মাঘের দিনে শাক মহোৎসব একখানা ছবি হয়ে উঠতে চাইছে...

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
মাঘের দিনে শাক মহোৎসব একখানা ছবি হয়ে উঠতে চাইছে...

মাঘের হাওয়ায় কাজ সারা যায় না বাপু। জাড়ে টুকুরি লেগে যেছে। তবু, বললি আর শুনবে কে! এ পাড়ার মেয়েরা আজ হাত চালিয়ে কাজ সারছে। সবার চোখে মুখে আজ ব্রিগেড সমাবেশের ব্যস্ততা। খাওয়া সেরে, চুলো নিভিয়ে মেয়ের দল মায়ের দল এখন মাঠে মাঠে শাক কুড়োতে যাবে। দলে দলে ওদের বেরিয়ে পড়া দেখতে দেখতে তখন মনে হবে, কোন মহামিছিলের অহ্বানে ওরা বুঝি আজ ঘরছাড়া। ঘরের ডাক ওদের আজ দাবিয়ে রাখতে পারবে না কোনো মতেই। মাঘের হাওয়ার মতোই ওদের ইচ্ছেরা আজ উড়ছে, কেবলই উড়ছে। সাঁওতাল মেয়ের শরীর ঘিরে এখন কেবলই জেগে উঠতে চাইছে কাজের হর্ষ। একেই কি কর্মযোগ বলে? জানি না। আসলে এসব জানা বা না জানায় কিছু এসে যায় না কারও। এখন মাঠে মাঠে বাথুয়া শাকের মরশুম, সর্ষে শাকের মরশুম। মেয়ের দল এখন কোচড় ভরে শাক তুলবে। এই শাক কোচড় ফেরতা বাড়ি এসে রোদ্দুর মাখবে কত! তবে তো কুটো ডাঁটা ঝেড়েঝুরে শুকনো শাক কৌটোয় ভরে তুলে রাখবে শাক কুড়ানি মেয়ে! টাটকা শাকের চেয়ে এ শাক ঢের বেশি পছন্দ সক্কলের। আহা, সামান্য ফ্যানে শাকের গুড়ো দে ফুটিয়ে নাও আর টুকুন খানিক লবন। এক খানা মরিচ ডলে নিলে নিমেষে গরাস ভরে, গ্রীবা ভরে তখন পার্থিব সুখ গড়িয়ে পড়তে চাইবে। চুরকি বাসকের, মাখানি কিসকুর এমন করে ভাত খাওয়ার সুখ কী জানি কেমন করে মিলে যায় নদের চাঁদের প্রণয় মহিমায়!

ষোড়শ শতকের কবি তো লিখেছিলেন, ‘ বাস্তূক শাক খাইলে হয় কৃষ্ণভক্তি’... আহা! কেমন করে তিনি মানুষের স্বাদ কোরককে ছুঁয়ে গেলেন কৃষ্ণ প্রেমের নাম সংকীর্তনে! এ তো সামান্য শাক নয়! নদের চাঁদের স্নেহ ধন্য সে। সে কি সামান্য হলো? সে তো উদ্ভিদ নয়! সে ভূত বস্তুকে ভেদ করে ওঠে, তাই না সে বাস্তূক! চোত বোশেখের রুখা শুখা মাঠে ওর বীজ গড়াগড়ি যায় গরম হাওয়ায়। বর্ষার জলও পারে না তার ঘুম ভাঙাতে, না পারে শিশিরের ওম। এমন শীতের দিনেই কেবল তার জেগে ওঠা। সে যেন জমি জিরেতের বাসিন্দে, সব ফেলে এই কি তার ঘুম ভাঙানিয়া গান? একে একালের মানুষ রেজারেকশন বলে দাগিয়ে দিতে পারেন কিন্তু সেই কোন এগারো শতকের চক্রদত্ত! তিনি কি তার সামান্য সুখ্যাত করেছেন! এই সুখ্যাতের নদী কেবলই পলিদ্বীপ গড়েছে মানুষের স্বাদ কাহনকে ভালোবেসে। সেই আর্য ঋষির মুগ্ধতা কি চুরকি বাসকের মুগ্ধতার চেয়ে কম! না বোধহয়! ওই শাককুড়ানি মেয়ের হাসিখানা দেখলেই আপনি টের পাবেন ঋষিবাক্য নির্ভুল। এমন করে মাঘের দিনে হাওয়া আর ঝুপ করে ডুবে আসা রোদ্দুরকে সাক্ষী রেখে ওদের এই শাক মহোৎসব একখানা ছবি হয়ে উঠতে চাইছে আপাদমস্তক দিয়ে।

