ছাত্রদের অপেক্ষা করাতে চাননি, কীভাবে জীবনের শেষ দিন কাটিয়েছিলেন আবদুল কালাম
সৃজনপাল যখন কালাম সাহেবের জন্য মাইক সেট করছিলেন, সেই সময় হাসতে হাসতে কালাম সাহেব জিজ্ঞেস করেন, "তুমি ঠিক আছ তো?" এটাই ছিল কালাম সাহেবের জীবনের শেষ কিছু কথা।

২০১৫ সালের ২৭ জুলাই প্রয়াত হয়েছিলেন ভারতের 'মিসাইল ম্যান'। এরোস্পেস বিজ্ঞানী না কি ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি- কোনটি তাঁর কাছে বড় পরিচয়, এই নিয়ে তর্ক এখনও চলে। তিনি হলেন আবুল পাকির জইনুল আবেদিন আবদুল কালাম। খুব অচেনা লাগছে কি? না, আসলে তিনি আমাদের ভীষণ চেনা একজন মানুষ- এপিজে আবদুল কালাম। একদিকে যেমন তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম একজন এরোস্পেস বিজ্ঞানী, তেমনই ছিলেন ভারতের একজন রাষ্ট্রপতি। ভারতে ইতিমধ্যেই অনেকেই রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কিন্তু সকলের মনেই এখনও জীবিত রয়েছেন কালাম। কিন্তু এত দায়িত্বের মধ্যেও, তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক। ১৫ অক্টোবর, ১৯৩১ সালে রামেশ্বরমে তাঁর জন্ম হয়েছিল। ২৭ জুলাই, ২০১৫ সালে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং-এ আইআইএম-এর ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা রাখার সময় মৃত্যু হয় তাঁর। সারাজীবন নিজেকে একজন শিক্ষকের ভূমিকায় দেখেছিলেন এপিজে আবদুল কালাম।
ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে একটা অন্যরকম বন্ধন অনুভব করতেন কালাম সাহেব। আর সবসময় তিনি পড়ুয়াদের মাঝে থাকার চেষ্টা করতেন। অসম্ভব জ্ঞানের অধিকারী হলেও, তিনি সবসময় নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতেন। তিনি বলতেন, যদি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সময় কাটানো যায়, তাহলে তাদের ভাবনাচিন্তা থেকেও অনেক কিছু শেখা সম্ভব। কালাম সাহেবের এই ইচ্ছে তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছিল। ৮৩ বছর বয়সে মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তৃতা রাখার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
দুপুর তিনটের সময় পৌঁছেছিলেন গুয়াহাটি
ড. এপিজে আবদুল কালামের মৃত্যুর দিন তাঁর সবসময়ের সঙ্গী ছিলেন সৃজনপাল সিং। তিনি ড. এপিজে আবদুল কালামের সহযোগীও ছিলেন একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। তিনি বলছেন, ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই দুপুর তিনটের সময় কালাম সাহেব দিল্লি থেকে গুয়াহাটি পৌঁছেছিলেন। তারপর সেখান থেকেই গাড়ি ধরে তিনি সরাসরি রওনা দিয়েছিলেন শিলং-এর উদ্দেশ্যে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা সফর করার পরে শিলং পৌঁছেছিলেন ড. এপিজে আবদুল কালাম। সবসময় গাড়িতে ঘুমোনো অভ্যাস ছিল তাঁর। গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ঘুমে ঢলে পড়তেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সেই দিন তাঁর ঘুম আসেনি। বরং রাস্তায় পুরোটা সময় তিনি সকলের সঙ্গে কথা বলে কাটিয়েছিলেন।
পাঁচ ঘণ্টায় কথা হয়েছিল বহু বিষয় নিয়ে
