মমতার পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রীকেই নিশানা! অমিতাভ বচ্চনের যে মন্তব্যে তোলপাড় বাংলা...
Amitabh Bachchan on KIFF 2022: 'বচ্চন-সাব' বলেন, "প্রশ্ন ওঠে মানুষের স্বাধীনতায় বাধা নিয়ে, প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও আওয়াজ ওঠা প্রয়োজন!"

বছর ঘুরলেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। আর এখন থেকেই শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে আশঙ্কার আবহ। কোথাও বোমা বিস্ফোরণ, কোথাও আবার শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে খুন! কোথাও কোথাও বিরোধীদের উপর অত্যাচারের নানান অভিযোগ। আর এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ২০২১-র বিধানসভা নির্বাচন এবং ভোটপরবর্তী হিংসার বিস্ফোরক-আবহের মধ্যেই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির বিতর্ক-চিতায় অগ্নিসংযোগ ঘটালেন অমিতাভ বচ্চন! আগুন জ্বালাল তাঁর একটি বক্তব্য! বৃহস্পতিবার কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন মঞ্চে দীর্ঘ অমিত-বচনের একটি অংশ ঘিরেই তৈরি হয়েছে এই বিতর্ক, শুরু হয়েছে রাজনৈতিক টানাপড়েনও।
বাংলার 'জামাইবাবু'র কথার সূত্রেই ফের বিদ্ধ হয়েছেন বাংলার দিদি! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার মন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বৃহস্পতিবার অমিতাভের দীর্ঘ বক্তৃতায় বলা কয়েকটি শব্দ! এদিন চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধন-মঞ্চে বর্ষীয়ান এই অভিনেতা কথা প্রসঙ্গে বলেন, "প্রশ্ন উঠছে মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে। আওয়াজ ওঠা প্রয়োজন প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও।" এখানেই বেঁধেছে গোল! অমিতাভ-মন্তব্যের এই অংশকে ধরে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গতিতে সরব হয়েছে রাজ্য বিজেপি (BJP)। সমালোচনায় মুখর হয়েছেন রাজ্যের, কেন্দ্রের বিজেপি নেতারা। গেরুয়া-শিবিরের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক অমিত মালব্য থেকে শুরু করে বিজেপির বঙ্গ সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, অনেকেই দেশের অন্যতম বিষিষ্ট অভিনেতা অমিতাভকে ঢাল করে নেমেছেন রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণে!
কী বললেন বিগ বি? ২৮ তম চলচ্চিত্র উৎসবের (Kolkata International Film Festival) উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছিল বৃহস্পতিবার। তার জন্য কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে ছিল বিরাট আয়োজন। এদিন দুপুরে মুম্বইয়ের কালিম বিমানবন্দর থেকে বিশেষ বিমানে, স্ত্রী জয়া বচ্চনকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা পৌঁছন অমিতাভ বচ্চন। অভিনেতা শাহরুখ খান, রানি মুখোপাধ্যায়, মহেশ ভাটদের সঙ্গেই নেতাজি ইনডোরে বিকেলের ওই অনুষ্ঠানে হাজির হন 'শাহেনশাহ'। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং সম্বর্ধনা পর্বের পরেই একে একে বলতে ওঠেন অতিথিরা। রাজ্যের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস, জয়া বচ্চন, শত্রুঘ্ন সিনহা, রানি মুখোপাধ্যায়, অরিজিৎ সিং এবং শাহরুখ খান বলার পরে নিজের বক্তব্য শুরু করেন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল উদ্বোধক অমিতাভ বচ্চন। ৮০ বছরের অভিনেতা যে আঁটঘাট বেঁধেই বক্তব্য পেশ করবেন, এমন ইঙ্গিত আগেই দিয়ে রেখেছিলেন জয়া।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Panchayat Elections 2023: স্থান-কাল-পাত্র বুঝে মেপে পা ফেলতে হচ্ছে তৃণমূলকে। ২০১৮-র মতো ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসা যাতে সর্বাত্মক আকার ধারণ না করে, তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
