স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও শোষণের শিকার অসংগঠিত ক্ষেত্রের কোটি কোটি শ্রমিক

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও অসংগঠিত ক্ষেত্রের কোটি কোটি শ্রমিক-কর্মী সাংবিধানিক অধিকারগুলি থেকে কার্যত পুরোপুরি বঞ্চিত। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে নানা সরকারি এবং বেসরকারি সমীক্ষাতে। ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজকর্ম করে উপার্জন করেন এমন মানুষের সংখ্যা অন্তত ৫০ কোটি। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই লাগাতার অসহনীয় শোষণের শিকার।

অসংগঠিত ক্ষেত্রের মোট কর্মী অথবা শ্রমিক সংখ্যার ভেতর ২০ শতাংশ মানুষ ছোট ব্যবসায়ী, হকার, দিনমজুর, কলকারখানার শ্রমিকের মতো বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। নুন আনতে পান্তা ফুরোচ্ছে এঁদের। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে ভারতে বারবার রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত কোটি কোটি শ্রমিক-কর্মীর জীবনযাপনের মানের কোনও উন্নতিই হয়নি।

কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে বর্তমানে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ কোটি ৩৬ লক্ষেরও বেশি। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টারের ই-শ্রম পোর্টালে ইতিমধ্যেই নাম নথিভুক্ত করিয়েছেন ২৭ কোটি ৬৯ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক।

আরও পড়ুন: ‘ডিজিটাল’ ভারতেও কোটি কোটি মহিলা বঞ্চিত মোবাইল ব্যবহারে, নয়া সমীক্ষায় বৈষম্য স্পষ্ট 

এ-ব্যাপারে কেন্দ্রের তরফে সুপ্রিম কোর্টকে এ-ও জানানো হয়েছে, ই-শ্রম পোর্টালে নাম তুলেছেন যে পরিযায়ী শ্রমিকরা, তাঁরা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের কল্যাণে কেন্দ্রীয় সরকারের যে সহায়তা প্রকল্পগুলি রয়েছে, তার সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারবেন।

কেন্দ্রের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলিতে অথবা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে যে কোটি কোটি নারী-পুরুষ কাজ করেন, জীবন-সংগ্রামে জেরবার হওয়া সেই মানুষগুলি কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন, তা বলাই বাহুল্য।

যদিও বর্তমান পরিস্থিতি খুবই করুণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করছেন। এই সময়সীমায় অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বলার মতো তেমন কোনও পরিবর্তনই হয়নি। বরং অসংগঠিত ক্ষেত্রের অসংখ্য মহিলা শ্রমিক-কর্মীর দশা অতীব করুণ বলে একাধিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে। যেমন, ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলা শ্রমিক-কর্মীর সংখ্যা ১৯ কোটি ৫০ লক্ষর কাছাকাছি। এঁদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মহিলা কাজের বিনিময়ে নিয়মিত পয়সাকড়ি পাওয়া থেকেও বঞ্চিত। আর টাকা পেলেও হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে পারিশ্রমিক হিসেবে মেলে নামমাত্র টাকা।

সূত্রের খবর, অসংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলা কর্মীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই স্কুল ড্রপআউট। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা না থাকায় আধুনিক দুনিয়া সম্পর্কেও তাঁদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। এছাড়া যে কোটি কোটি পুরুষ ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলিতে শ্রমিক-কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তাঁরাও সমাজের দুর্বল শ্রেণির অন্তর্গত।

অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষায় ২০০৮ সালে প্রণয়ন করা হয় 'আনঅর্গানাইজড সোশ্যাল সিকিওরিটি অ্যাক্ট'। প্রসঙ্গত, ওই আইন প্রণয়নের পরেও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিক-কর্মী অথবা পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনে কার্যত কোনও লাভই হয়নি। করোনা পরিস্থিতিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা সম্পর্কে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টগুলি এর অকাট্য প্রমাণ।

স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির করা সমীক্ষা অনুসারে, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরতরা কাজের মজুরি আদৌ নিয়মিতভাবে পাচ্ছেন না। কৃষিশ্রমিক হিসেবে যে সমস্ত নারী-পুরুষ কাজ করেন, বর্তমানে তাঁদের কাজ জুটছে বছরের মধ্যে মোটে তিন মাস। বাকি ৯ মাস কাটাতে হচ্ছে কর্মহীন জীবন।

অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরতদের স্বার্থে 'মিনিমাম ওয়েজেস অ্যাক্ট' থাকলেও সেই আইনের সুবিধা থেকেও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মীরা বঞ্চিত বলে অভিযোগ। এ-ব্যাপারে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির তরফে যে সমীক্ষা চালানো হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের দৈনিক ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করিয়েও ন্যূনতম মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে অনটন, খিদে অসহ্য হয়ে ওঠায়। পরিসংখ্যান অনুসারে, ভারতে ১০ লক্ষের বেশি শিশু বর্তমানে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক বনে গিয়েছে। শৈশবের মাধুর্য থেকে বঞ্চিত এই শিশুদের একাংশ পরিচারক-পরিচারিকা হিসেবে কিংবা চায়ের দোকান, খাবারের হোটেলে নামমাত্র বেতনে উদয়াস্ত খেটে চলেছে। ন্যূনতম মজুরি মেলাটা ওদের কাছে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্নের মতোই!