সৃজনপাল সিং বলছেন, দিল্লি থেকে শিলং এয়ারপোর্ট এবং শিলং এয়ারপোর্ট থেকে আইআইএম পৌঁছনোর জন্য সেদিন সময় লেগেছিল প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। সেই পুরো সময়টাতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সৃজনের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন ডক্টর কালাম। ২০০৯ থেকেই কালাম সাহেবের ছায়াসঙ্গী হয়েছিলেন সৃজনপাল সিং। বহুবার তাঁর সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন তিনি। আর প্রত্যেক যাত্রার মতো শিলংয়ের এই জার্নিটাও ছিল অত্যন্ত স্পেশাল। এই যাত্রার সময়কালে তিনটি বিষয় নিয়ে মূলত আলোচনা হয়।
পাঞ্জাবের হামলার কথা জেনে ব্যথিত হয়েছিলেন কালাম সাহেব
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাল ১৯৪৫। জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজ বার্মা রওনা দিলেও মার্চ ১৯৪৫-এ তারা পিছু হটে। ১৯৪৫ সালের মে মাসে লক্ষ্মী সেহগলকে ব্রিটিশ সেনা গ্রেফতার করে এবং ১৯৪৬ সালের মার্চ মাস অবধি তাকে বার্মার জেলে আটকে রাখা হয়।
পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে হওয়া জঙ্গিহামলা যেন একেবারে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ডক্টর এপিজে আবদুল কালামকে। এই হামলা নিয়ে কথা বলার সময় তাঁর গলা ভারী হয়ে আসছিল। আইআইএম শিলং-এর বক্তৃতাসভায় তাঁর আলোচনার মূল বিষয়টা ছিল 'বাঁচার মতো পৃথিবী তৈরি করা'। পাঞ্জাব হামলা নিয়ে কথা বলার সময় ড. এপিজে আবদুল কালাম বলেছিলেন, "আমার মনে হয়, মানুষ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে আজকের যুগে যে সমস্ত শক্তি তৈরি করেছে, সেগুলি পৃথিবীর জন্য ততটাই ক্ষতিকারক, যতটা দূষণ।"
মানুষের অবহেলা নিয়েও চিন্তিত ছিলেন ড. কালাম
সৃজনপাল বলছেন, "গাড়িতে যেতে যেতেই আমরা এই বিষয়টা নিয়ে চর্চা করছিলাম। তিনি বলছিলেন, যদি দূষণ এবং এর প্রতি সমাজের অবহেলা এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে মানুষের পক্ষে এই পৃথিবীতে আর বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না। হয়তো এমন একটা দিন আসবে, যখন আমাদের এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। আগামী ৩০ বছরের মধ্যেই, এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা পৃথিবীতে মানুষের জীবনধারণ অসহনীয় করে তুলবে। তোমাদের এই বিষয়টা নিয়ে কিছু করা উচিত। তোমাদের দিকে দুনিয়া তাকিয়ে। তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তোমাদের নিজেদেরকেই কিছু একটা করতে হবে।"
সংসদের বিকাশ এবং রাজনীতি নিয়ে চর্চা
ড. কালাম বলেছিলেন, "আমি নিজের কার্যকালে দু'রকম আলাদা আলাদা সরকার দেখেছি। যে সরকারই ভারতে আসুক না কেন, তারা কোনও না কোনওভাবে বিজ্ঞান চর্চায় হস্তক্ষেপ করে। কোন সরকার হয়তো বেশি, কোন সরকার হয়তো কম। কিন্তু প্রত্যেক সরকার বিজ্ঞানচর্চায় হস্তক্ষেপ করে এসেছে আজ অবধি। এই কারণেই বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতের উন্নতি খুব একটা বেশি নয়। আমাকে এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে বিজ্ঞানচর্চা এবং রাজনীতি এক সূত্রে না বাঁধা পড়ে। কোনও দেশকে চালাতে গেলে দু'টিরই প্রয়োজন সমান ভাবে। কিন্তু যদি সংসদীয় রাজনীতি বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে ভারত বিজ্ঞানচর্চায় কখনওই উন্নতি করতে পারবে না।"
চেয়েছিলেন যাতে তাঁর ছাত্ররা এ-বিষয়ে অগ্রণী হয়