প্রথমেই বলিউডের 'বড়দা' বলতে শুরু করেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস-দর্শনের কথা। তিনি বলেন, "দেশে স্বাধীনতার আগে থেকেই সিনেমার বিবর্তন ঘটেছে বারবার। একের পর ক্ষেত্রে এসেছে প্রতিবন্ধকতা। ব্রিটিশ শাসন, অত্যাচার আর পরাধীনতার মধ্যেও সমাজের কথা, মানুষের কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলচ্চিত্র।" অভিনেতা বলেন, "প্রকাশের অন্যতম এই মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষাও। মানুষের সঙ্গে, মানুষের জন্য, তাদের মনের কথার প্রকাশ হয়ে উঠেছে সিনেমা। নির্মাতারা বহু বাধার সম্মুখীন হলেও এগিয়ে গিয়েছেন বারবার। যে রেশ থেকেছে স্বাধীনতার পরেও।" এর সঙ্গেই বিগ বি বলেন, "স্প্যানিশ ফ্লু থেকে শুরু করে করোনা মহামারী, সমস্যায় পড়েছে শিল্প, শিল্পী এবং চলচ্চিত্র জগৎ। কিন্তু পেরিয়ে গিয়েছে সবটা।" বাংলার পরিচালক সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটকের প্রসঙ্গ টেনে অমিতাভের বক্তব্য, "সিনেমার বিবর্তনে অন্যতম ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ রায়। দেশভাগ, মানুষের কথা বলতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন ঋত্বিক ঘটকও।" অভিনেতা আরও বলেন, "কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, প্রাণ ভরিয়ে-তৃষা হরিয়ে-মোরে আরও আরও দাও প্রাণ। সিনেমা-ও প্রাণ পাক। এগিয়ে যাক।" এর সঙ্গেই 'বচ্চন-সাব' বলেন, "প্রশ্ন ওঠে মানুষের স্বাধীনতায় বাধা নিয়ে, প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও আওয়াজ ওঠা প্রয়োজন!"
মুম্বইয়ের বাসিন্দার সিনেমা-ইতিহাস ব্যাখ্যার মধ্যেই নজর কাড়ে স্বাধীনতা-সংক্রান্ত মন্তব্য। অমিতাভের দাবি, প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। আর বিনা রাজনীতিতে এক ইঞ্চি জমি না ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে তেড়েফুঁড়ে আসরে নেমেছেন বিজেপির নেতারা। তাঁদের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এই রাজ্য সরকারের ভূমিকার কথা বলে দিয়েছেন অমিতাভ, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতাকে লজ্জায় ফেলেছেন অভিনেতা।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের দাবি, "অমিতাভ বচ্চন মহাশয়ের সঙ্গে আমি একমত। পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক সুরক্ষা এবং বাক-স্বাধীনতাই শুধু খর্ব হয় না, এখানে প্রকাশ্যে গণতন্ত্রের হত্যা হয়। এর প্রমাণ ২০১৮ পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০২১-র ভোট পরবর্তী হিংসা।"
অমিতাভের এই বক্তব্য তুলে ধরে বিজেপি নেতা অমিত মালব্য লিখেছেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একই মঞ্চে অমিতাভ বচ্চনের কথা ভবিষ্যদ্বাণী! এটি অত্যাচারী শাসকের কাছে একটি আয়না ধরার মতো। ভারত, এই রাজ্যেই সর্বাধিক ভোটপরবর্তী রক্তক্ষয়ী হিংসার ঘটনার সাক্ষী ছিল। মমতা বাংলার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন।" বিজেপি নেতা বি এল সন্তোষ লিখেছেন, "ধন্যবাদ অমিতাভ বচ্চনকে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Amitabh Bachchan Rajiv Gandhi Relation: রাজীব গান্ধী সেই সময়ে আমেরিকায় পাইলটের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। রাজীব নিয়ম করে দু’টি চিঠি লিখতেন। একটি বাড়ির জন্য, আরেকটি অমিতাভের জন্য।
বিজেপি বলছে অমিতাভ-বচনে আসলে বেকায়দায় পড়েছে রাজ্য সরকার। মমতার পাশে দাঁড়িয়ে অভিনেতা অস্বস্তিতে ফেলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই! কিন্তু আদৌ কি তাই? রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, অমিতাভ বচ্চনের দীর্ঘ ওই বক্তব্যজুড়ে ছিল ভারতের সিনেমা-ইতিহাসের কথা। পাতার পর পাতা জুড়ে তিনি দেশিয় সিনেমার বাধা জয়ের কথা, বিবর্তনের কথা শুনিয়েছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে সিনেমা তৈরির একাধিক সমস্যা, প্রতিবন্ধকতা এবং প্রশ্নের কথাও উঠে এসেছে বারবার। দাবি, এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলতে গিয়েই তিনি সিনেমার মুক্তির কথা, বেড়াজাল ছিন্ন করার কথা বলেছেন। এখানে রাজনীতি বা বাংলার কোনও বিষয়ে ঘুণাক্ষরেও কিছু বলেননি অভিনেতা!