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের ই-শ্রম পোর্টালে যে ২৯ কোটি ৬৯ লক্ষ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মী নাম নথিবদ্ধ করিয়েছেন, দেশজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও এঁদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ শ্রমিক-কর্মীর বেতন ১০,০০০ টাকারও কম। এছাড়া যাঁরা নাম নথিবদ্ধ করিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ মানুষই তফশিলি জাতি, তফশিলি উপজাতি কিংবা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অন্তর্গত বলে জানিয়েছে খোদ কেন্দ্রীয় সরকার।

আরও জানা গিয়েছে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের ২০.৯৫ শতাংশ কর্মী তফশিলি জাতি, ৮.১৭ শতাংশ তফশিলি উপজাতি এবং ৪৫.৩২ শতাংশ অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। এঁদের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মীর ২২.১২ শতাংশের বয়স ৪০ থেকে শুরু করে ৫০ বছরের ভেতর। অসংগঠিত ক্ষেত্রে ৫০ বছরের চেয়ে বেশি বয়স্ক শ্রমিক-কর্মী রয়েছেন ১৩.২৩ শতাংশ এবং ১৬ বছর থেকে ১৮ বছর বয়সের শ্রমিক-কর্মীর হার ২.৯৩ শতাংশ।

ই-শ্রম পোর্টালে এপর্যন্ত অসংগঠিত ক্ষেত্রে যে শ্রমিক-কর্মীরা নাম নথিবদ্ধ করিয়েছেন তাঁদের মধ্যে ৫২.৮১ শতাংশ পুরুষ। আর ৪৭.১৯ শতাংশই মহিলা কর্মী। এছাড়া দেশের যে ৫টি রাজ্য থেকে সর্বাধিক সংখ্যক শ্রমিক-কর্মী ই-শ্রম পোর্টালে নাম নথিবদ্ধ করিয়েছেন, সেই রাজ্যগুলির তালিকায় নাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গেরও। এছাড়া অন্য রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও ওড়িশা।

কৃষিশ্রমিক হিসেবে যাঁরা কাজ করছেন কেন্দ্রীয় সরকারি পোর্টালে নাম নথিবদ্ধ করানোর নিরিখে তাঁদের সংখ্যা সর্বাধিক বলে জানা গিয়েছে। কৃষিশ্রমিক হিসেবে কর্মরত ৫২.১১ শতাংশ মানুষ নাম নথিবদ্ধ করিয়েছেন ই-শ্রম পোর্টালে। স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মধ্যে একটা বড় অংশই শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। সেই সুযোগে শোষণ চলছেই। কৃষিক্ষেত্রে কাজ করছেন অসংগঠিত কর্মী হিসেবে যে কোটি কোটি শ্রমিক, তাঁদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা করুণ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ তাঁদের সুবিধার্থে কোনও সরকারি গাইডলাইন না থাকা।

আরেকটি বিষয়ও উদ্বেগজনক। ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজের পরিবেশ বহু ক্ষেত্রেই অস্বাস্থ্যকর। এছাড়া মজুরি নামমাত্র হওয়ায় অধিকাংশ শ্রমিক-কর্মীই অপুষ্টির শিকার।

কী ধরনের অসুখের শিকার অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মীরা? এ-ব্যাপারে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের অধিকাংশ শ্রমিকই শ্বাসপ্রশ্বাজনিত সমস্যার শিকার। নির্মাণশিল্প, চর্মশিল্প, বাজি তৈরির কারখানাতে যে শ্রমিকরা কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে বহু মানুষই শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যার শিকার।

দেশ স্বাধীনের ৭৫ বছর পরেও অসংগঠিত শিল্পক্ষেত্রের শ্রমিক-কর্মীরা এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাননি। কবে সেই ন্যায়সংগত মুক্তিলাভ করবেন ওঁরা, তা সম্ভবত কেউই জানেন না! এই লজ্জা লুকোনোর কোনও উপায়ও নেই।

 

 

 

 

 

 

More Articles

;