'ডিজিটাল' ভারতেও কোটি কোটি মহিলা বঞ্চিত মোবাইল ব্যবহারে, নয়া সমীক্ষায় বৈষম্য স্পষ্ট

মেয়েরা জীবনের বহু ক্ষেত্রেই নানা সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বিশেষত ভারতে। মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যার নিরিখেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের 'ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে'-র রিপোর্টে উঠে এসেছে এই তথ্য। ওই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভারতের মোবাইল ব্যবহারকারীর জাতীয় গড় ৯৩ শতাংশ। কিন্তু এর মধ্যে মোটে ৫৪ শতাংশ মহিলা একটি মোবাইল ফোনের মালিক।

ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র ওই সমীক্ষাটি চালানো হয়েছে দেশব্যাপী। তাতে দেখা যাচ্ছে, মোবাইল ব্যবহারের নিরিখে দেশের অন্য রাজ্যগুলির নিরিখে সবচেয়ে করুণ দশা মধ্যপ্রদেশের। মধ্যপ্রদেশের মোটে ৩৯ শতাংশ মহিলার নিজস্ব একটি মোবাইল ফোন রয়েছে।

মোবাইল নিয়েও ভারতীয় নাগরিক মহিলা সম্প্রদায় লিঙ্গবৈষম্যের শিকার। গুজরাত ও মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে নিজস্ব একটি মোবাইল রয়েছে, এমন মহিলা সংখ্যা শতাংশের নিরিখে ৪৮.৮ শতাংশ এবং ৫৪.৬ শতাংশ।

আরও পড়ুন: নতুন অসুখ অনলাইন গেমে আসক্তি, নেশা কাটানোর উপায় কী?

ভারতের মতোই মোবাইল নামে যন্ত্রটিকে ঘিরে লিঙ্গবৈষম্য রয়েছে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও। শুধুমাত্র ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র মতো সরকারি সমীক্ষাই নয়, বেসরকারি সমীক্ষাতেও মোবাইলকে ঘিরে লিঙ্গবৈষম্যর ছবিটা ধরা পড়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের আন্তর্জাতিক সংস্থা জিএসএম অ্যাসোসিয়েশনের সমীক্ষাতেও দেখা যাচ্ছে, ভারতে মোবাইল ফোন থাকা কিংবা না-থাকা নিয়ে যে লিঙ্গবৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ।

মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের আন্তর্জাতিক সংস্থা জিএসএমের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর মধ্য এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে ৮০ শতাংশ মহিলারই নিজস্ব একটি মোবাইল ফোন রয়েছে। কিন্তু ভারতে মোটে ৫৯ শতাংশ মহিলার নিজস্ব একটি মোবাইল ফোন রয়েছে।

এছাড়া সমস্যা আরও গভীর অন্য একটি কারণে। দেখা যাচ্ছে, নিজস্ব একটি মোবাইল ফোন হয়তো রয়েছে, কিন্তু জিনিসটা কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা জানেন না বহু ভারতীয় মহিলাই। এও জানেন না, কীভাবে ঘাঁটতে হয় ইন্টারনেট।

এই বিষয়টিও ধরা পড়েছে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র সমীক্ষাতে। দেশজুড়ে ওই সমীক্ষাটি চালানো হয়েছিল ৭ লক্ষ ২৪ হাজার ১১৫ জন মহিলার ওপরে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ৭১ শতাংশ মহিলা জানেন, কীভাবে মোবাইল ফোন থেকে মেসেজ করা যায়। বাকিরা এ-সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। বিষয়টি তাঁদের হাতে ধরে শিখিয়ে দেওয়ার মতো উদ্যোগও পরিবারের পুরুষ সদস্যদের নেই।

তবে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে মোবাইল ফোন যথাযথভাবে ব্যবহারের নিরিখে দেশের অগ্রগামী রাজ্য গোয়া। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গোয়ার বাসিন্দা ৯১ শতাংশ মহিলা জানিয়েছেন, তাঁরা যথাযথভাবে মোবাইল ব্যবহার করতে পারেন।

আরও একটি তথ্য ধরা পড়েছে সমীক্ষায়, যা অবাক করার মতো। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মেয়েদের বয়সের সঙ্গেও মোবাইল ব্যবহারের একটা যোগসূত্র রয়েছে। কম বয়সের মেয়েদের তুলনায় বেশি বয়সের মেয়েদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারের চল বেশি। যেমন, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সের মেয়েদের মধ্যে ৩২ শতাংশ একটি মোবাইল ফোনের মালিক। অন্যদিকে, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের মেয়েদের মধ্যে ৬৫ শতাংশর একটি নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। আবার বেশি বয়সের মহিলাদের বেশিরভাগেরই নিজস্ব কোনও মোবাইল ফোন নেই।

