চিকিৎসাও করেছেন, বন্দুকও ধরেছেন! নেতাজির এই শিষ্যা আজও অনুপ্রেরণা
সাল ১৯৪৫। জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজ বার্মা রওনা দিলেও মার্চ ১৯৪৫-এ তারা পিছু হটে। ১৯৪৫ সালের মে মাসে লক্ষ্মী সেহগলকে ব্রিটিশ সেনা গ্রেফতার করে এবং ১৯৪৬ সালের মার্চ মাস অবধি তাকে বার্মার জেলে আটকে রাখা হয়।

স্বাধীনতা কেউ দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এমন অনেক অসংখ্য নায়কের জন্ম দিয়েছে, যাঁরা ব্রিটিশদের বিতাড়িত করে ভারতকে তার নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে উৎসাহিত ও অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। যেখানে মহাত্মা গান্ধী বা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতা ও যোদ্ধা ছিলেন, যাঁদের সবাই চেনেন, তেমন আরও অনেক সাহসী মানুষ ছিলেন, যাঁরা তাঁদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন ভারতকে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্ত করতে। ডাক্তার লক্ষ্মী সেহগল তাদের মধ্যে অন্যতম।
কী এই ঝাঁসির রানি রেজিমেন্ট?
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আত্মবলিদানের অনুপ্রেরণায় শত শত মহিলা সেদিন নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে এগিয়ে এসেছিলেন ভারতকে স্বাধীন করতে। যাঁদের নিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু গড়ে তুলেছিলেন, ‘ঝাঁসির রানি রেজিমেন্ট’। নেতাজির স্বপ্নের আজাদ হিন্দ ফৌজে শামিল হয়ে এই মহিলারাই হয়ে উঠেছিল দুর্ভেদ্য পাঁচিলের মতো।
মহিলারা যে কেবল ঘরই নয়, একটা গোটা দেশকেও বেঁধে ফেলতে পারে, তা নেতাজি বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার অনেক আগেই। যে সময়, ভারতে ব্রিটিশদের দৌরাত্ম্য মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল সেই সময় দেশমাতৃকাকে উদ্ধার করতে মেয়েরাও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, তা উপলব্ধি করেন নেতাজি। তাই সিঙ্গাপুর থেকে সশস্ত্র অভিযান চলাকালীন এই উপলব্ধিকে বাস্তবে রূপ দেন। ১৯৪৩ সালে গড়ে তোলেন একটি মহিলা ব্রিগেড, নাম ঝাঁসির রানি রেজিমেন্ট। এখানে উল্লেখ্য, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের সময় ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁকে স্মরণ করেই এই বাহিনীর নাম রাখেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বীরাঙ্গনা লক্ষ্মী সেহগল
সালটা ১৯১৪, ২৪ অক্টোবর। মাদ্রাজের (চেন্নাই) বুকে জন্ম নেন এক বীরাঙ্গনা নারী লক্ষ্মী সেহগল। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ১৯৩৮ সালে মাদ্রাজ থেকে এম.বি.বি.এস. ডিগ্রি নেন। ১৯৩৯-এ গাইনোকোলজি বিভাগে ডিপ্লোমাও অর্জন করেন। এরপর চেন্নাইয়ের এক সরকারি হাসপাতালে তাঁর ডাক্তারি কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু স্বাধীনচেতা এই নারী সাবালিকা অবস্থা থেকেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নিজের চোখের সামনে দেখেছে। দেখেছে, কীভাবে ব্রিটিশদের অত্যাচারে শহিদ হচ্ছে একের পর এক মানুষ। সেই সময় থেকেই তাঁর মনের মধ্যে দেশসেবার বীজ বপন হয়ে যায়।
১৯৪০ সালে সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন নেতাজির ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি দরিদ্র, বিশেষত অবিভক্ত ভারত থেকে অভিবাসিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে একটি ক্লিনিক স্থাপন করেন। ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দেশ থেকে বিতাড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। উদ্বাস্তু শিবির পরিচালনা সহ কলকাতায় বাংলাদেশি শরনার্থীদের চিকিৎসা, সবেতেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
সুভাষচন্দ্র বসু ২ জুলাই, ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুর যান। সেখানে তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নারী রেজিমেন্ট গঠনের কথা উল্লেখ করেন, যাতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীরা অংশগ্রহণ করবে। এই নারীবাহিনীই পরবর্তীকালে ইতিহাস বিখ্যাত ঝাঁসির রানি বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। প্রাণশক্তিতে চঞ্চল, সাহসিকতায় উজ্জ্বল, দেশপ্রেমে ভরপুর লক্ষ্মী নেতাজির বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবার আগে শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। সুভাষচন্দ্র বসু লক্ষ্মীর মধ্যে দেখতে পেলেন তাঁর ক্যাপ্টেনকে, লক্ষ্মী খুঁজে পেলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরুকে।

