাপের কাছে মাথা নত করা মানে দেশের স্বাধীনতাকে বিক্রি করে দেওয়া।
এই প্রত্যাখ্যানের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। সামরিক মহড়া ক্রমশ আক্রমণাত্মক রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা তখনই সতর্ক করেছিলেন, এই প্রস্তুতি কেবল প্রতিরোধমূলক নয়। ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকেও প্রতিরোধের ঘোষণা আসে। দেশটিকে 'প্রতিরোধের প্রজাতন্ত্র' হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়। ২০২৬ সালের শুরুতেই সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অভিযানে নামে এবং মাদুরোকে আটক করে। এই পদক্ষেপকে অনেকেই 'নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ' বলে আখ্যা দেন। কারণ এখানে আর কূটনৈতিক কথাবার্তার আড়াল নেই, কিংবা দীর্ঘ আলোচনার ভানও নেই। সরাসরি শক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে একটি দেশের নেতৃত্ব বদলানোর চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। বহু রাষ্ট্র এই অভিযানের নিন্দা জানায়। জাতিসংঘের কাঠামো, আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাশিয়া ও চিন প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ায়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, কারণ এই ঘটনা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। বহু বছর ধরে সংকটে জর্জরিত জনগোষ্ঠী নতুন করে ভয়, অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার মুখে পড়ে। খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং শরণার্থী প্রবাহ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের খেসারত দেয় সেই মানুষরা, যাদের হাতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের ইতিহাস আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দেয়। শক্তিধর রাষ্ট্র কি এখনও অন্য দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে? উন্নয়ন, গণতন্ত্র কিংবা নিরাপত্তার নামে কি বারবার একই আধিপত্যমূলক পথ অনুসরণ করা হবে? ইতিহাস বলছে, এমন হস্তক্ষেপ খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী শান্তি এনেছে। ভেনেজুয়েলা আজ একটি প্রতীক। এটি দেখায়, একবিংশ শতাব্দীতেও শক্তির রাজনীতি কতটা নির্মম হতে পারে। অতীতের ঘটনাগুলি কীভাবে নতুন রূপ, নতুন ভাষা এবং নতুন কৌশল নিয়ে আবার ফিরে আসে। আর সেই ফিরে আসাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাম্রাজ্যবাদ কখনও পুরোপুরি বিদায় নেয় না, সে শুধু রূপ বদলায়।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত, ঠিক তেমনি বিশ্ব রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে। ইতিহাসের এই অধ্যায় শেষ হবে কবে, কিংবা আদৌ শেষ হবে কি না, তা এখনও অজানা।