ভারতে মহিলাদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে নানা দাবি করা হয়। কিন্তু আজও ভারতীয় সমাজে মহিলারা জীবনের নানা ক্ষেত্রে অসাম্য ও বঞ্চনার শিকার। মোবাইল ফোন সেই তালিকায় নতুন সংযোজন। এই ডিজিটাল ভারতে যা আরও বেশি লজ্জার।

মহিলাদের মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সারা ভারতের নিরিখে সবথেকে পিছিয়ে থাকা রাজ্য মধ্যপ্রদেশ। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র তথ্য অনুসারে, মধ্যপ্রদেশে ৪৮ হাজার ৪১০ জন মহিলার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে মোটে ৩৮ শতাংশ মহিলার নিজস্ব একটি মোবাইল ফোন রয়েছে।

মেয়েদের হাতে মোবাইল না থাকার ফলে যে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, সে-সম্পর্কে পৃথক একটি সমীক্ষা চালিয়েছে হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল। গবে্ষকরা জানিয়েছেন, মেয়েদের হাতে পুরুষের তুলনায় কম সংখ্যায় মোবাইল থাকার ফলে মেয়েরা আধুনিক পৃথিবী সম্পর্কে সচেতন হতে পারছেন না। তাঁদের কাছে পৌঁছচ্ছে না দরকারি তথ্যও। বিষয়টিকে ভারতীয় সমাজের লিঙ্গবৈষম্যের পরিণতি বলেই গবেষকরা মনে করছেন।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিয়ের পরও বহু ক্ষেত্রে ভারতীয় মেয়েদের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া হচ্ছে না। ঘর-সংসারের কাজ মেয়েদের হাতে মোবাইল তুলে দিলে ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা।

মেয়েরাও মেনে নিয়েছেন লিঙ্গবৈষম্যের এই নতুন রূপ। মোবাইল না থাকার ফলে সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউবের ব্যবহার থেকেও বঞ্চিত তাঁরা। সমীক্ষায় এও দেখা গেছে, মোবাইল ব্যবহার করে মেয়েরা যাতে প্রেম না করতে পারে, অভিভাবকরা এই কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিচ্ছেন না।


অন্যদিকে, মেয়েদের একাংশ, যাঁদের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে, বাড়ির বাইরে গিয়ে মোবাইলে কথাবার্তা বলার ব্যাপারে তাঁদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন অভিভাবকরা। এক্ষেত্রেও মোবাইলে প্রেম করা আটকাতে এই পদক্ষেপ অভিভাবকদের। মোবাইলে কথা বলতে হলে তা বলতে হবে অভিভাবকদের সামনেই।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের তরফে করা ওই সমীক্ষায় এও দেখা যাচ্ছে, যে-সমস্ত নাবালিকা কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার নিজস্ব একটি স্মার্টফোন রয়েছে, পরিবারের তরফে তাঁদের অনেককেই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও অনুমোদন নেই ফেসবুক ব্যবহারের। ফেসবুকে ছবি দিয়ে অচেনা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোটা পারিবারিক নিয়মের পরিপন্থী ভারতীয় সমাজে।

তবে গত ১০ বছরের তুলনায় ধীরে ধীরে মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে মেয়েদের প্রতি লিঙ্গবৈষম্যমূলক এই আচরণ খানিকটা পাল্টেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির তরফে এ-সংক্রান্ত যে সমীক্ষাগুলি চালানো হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ভারতে প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে দু'টি পরিবারেই নাবালিকা কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের স্মার্টফোন ব্যবহারের কোনও অধিকার ছিল না। তথ্য জানতে, অনলাইনে কেনাকাটা করে দাম মেটানো-সহ মোবাইলের মাধ্যমে কোনও পরিষেবা নিতে হলে ১০ বছর আগে অসংখ্য মেয়েকে নির্ভর করতে হতো পরিবারের পুরুষ সদস্যর মোবাইলের ওপর। ১০ বছর পেরিয়ে কার্যত সেই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ১০ বছর আগে মোটে ৪ কোটি ভারতীয় মহিলা মোবাইল ব্যবহার করতেন। বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে নাবালিকা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে অন্তত ২০ কোটি মহিলা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন।

More Articles

;