লক্ষ্মী সেহগল
'বর্তমান' পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লক্ষ্মী সেহগল বলেছিলেন, "শুধুমাত্র মেয়েদের নিয়ে এক আস্ত রেজিমেন্ট গড়ার কথা এর আগে কেউ কল্পনা করেনি। তাদের কমব্যাট ট্রেনিং দেওয়া তো দূর অস্ত। কিন্তু নেতাজি এই স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তাকে বাস্তবেও রূপ দেন। আর আমার (লক্ষ্মী) নামের গুরুত্ব যে কতখানি, তা ওঁর সান্নিধ্যে না এলে জানতেই পারতাম না।"
নেতাজি লক্ষ্মীর কাজের প্রচেষ্টায় খুশি হয়েছিলেন। পরে ডাক্তারির চাকরি ছেড়ে লক্ষ্মী ঝাঁপিয়ে পড়লেন দেশোদ্ধারের কাজে, আইএনএ-র (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি) মহিলা বাহিনী গড়তে। তিনদিনের মধ্যে লক্ষ্মী একটি ২০ জন তরুণীর ইউনিট তৈরি করে রাইফেল নিয়ে একটি সভায় সুভাষচন্দ্রকে ‘গার্ড অফ অনার’ দিলেন। মেয়েরা সাদা শাড়ি ইউনিফর্ম করে পরেছিল সেদিন। গোটা ব্যাপারটা আইএনএ-র সকলের যে খুব ভালো লেগেছিল, তা নয়। প্রথম দিকে নারীবাহিনীর ভাবনা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিল জাপানিরা। এদের প্রশিক্ষণের জন্য অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিতে অস্বীকার করেছিল জাপান। ভেবেছিল, অর্থের অপচয় করা হবে। কিন্তু সিঙ্গাপুরের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের প্রধান আট্টাবর ইয়েলাপ্পা জাপানি আপত্তির বাধা টপকে, ঝাঁসির রানি বাহিনীর জন্য বারাক ও অস্ত্র জোগাড় করেছিলেন।
সুভাষচন্দ্র বসু ও লক্ষ্মী স্বামীনাথনের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় মালয় (মালেশিয়া) ও বর্মার (মায়ানমার) প্রায় হাজারখানেক তরুণী যোগ দিয়েছিল এই বাহিনীতে। এছাড়াও দুশো জন যোগ দিয়েছিল সেবিকার কাজে। শারীরিকভাবে দুর্বল, এমন মেয়েদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রান্নাবান্না ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের। ঝাঁসির রানি বাহিনীর কমান্ডার বা সর্বাধিনায়িকা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের জন্য জোগাড় করা হয়েছিল মিলিটারি ইউনিফর্ম, শুরু হয়েছিল কঠোর ট্রেনিং। ঝাঁসির রানি বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ মহিলা-পরিচালিত সৈন্যবাহিনী। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে গঠিত এই বাহিনীর জন্মলগ্নে সুভাষচন্দ্র ঘোষণা করেছিলেন, মেয়েদের সংগ্রাম শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে নয়, এই সংগ্রাম সর্বপ্রকার অসাম্য, শোষণ এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে, নারী-পুরুষের সমান অধিকার, এই সত্য প্রমাণ করার জন্য।
সাল ১৯৪৫। জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজ বার্মা রওনা দিলেও মার্চ ১৯৪৫-এ তারা পিছু হটে। ১৯৪৫ সালের মে মাসে লক্ষ্মী সেহগলকে ব্রিটিশ সেনা গ্রেফতার করে এবং ১৯৪৬ সালের মার্চ মাস অবধি তাকে বার্মার জেলে আটকে রাখা হয়। দিল্লিতে আইএনএ সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি অবিভক্ত ভারতে ফিরে আসেন। ১৯৪৭ সালে তাঁর স্বপ্ন সফল হয়৷ স্বাধীন হয় ভারত। সেই বছরেই লাহোরে কর্নেল প্রেম সেহগলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিয়ের পরেও কিন্তু সেবার কাজ থামাননি তিনি৷ কানপুরে গড়ে তোলেন দাতব্য চিকিৎসালয়।
রাজনীতিতেও লক্ষ্মী সেহগলের সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ করা যায়। রাজনীতি বলতেই আমরা বুঝি পিতৃতান্ত্রিক দাপট। সেই রাজনীতিতেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৭১-এ রাজ্যসভার প্রতিনিধিত্ব, ১৯৮৪ সালে ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব, তাঁর সঙ্গে শিখ-বিরোধী দাঙ্গায় শান্তি বজায় রাখার বার্তায় তাঁর অবদান অসামান্য। ২০০২ সালে চারটি বামপন্থী দল– বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক, সিপিআই, সিপিআই(এমএল) লক্ষ্মী সেহগলকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনিত করে। যদিও তিনি এ.পি.জে. আবদুল কালামের কাছে পরাজিত হন। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগল হৃদযন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হন। চারদিন হাসপাতালে কাটানোর পর প্রয়াণ ঘটে এই মহীয়সী নারীর।
তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের নেত্রী, যিনি তথাকথিত প্রথা ভেঙে পুরুষশাসিত বিপ্লবী সেনাবাহিনীর জগতে প্রবেশ করেছিলেন, যা ভারত থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে একটি মহান ভূমিকা পালন করে।
















