মমতার মঞ্চে ‘গেরুয়া’ স্তুতি, যে বিতর্ক উস্কে দিল অরিজিৎ সিং-এর গান
Arijit Singh : মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধে কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মঞ্চে অরিজিতের গোটা ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’ গান নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে

২৮তম আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে। গত বৃহস্পতিবার নেতাজি ইনডোরে এই উৎসবের সূচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন অনুষ্ঠানে ছিল চাঁদের হাট। অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, রানী মুখার্জি, সৌরভ গাঙ্গুলি থেকে শুরু করে টলিউড ইন্ডাস্ট্রির নামজাদা তারকারা উপস্থিত ছিলেন মঞ্চে। উপস্থিত ছিলেন সংগীত জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও। বাবুল সুপ্রিয়, কুমার শানু, ইন্দ্রনীল সেন প্রমুখরা তো ছিলেনই তার সঙ্গে এদিনের বাড়তি সংযোজন ছিল অনুষ্ঠানের মঞ্চে অরিজিৎ সিং-এর উপস্থিতি।
অরিজিৎ সিং নামটা বর্তমানে কেবল আর একজন সংগীত ব্যক্তিত্বে আটকে নেই। সেটি ক্রমশই হয়ে উঠেছে একটা ব্র্যান্ড। উন্নইতির শিখরে থেকেও যে সাধারণ জীবন যাপন করা যায়, এমন একটা ছবি বারবার সামনে এসেছে তাঁর সাপেক্ষে। নেট মাধ্যমে সেগুলি প্রতিবারই প্রশংসা কুড়িয়েছে। মানুষও এখন তাঁকে ছাপোষা একজন হিসেবে দেখতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। এদিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তার অন্যথা হয়নি। একেবারেই সাদামাটা পোশাকে মঞ্চে উপস্থিত হন অরিজিৎ সিং। তার উপস্থিতিতে হাততালিতে ফেটে পড়ে দর্শক আসন। অভিনেত্রী জুন মালিয়া বরণ করে নেন অরিজিৎকে। এরপর বাংলা ছবি নিয়ে ইতিবাচক বক্তব্যও রাখেন অরিজিৎ।
মঞ্চে তখন উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দর্শকের উচ্ছ্বাস আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিতে তিনিই অরিজিৎকে অনুরোধ করেন গান গাওয়ার জন্য। যার উত্তরে ছাপোষা অরিজিৎ কোনও ভনিতা না করেই বলেন, “একটা গান গেয়ে দিই, তাহলে ল্যাটা চুকে যাবে”। কিন্তু ল্যাটা যে আদেও এভাবে চোকার নয়, সেটা তখনও কেউই বুঝতে পারেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Amitabh Bachchan on KIFF 2022: 'বচ্চন-সাব' বলেন, "প্রশ্ন ওঠে মানুষের স্বাধীনতায় বাধা নিয়ে, প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও আওয়াজ ওঠা প্রয়োজন!"
