কেন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনপিএ গঠিত হলো?
NPA Bangladesh: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনপিএ তাঁদের ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তিনজনকে মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে— ফেরদৌস আরা রুমি, মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের আত্মপ্রকাশ ঘটল। ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ বা সংক্ষেপে এনপিএ নামে এই প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয়েছে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়; বরং নাগরিক অধিকার, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে একটি যৌথ রাজনৈতিক উদ্যোগ। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন ও পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই নতুন মঞ্চের আবির্ভাবকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
এনপিএ মূলত সেই তরুণ ও নাগরিক আন্দোলনকারীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে, যাঁরা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁদের মধ্যে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে— শুধু সরকার পরিবর্তন বা ক্ষমতার পালাবদলই যথেষ্ট নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। এই ভাবনা থেকেই একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনপিএ তাঁদের ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তিনজনকে মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে— ফেরদৌস আরা রুমি, মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত। এই তিনজনই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নাগরিক অধিকার প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia’s Funeral: এই জানাজায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা সকলেই বিএনপি কর্মী ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তিম বিদায়ে এমন ছবি এই উপমহাদেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে।
এনপিএ নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাঁচটি মূল নীতির কথা বলেছে: গণতন্ত্র, সমতা, মানুষের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং জীবনের ও পরিবেশের নিরাপত্তা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মৌলিক বিষয়গুলি ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, দলীয় স্বার্থ এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা মানুষের অধিকারকে পিছনে ঠেলে দিচ্ছে।
এনপিএ মনে করে, বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ খুব সীমিত। নির্বাচন, সংসদ, প্রশাসন— সব ক্ষেত্রেই নাগরিকদের ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ, নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর রাজনীতিতে খুব কমই শোনা যায়। এই পরিস্থিতি বদলানোই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
সংগঠনটির বক্তব্যে ‘জুলাইয়ের গণআন্দোলন’-এর বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। তাদের মতে, ওই আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও দমনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। এনপিএ দাবি করছে, সেই আন্দোলনের মূল চেতনাকে ধরে রাখতে না পারলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের সংকট ফিরে আসবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia death: খালেদা জিয়ার মধ্যে রূপান্তরমূলক নেতৃত্বের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব হলো এমন এক ধরনের নেতৃত্বের মডেল, যা সামগ্রিক সাফল্য অর্জনের জন্য একটি সম্মিলিত উৎসাহের উপর নির্ভর করে।
এনপিএর নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁরা কেবল পুরনো রাজনৈতিক দলগুলির বিকল্প হতে চান না। বরং তাঁরা চান রাজনীতির ভাষা, সংস্কৃতি ও চর্চা বদলাতে। তাঁদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতি মানেই ক্ষমতা, দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের গল্প। এই ধারণা ভেঙে রাজনীতিকে আবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁদের লক্ষ্য।
এই নতুন মঞ্চে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই আগে বিভিন্ন বামপন্থী, নাগরিক ও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছেন। কেউ কেউ আগে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ফলে এনপিএকে একটি ‘নাগরিক ও বাম-সেন্ট্রিস্ট’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁরা এখনই নিজেদের নির্দিষ্ট কোনো আদর্শিক ঘেরাটোপে আটকে রাখতে চাইছে না।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নির্বাচন ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনীতি এবং মানবাধিকার নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। এই পরিস্থিতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ মানুষের মধ্যে নতুন আশা তৈরি করতে পারে, এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
তবে এনপিএর সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ টিকে থাকা সহজ নয়। প্রশাসনিক চাপ, রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং গণমাধ্যমে পর্যাপ্ত জায়গা না পাওয়ার মতো সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে তাদের। অতীতে অনেক নতুন রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্ম আশার আলো দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারেনি।
এনপিএ নেতারা অবশ্য বলছেন, তাঁরা ধীরে ধীরে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে চান। শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই তাদের লক্ষ্য। স্থানীয় সমস্যা, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য— এসব বিষয়কে রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে চান তাঁরা।
এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে এটুকু স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়েও রাজনীতি করা যায়— এই ধারণাটিই এনপিএ তুলে ধরতে চাইছে।