তৃণমূলের দাবি, ''অযথা বাড়াবাড়ি করা বিজেপি নেতাদের স্বভাব। সুন্দর একটি অনুষ্ঠান, মানুষের সামনে বাংলার গর্বের মুহূর্ত সহ্য হচ্ছে না তাঁদের। এই গাত্রদাহ থেকেই এসব করছেন ওঁরা।" শাসকদলের নেতাদের আরও দাবি, "আসলে অমিতাভ বচ্চন কেন্দ্রের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সেই ইস্যুই ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি।"
অমিতাভ-বক্তব্য বিতর্কে ফের উঠে এসেছে ভোটপরবর্তী হিংসার পরিসংখ্যান। প্রায় ২০০ দলীয় কর্মীর মৃত্যু, কয়েক হাজার বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। বিরোধীদল করার অপরাধে গ্রামছাড়া হয়েছেন লক্ষাধিক, অভিযোগ করেছে বিজেপি। আদালতে গড়িয়েছে মামলা। বারবার সরব হয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। প্রশ্ন উঠেছে রাজ্য সরকার এবং পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছেন মমতাও। ঠিক এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে অমিতাভ বচ্চনকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক, আবারও তুলে এনেছে ভোটপরবর্তী হিংসার আবহ।
২০১৮ সাল। ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে ২১১ আসনে জেতার পরেও পঞ্চায়েত নির্বাচনকে ঘিরে ছড়ায় অশান্তি। রক্তাক্ত হয় নির্বাচন। অভিযোগ ওঠে শাসক-সন্ত্রাসের। ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের প্রায় ২০ হাজার আসনে যেতে তৃণমূল কংগ্রেস। ৩৪ শতাংশ আসনে জয় আসে নির্বাচনে না লড়াই করেই। অনুব্রত মণ্ডলের বীরভূম থেকে শুরু করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, একাধিক জেলায় ওঠে একই অভিযোগ। মামলা গড়ায় আদালতে। এই অবস্থার প্রভাব দেখা যায় পরের বছরের লোকসভা নির্বাচনে। ৪২ আসনের মধ্যে আকস্মিকভাবে ১৮ আসনে জয় পায় বিজেপি।
২০১৯-র লোকসভা নির্বাচন ছাড়িয়ে ২০২১-র বিধানসভা নির্বাচন ঘিরেও শুরু হয় অশান্তি। প্রচার থেকে নির্বাচনের দিন, তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠে একের পর এক অভিযোগ। গোষ্ঠীকোন্দলে বিপর্যস্ত হয় সবুজ শিবিরও। ফের জয়ী হয় তৃণমূল। কিন্তু ভোটপরবর্তী সন্ত্রাসের অভিযোগে বিড়ম্বনা বাড়ে তৃণমূলের। খুন, ধর্ষণ থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ঘরছাড়া করা; ওঠে একাধিক অভিযোগ।
পঞ্চায়েত নির্বাচন (Panchayat Election) আসন্ন। বছর ঘুরলেই নির্বাচনের দামামা বাজবে। রাজ্যে। ঠিক এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে দিকে দিকে শাসকদলের গোষ্ঠীকোন্দলের অভিযোগ থেকে শুরু করে খুন-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও। এর মধ্যেই অমিতাভ বচ্চনকে ঘিরে এই বিতর্কে ফের মাথাচাড়া দিয়েছে সন্ত্রাস-অভিযোগের আগুন।
