প্রথম গানটি করেন রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত ‘বোঝে না সে বোঝে না’ ছবি থেকে। এ ছবির টাইটেল ট্রাকটি গাওয়ার পরই তিনি চলে যান দ্বিতীয় গানে। মঞ্চে কিং খানকে দেখে তাঁর ছবির বিখ্যাত গানটি ধরেন। আসল চমকটা হয় এখানেই। মমতা ব্যানার্জির কুক্ষিগত একটা মঞ্চে দাঁড়িয়ে অরিজিৎ কিনা গাইলেন ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’... তাও আবার খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সামনেই।
ব্যাস আর রক্ষে নেই, মুহূর্তে গানের সঙ্গে মিলেমিশে যায় সমাজের রং নিয়ে চর্চিত রাজনীতিও। ভিডিও শেয়ার হতেই শুরু হয় উত্তেজনা। মমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে গেরুয়া রঙের প্রতি এই আহ্বান নিয়ে শুরু হয়ে যায় কাটা ছেঁড়াও। মুখ্যমন্ত্রীর সামনে ‘গেরুয়া’ স্তুতি করায়, তা নিয়ে নানান মিম ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এদিনের এই ভিডিও শেয়ার করে টুইটে লেখেন, ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অরিজিত সিংকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’ গানটি বেছে নেন। পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ হল গেরুয়া।’
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Indian sant : সাধুদের পোশাকের এহেন রং কেবল একটা মিথ নয়, নয় বেড়ানো অভ্যাসও নয়। এটির নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞান
নেটপাড়ায় বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অরিজিৎ কি এই গানের মাধ্যমে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে কোনও ইঙ্গিত দিতে চাইলেন, এমন কথাও বলেছেন অনেকেই। অনেকেই আবার একে ভবিষ্যতবাণী হিসেবে মানতে নারাজ। তাঁরা বলেছেন, কেবল মঞ্চে উপস্থিত শারুখ খানকে সম্মান জানিয়ে এই গানকে নিয়ে রাজনীতির রং চড়ানো একেবারেই কাম্য নয়।
দিন দিন এমন একটা সমাজে পর্যবসিত হয়েছি আমরা যেখানে শিল্পের পরিচয় খুঁজতে গিয়েও রাজনীতি এসে ঘা মারে। কোনওরকম ফিকির খুঁজে পেলেই ঢুকে পড়ে কূটনীতি। যে শব্দই এতদিন ব্রহ্ম বলে জানত মানুষ সেই শব্দও এখন পার্টির সম্পত্তি। দলবাজির এই রাজনীতি হয়ে ক্রমেই বিঁধছে সংস্কৃতিকে তা কি ঠাহর করা এতটাই অসম্ভব এখনও? না হলে একটা গান কেনই বা মুহূর্তের মধ্যে তার শিল্পের মাধ্যম থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক ইঙ্গিত হয়ে দাঁড়ায় সমাজের চোখে! আর কেনোই বা খোদ নন্দনে জায়গা হয় না সত্যজিতের বায়োগ্রাফির! প্রশ্নগুলো রয়েছে। আগেও ছিল। কেবল মুহূর্তের ঘটনা তাকে খানিক উস্কে দিল বই আর কিছুই না।
সম্প্রতি এই গেরুয়া রং নিয়েই বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছিলেন দীপিকা পাডুকন। সেখানেও উপস্থিত শাহরুখ খান। শাহরুখ খান ও দীপিকা পাডুকোন অভিনীত আগামী ছবি 'পাঠান' ছবির গান প্রকাশ্যে আসতেই শুরু এ বিতর্ক। বিকিনি মতো একটা পোশাকের রং গেরুয়া হওয়া নাকি অপরাধের এমন দাবিও তোলা হয়। পুরাণের প্রসঙ্গ টেনে এই রংকে সন্ন্যাস ধর্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়। উপরন্তু তাতে যোগ হয় গেরুয়া রঙের রাজনীতিও। রঙ কীভাবে কুক্ষিগত হয়ে যায় এ যেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। দীপিকার পোশাক ঘিরে শুরু হওয়া হৈচৈ-কে যেন আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিল অরিজিৎ সিং-এর গানের ঘটনাটি।
এ কোন সময়ে দাঁড়িয়ে গোটা সমাজ? যেখানে শিল্প থেকে শুরু করে পোশাক সবেতেই লেপে দেওয়া হয় রাজনীতি থুড়ি কূটনীতির দাগ? রঙের গেরোয় কেন আটকা পড়তে হয় এভাবে? ক্রমাগত চল এই বিতর্কের মধ্যেই অরিজিৎ সিং যেন ধরা দিলেন প্রকৃত এক শিল্পীর মতোই। যে যতোই বলুক এ গান নিছক শাহরুখ খানের উদ্দশ্যে, কিংবা বিজেপি রাজ্য সভাপতি যতোই এ ঘটনাকে দেগে দিক রাজ্যের ভবিষ্যতবাণী হিসেবে, কিছুই যায় আসে না তাতে শিল্পী অরিজিৎ-এর। তাঁর আর পাঁচটা গানের মতো এ গানটিও যে সন্তানসম। রঙের নীতি দিয়ে তাকে যে বেঁধে ফেকা এতো সহজ নয় সেটাই গেঁথে দিলেন তিনি মঞ্চে। প্রতিবাদের রূপ তো এমনও হয়!
