এই রৌদ্রতপ্ত শাকে কেবল কি সঞ্চয়ের ব্যাকুলতা? তা তো না! মানুষের স্বাদকোরককে তুমি কিনে নিতে চাও, সে কি ইমানদারের মতো কথা হলো? ফ্যানে ফোটা শাক দিয়ে ভাত খাক বরং মাখানি আর চুরকি, চলুন আমরা বরং বাজার থেকে এক চক্কর ঘুরে আসি। খাম আলু, আলু শাক মায় আলতাপাটি শিম তো জুটে যেতে পারে। অমন শিম কাটতে গেলে তার বাস ওঠে কত! কুয়াশার মতো শিমেরও তো গন্ধ থাকে। সে গন্ধ মানুষকে ঘর মুখো করে তুলতে চায় সকালের ব্যস্ততায়। সে গন্ধে মিশে আছে, ফ্যানভাতের উষ্ণতা। ফুরিয়ে আসা শীতের বিকেলে কোচড় ভরে শিম তোলে যারা তাদের বুঝি শিম ফুলের মতো নোলক পরতে সাধ যায় না! যাবেই তো, যেতেই হবে। নইলে গল্পের লাটাই গড়িয়ে গড়িয়ে চলবে কেমন করে? এ তো আর তুষার রাজকন্যের দেশ নয়! লালটুপি খুকি আর নেকড়ে বাঘের গল্পই এখানে আছে বুঝি! নেই, নেই। মাঘের রাতে চুলোর ধারে বসে বসে ভাত ফোটানো মা এখানে শাক কুড়ানোর গল্প বলে, আহিরি কলাইয়ের পাতার ফাঁকে ন্যাজ ঝোলা হলুদ পাখির গল্প বলে।

দেশের বাড়ির রান্না সিরিজের আগের লেখা-দুধ চিতই, চষির পায়েস, রসবড়া, কেবলই পার্বণের জলপান?

গল্পে গল্পে বেলা বাড়ে। মেয়ে তখন বায়না ধরে আমি মুড়ির মেলায় যাব। মায়ে তাকে কত যে বোঝায়! বলে, 'ক্যামনে যাবি! বাঁকড়ো কি এইখেনে! তার চেয়ে চল ব্রহ্মদত্যির পুজোয় মোচ্ছব খেয়ে আসি।' মেয়ে তখন গোল গোল চোখে কান্না থামায়। বলে, 'ব্রহ্মদত্যি কী মা? মা, বলে, জানোনি মণি! তিনিই যে এই খেতি, এই ফসল পাহারা দেন গো!' বলতে বলতে মা আরো খানিক জাল ঠেলে দেন। আগুন খানিক বেড়ে উঠলে টের পাওয়া যায় মায়ের মনের মধ্যে ছায়া ফেলে যাচ্ছে হাড়ির মেলা। এই তো আমাদের পাঁড়ুইয়ে গো। মেটে হাড়িতে কতদিন ভাত খায় না মা! সেই শুঁও ওঠা আগরা ধানের চাল! কী যে সোয়াদ তার! মেয়ের অবশ্য এই উদাসীনতা ভালো লাগে না। মেয়ে বলে, 'মা, ব্রহ্মদত্যি কি ওই মাঠে থাকে?' থাকেই তো! তবেই না শাকে শাকে ভরে ওঠে মাঠ! তবেই না পাকা ধানের গন্ধে মৌতাত লাগে মানুষ আর না-মানুষের! মাঠ পেরিয়ে মরা নদীর বাঁক পেরিয়ে ওই তো তিনি চলেছেন! গল্পে গল্পে ঘুম নামে চোখে। গোল গোল চোখের মেয়ে তখন স্বপনের মধ্যে তলিয়ে যায়। ওই বাথুয়ার মাঠ ওই সাদা সর্ষের ফুল ওকে ডাকে। ওর কি আর ফেরার অবকাশ আছে? মাঘের হিমে চুলার ওমে শাক কুড়ানি মেয়ে এখন তলিয়ে গেছে ঘুমে। এমন করে গাঁয়ে গাঁয়ে এখন রাত্তির নামবে। মাঘের হাওয়ায় ফিনিক ফোটা জোছনায় কেবল জেগে থাকবে বাথুয়ার মাঠ। মাটিতে মিশে গিয়েও মানুষের কাছে ফিরে আসার কী তার ব্যাগ্রতা!

মুড়ির মেলা, হাড়ির মেলা ঠেলে আমি আসলেই টের পাই কোন সে এক ব্রহ্মদত্যি মাঠের প্রান্তে বসে ফসল পাহারা দিচ্ছেন এক মনে। মোচ্ছবের গড়িয়ে যাওয়া খিচুড়ি পেরিয়ে ওঁরও কি ইচ্ছে করে একবার বাথুয়ার মতো মানুষের হাতে গড়া বেগুন বাড়িটির পাশে গিয়ে বসতে? হয়তো বা করে। মানুষের গপ্পে ওর ভূমিকা আর কতটুকুই বা! তবু, কি ওই ফসল ফলানো মানুষের কাছে ও সত্যি নয়? এই যে আমাদের চুরকি বলে, 'ওর নাম বাস্তূক না রে দিদি, ও হলো ভাথু আরা। সে কি কম সত্যি হলো!'

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।