কেন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনপিএ গঠিত হলো?

NPA Bangladesh: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনপিএ তাঁদের ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তিনজনকে মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে— ফেরদৌস আরা রুমি, মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত।

inscript
৪ মিনিট
কেন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনপিএ গঠিত হলো?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের আত্মপ্রকাশ ঘটল। ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ বা সংক্ষেপে এনপিএ নামে এই প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয়েছে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়; বরং নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে একটি যৌথ রাজনৈতিক উদ্যোগ। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন ও পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই নতুন মঞ্চের আবির্ভাবকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

এনপিএ মূলত সেই তরুণ ও নাগরিক আন্দোলনকারীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে, যাঁরা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁদের মধ্যে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে— শুধু সরকার পরিবর্তন বা ক্ষমতার পালাবদলই যথেষ্ট নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। এই ভাবনা থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনপিএ তাঁদের ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তিনজনকে মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে— ফেরদৌস আরা রুমি, মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত। এই তিনজনই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নাগরিক অধিকার প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাংলাদেশের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট

Khaleda Zia’s Funeral: এই জানাজায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা সকলেই বিএনপি কর্মী ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তিম বিদায়ে এমন ছবি এই উপমহাদেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে।

এনপিএ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাঁচটি মূল নীতির কথা বলেছে: গণতন্ত্র, সমতা, মানুষের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং জীবনের ও পরিবেশের নিরাপত্তা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মৌলিক বিষয়গুলি ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, দলীয় স্বার্থ এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা মানুষের অধিকারকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে।

এনপিএ মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ খুব সীমিত। নির্বাচন, সংসদ, প্রশাসন— সব ক্ষেত্রেই নাগরিকদের ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ, নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাজনীতিতে খুব কমই শোনা যায়। এই পরিস্থিতি বদলানোই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

সংগঠনটির বক্তব্যে ‘জুলাইয়ের গণআন্দোলন’-এর বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। তাদের মতে, ওই আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও দমনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। এনপিএ দাবি করছে, সেই আন্দোলনের মূল চেতনাকে ধরে রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের সংকট ফিরে আসবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া

Khaleda Zia death: খালেদা জিয়ার মধ্যে রূপান্তরমূলক নেতৃত্বের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব হলো এমন এক ধরনের নেতৃত্বের মডেল, যা সামগ্রিক সাফল্য অর্জনের জন্য একটি সম্মিলিত উৎসাহের উপর নির্ভর করে।

এনপিএর নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁরা কেবল পুরনো রাজনৈতিক দলগুলির বিকল্প হতে চান না। বরং তাঁরা চান রাজনীতির ভাষা, সংস্কৃতি ও চর্চা বদলাতে। তাঁদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতি মানেই ক্ষমতা, দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের গল্প। এই ধারণা ভেঙে রাজনীতিকে আবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁদের লক্ষ্য।

এই নতুন মঞ্চে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই আগে বিভিন্ন বামপন্থী, নাগরিক ও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছেন। কেউ কেউ আগে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ফলে এনপিএকে একটি ‘নাগরিক ও বাম-সেন্ট্রিস্ট’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁরা এখনই নিজেদের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক ঘেরাটোপে আটকে রাখতে চাইছে না।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নির্বাচন ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনীতি এবং মানবাধিকার নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। এই পরিস্থিতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ মানুষের মধ্যে নতুন আশা তৈরি করতে পারে, এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

তবে এনপিএর সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ টিকে থাকা সহজ নয়। প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং গণমাধ্যমে পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ার মতো সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে তাদের। অতীতে অনেক নতুন রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্ম আশার আলো দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারেনি।

এনপিএ নেতারা অবশ্য বলছেন, তাঁরা ধীরে ধীরে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে চান। শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই তাদের লক্ষ্য। স্থানীয় সমস্যা, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য— এসব বিষয়কে রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে চান তাঁরা।

এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়েও রাজনীতি করা যায়— এই ধারণাটিই এনপিএ তুলে ধরতে চাইছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।