গয়না খুলে দিয়ে, নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অঞ্জন চৌধুরীর স্ত্রী
২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মারা যান অঞ্জন চৌধুরী, ২১ অগাস্ট, ২০২২-এ চলে গেলেন স্ত্রী জয়শ্রী চৌধুরী, রেখে গেলেন একরাশ স্মৃতি।

সে এক অন্য লড়াই, স্বামীর পাশে দাঁড়াতে নিজের সব শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছিলেন। বাবা বিয়ে মেনে না নেওয়ায় এক কাপড়ে বাপের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলেন স্বামীর হাত ধরে। তিনি প্রখ্যাত পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর স্ত্রী জয়শ্রী চৌধুরী।
রবিবার প্রয়াত হয়েছেন জয়শ্রী দেবী, দীর্ঘদিন ধরে হাই সুগারের সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন, এদিন মাল্টি অর্গান ফেলিওর হয়ে প্রয়াত হলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। দুর্দিনে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, এমন অনেক উদাহরণের সাক্ষী হয়ে থেকেছেন বাংলার অনেক বিখ্যাত পরিচালকের স্ত্রী-রা, যাঁদের মধ্যে অন্যতম সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়, তেমনই একজন স্ত্রী ছিলেন প্রয়াত পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর সহধর্মিনী জয়শ্রী চৌধুরী।
খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল অঞ্জন-জয়শ্রীর, অঞ্জন চৌধুরীর বাবা সুকুমার চৌধুরী ধর্মতলার একটি প্রেসের মালিক ছিলেন, যৌথ পরিবারে একচিলতে ঘর ছিল প্রয়াত পরিচালকের জন্য বরাদ্দ, সেইসময় পালিয়ে জয়শ্রী দেবীকে বিয়ে করেন অঞ্জন, জানা যায়, তাঁদের তিন-তিনবার বিয়ে হয়েছিল, প্রথমে রেজিস্ট্রি করে বাড়ির অমতে বিয়ে, পরে অঞ্জন চৌধুরীর মায়ের কথায় কালীঘাটে বিয়ে, জয়শ্রী দেবীর বাবা মেয়ের পালিয়ে বিয়ে মেনে নিলে রিশেপশন করে ধুমধামের সঙ্গে বিয়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কী হয়েছিল সেই দিন? বাড়ির লোক বারবার বলেছেন, ছেলের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে স্টোভটা ফেটে যায়। সেই থেকেই গায়ে আগুন লাগে। মেনে নেওয়া যেত, যদি না রান্নাঘর থেকে অক্ষত, শুকনো অবস্থায় স্টোভটা উদ্ধার না করত পুলিশ।
দাম্পত্য জীবনের শুরুতে তাঁদের চলার পথটি সহজ ছিল না, বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যে বাড়ির সঙ্গে মনোমালিন্য করে স্ত্রী জয়শ্রী চৌধুরীকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন অঞ্জন, বেহালার একটি পাড়ায় ভাড়া বাড়িতে ঠাঁই হয় দু'জনের, এরপর রায়বাহাদুর রোডে একটি অল প্রিন্ট প্রেস খুলে বসেন অঞ্জন চৌধুরী, কিন্তু ২টি বাড়ি ভাড়া মেটানোর টাকা কোথায়, প্রেসের মেশিন কেনার খরচই বা আসবে কোথা থেকে?
সেদিন স্বামীর পাশে দাঁড়াতে একে একে গয়না খুলে দিয়েছিলেন জয়শ্রী, সেই গয়না বেচে শুরু হয় অঞ্জন চৌধুরীর প্রেস, নিয়মিত বেরোতে থাকে 'চুমকি' নামে একটি পত্রিকা, শুরুতে সেভাবে সফল না হলেও পরে বড় অভিনেতা, পরিচালকদের কাজ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় পত্রিকায়। ব্যস! অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পরে পত্রিকার নাম, প্রয়াত পরিচালকের লেখার হাতটি ছিল দারুণ। একদিন এই পত্রিকার অফিসে বসেই লিখে ফেললেন রঞ্জিত মল্লিক অভিনীত 'শঠে শঠ্যাং' সিনেমার চিত্রনাট্য।
এরপর রঞ্জিত মল্লিকের অনুপ্রেরণাতেই একের পর এক কালজয়ী সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা। 'গুরুদক্ষিণা', 'বউ' সিরিজ, 'শত্রু', 'নবাব', 'ইন্দ্রজিৎ'-সহ বিভিন্ন ব্লক ব্লাস্টার সিনেমার কাহিনি লেখা হলো। সেসব সিনেমা বানানোর জন্যও কম আত্মত্যাগ করতে হয়নি পরিচালককে, আর সেই আত্মত্যাগের শরিক সবসময়ই হয়েছেন জয়শ্রী চৌধুরী। মেয়ে রুমকি চৌধুরীর মতে, তাঁদের মা জয়শ্রী চৌধুরী দারুণ গান গাইতেন, তাঁর নাচের তালিমটিও ছিল অসাধারণ, কিন্তু কোনওদিন পর্দার সামনে আসেননি। স্বামীর নাম-যশ ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। নিজের কেরিয়ারের স্বপ্ন তাই লালন করার কথাও আর ভাবেননি তিনি।
পরিচালকের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে, মেয়ে চুমকি ও রুমকি চৌধুরীকে একদিন পর্দার সামনে নিয়ে এলেন পরিচালক। তাঁদের নাচের তালিম দিলেন তাঁদের মা জয়শ্রী চৌধুরীই। তাঁদের রায়বাহাদুর রোডের বড় বাড়িটাই হয়ে উঠেছিল আস্ত একটা শুটিং স্পট। সেখানে যাবতীয় তদারকির দায়িত্ব স্বামীর পাশাপাশি চালিয়ে গিয়েছেন জয়শ্রী চৌধুরীও। কিন্তু কেউই জানতে পারেননি, এক সময়ের বাংলা মূলধারায় ঝড় তোলা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী এই উচ্চতায় পৌঁছতেই পারতেন না, যদি জয়শ্রী চৌধুরী না থাকতেন।
২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মারা যান অঞ্জন চৌধুরী, ২১ অগাস্ট, ২০২২-এ চলে গেলেন স্ত্রী জয়শ্রী চৌধুরী, রেখে গেলেন একরাশ স্মৃতি। হয়ে থাকলেন শিল্পীর সহযোগী হয়ে ওঠার জ্বলন্ত উদাহরণ।
