সৃজনপাল বলছেন, কালাম সাহেব সব সময় চেয়েছিলেন, যেন ভারতের বিজ্ঞানচর্চায় যুব সমাজ এগিয়ে আসে। গাড়িতে বসেই আইআইএম শিলং-এর ছাত্রদের জন্য প্রশ্ন তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর সবসময় ইচ্ছে ছিল, যেন, যুবসমাজ সমাজের সামগ্রিক বিকাশের জন্য কোনও না কোনও পদক্ষেপ করে। বিজ্ঞানমনস্ক ছাত্রদের রাজনীতিতে আরও বেশি করে প্রবেশ করা উচিত বলেও তিনি সবসময় মনে করতেন। কালাম সাহেবের ইচ্ছে ছিল, যেন তাঁর ছাত্ররা ভারতীয় রাজনীতিকে আরও বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলে, লোভ চরিতার্থ করার রাজনীতি নয়, বরং ভারতে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটিয়ে জনমানসের ও জীবনের আরও মানোন্নয়ন করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
নিরাপত্তারক্ষীর কষ্টে দুঃখিত ছিলেন কালাম সাহেব
শিলং এয়ারপোর্ট থেকে আইআইএম যাওয়ার রাস্তায় কালাম সাহেবের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি কনভয়। এই কনভয়ের তৃতীয় গাড়িতে বসেছিলেন কালাম সাহেব। তাঁর সামনে ছিল দু'টি ওপেন জিপ, যেখানে তিনজন বন্দুকধারী জওয়ান ছিলেন। এদের মধ্যে দু'জন দুই পাশে বসে ছিলেন এবং মাঝখানে ওপরে বন্দুক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক সেনা জওয়ান। গাড়িতে যাবার সময় কালাম সাহেব প্রশ্ন করেছিলেন, "ও দাঁড়িয়ে কেন আছে? ওকে বলো বসে পড়তে। এটা তো অনেকটা শাস্তি দেওয়ার মতো।" এমনকী, ওয়ারলেসের মাধ্যমে মেসেজ করেও ওই সেনা জওয়ানকে বসে পড়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন ড. এপিজে আবদুল কালাম। তবে ড. কালামের সুরক্ষা ছিল সবার আগে, তাই ওই সেনা জওয়ান বসেননি। এমনকী, আইআইএম শিলংয়ের সামনে পৌঁছনোর পর ওই সেনা-জওয়ানকে নিজে অভিবাদন জানিয়েছিলেন ড. এপিজে আবদুল কালাম। প্রশ্ন করেছিলেন, "তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়োনি তো? তুমি কি কিছু খাবে? আমি ক্ষমাপ্রার্থী যে আমার জন্য তোমাকে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলো।" উত্তরে ওই সেনা জওয়ান বলেছিলেন, "আপনার সুরক্ষার জন্য তো আমরা সবসময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।"
কালাম সাহেবের জীবনের শেষ কিছু কথা
বক্তৃতাসভায় পৌঁছে তিনি সবার আগে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কোনওভাবে দেরি করে ফেলেননি তো? তারপর সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, "ছাত্রদের কখনও অপেক্ষা করিয়ে রাখা উচিত নয়।" সৃজনপাল যখন কালাম সাহেবের জন্য মাইক সেট করছিলেন, সেই সময় হাসতে হাসতে কালাম সাহেব জিজ্ঞেস করেন, "তুমি ঠিক আছ তো?" এটাই ছিল কালাম সাহেবের জীবনের শেষ কিছু কথা। বক্তৃতা আর মাত্র দু'মিনিট বাকি ছিল। কালাম সাহেবের ঠিক পিছনে বসেছিলেন সৃজনপাল। কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটে যায় অঘটন। হয় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। একটা দীর্ঘ নীরবতার পরেই হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কালাম সাহেব।
কিছুক্ষণ খোলা ছিল চোখ
সৃজনপাল বলছেন, "আমরা ওঁকে উঠিয়ে বসানোর চেষ্টা করলাম। যতক্ষণ না ডাক্তাররা এলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা যা করতে পারতাম, সব চেষ্টা করলাম। আমি আমার জীবনে কখনও ওঁর ওই চোখটা ভুলতে পারব না। একটা হাত দিয়ে ওঁর মাথাটাকে ধরে আমি যতটা সম্ভব চেষ্টা করলাম ওঁর জ্ঞান ফেরানোর। ওঁর মুখটা পুরোপুরি স্থির হয়ে গিয়েছিল। উনি একটা শব্দও বললেন না। আর না দেখা গেল কোনও কষ্টের ছাপ। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমরা কালাম সাহেবকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু ততক্ষণে মহাকাশে কোথাও একটা বিলীন হয়ে গিয়েছেন মিসাইল ম্যান।"
















