পথের মাঝে বাড়ি, দু'ভাগ হয়ে গেল বাসরাস্তা! কলকাতার এই অঞ্চলে ইতিহাস কথা বলে

কলকাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া বহু জিনিস আজও বাগবাজারে পাওয়া যায়। কলকাতার বহু প্রান্তে যেখানে ঠাকুরদালান এবং বড় থামওয়ালা বাড়িগুলো ভাঙা পড়ছে, সেখানে বাগবাজারে এই ধরনের বাড়িগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
পথের মাঝে বাড়ি, দু'ভাগ হয়ে গেল বাসরাস্তা! কলকাতার এই অঞ্চলে ইতিহাস কথা বলে

উত্তর কলকাতার বিভিন্ন এলাকা কলকাতার মানুষের নস্টালজিয়া উস্কে দেয়। বাগবাজার তার ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বর্তমানে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে তার জুড়ি মেলা ভার। তার নাম থেকে শুরু করে তার অলিগলিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র গল্প।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কলকাতায় তাঁর নামে রয়েছে রাস্তা, 'হরি ঘোষের গোয়াল' প্রবাদের আড়ালে আসলে কে?

শুদ্ধ বাংলা বলা এবং বাংলার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অবহেলার কারণে এই প্রবাদগুলো এবং তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকা অসংখ্য গল্প আমরা ভুলতে বসেছি। প্রবাদ এবং তাদের সঙ্গে জড়িত গল্পগুলো শুধুই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে।

কথিত আছে যে, ১৭৫২ সালে পেরিন সাহেব বাগবাজার এলাকায় এক বিশাল ফুলের বাগান তৈরি করেছিলেন। সেই বাগানে ইংরেজরা বিকেলবেলায় হাঁটতে যেতেন। এই বাগান এবং আশপাশের এলাকা সাধারণ মানুষের কাছে 'পেরিনস গার্ডেন' নামে পরিচিত ছিল। ১৭৫৪ সালের পর ইংরেজরা এই পেরিনস গার্ডেনে বারুদ তৈরির কারখানা তৈরি করেছিল। বারুদের কারখানা থাকার কারণে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এই এলাকা বারুদখানা নামে পরিচিতি পেয়েছিল। পরবর্তীকালে পেরিন সাহেবের সেই বাগান অথবা 'বাগ' এবং নিকটবর্তী এলাকার 'বাজার' থেকেই এলাকার নাম হয়ে যায় বাগবাজার। বর্তমান বাগবাজার ঘাটের তখনও নাম ছিল রঘু মিত্রের ঘাট। এই রঘুনাথ মিত্র ছিলেন কলকাতার প্রথম কালো জমিদার গোবিন্দরাম মিত্রর ছেলে। বাগবাজারের পরিচিত বিচালি ঘাটের সাথে জড়িয়ে রয়েছে পুজোর গল্প। প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে দরকারি বিচালি নৌকা বোঝাই করে কুমারটুলির খুব কাছেই এই ঘাটে নিয়ে আসা হতো। সেই থেকেই এই ঘাটের নাম বিচালি ঘাট।

বাগবাজারের বিভিন্ন মন্দিরের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কিন্তু ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া মন্দির তৈরি করেছিলেন জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র। ১৭৩০-'৩১ সালে ১৬৫ ফুট উচ্চতার এই কালী মন্দির তৈরি হয়, যার চূড়া ব্রিটিশদের তৈরী অক্টারলোনি মনুমেন্টৈর থেকে উচু ছিল। ইংরেজদের কাছে এই মন্দির ব্ল্যাক প্যাগোডা নামে পরিচিত ছিল। বেশিরভাগ নথি এই মন্দিরকে নবরত্ন মন্দির বলেই দাবি করলেও বেশ কিছু নথি এবং হাতে আঁকা ছবিতে এই মন্দিরের পাঁচটা চূড়া দেখা যায়। ১৭৩৭ সালে কলকাতায় একই দিনে ঘূর্ণিঝড় এবং ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ঘূর্ণিঝড় এবং ভূমিকম্পের ফলে মন্দিরের বেশিরভাগ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে মন্দিরের অক্ষত অংশে পুনরায় পুজো শুরু হয়। আজও চিৎপুর রোডে কুমারটুলি এলাকায় এই মন্দিরের অংশ দেখা যায়। ১৭৬১ সালে গোকুলচন্দ্র মিত্র রাধা মদনমোহন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চিৎপুর রোডে কুমারটুলি এলাকায় প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই মন্দিরের বিশালাকার ঠাকুরদালান আজও মানুষকে বিস্মিত করে। বাগবাজারের একটি ঘাটের নাম মায়ের ঘাট। সারদা মায়ের স্মৃতিবিজড়িত মায়ের বাড়িতে বর্তমানে প্রচুর ভক্তসমাগম হয়। মায়ের বাড়ির নিকটবর্তী বাগবাজারে গঙ্গার একটি ঘাটের নাম মায়ের ঘাট হওয়ার সঙ্গে মা সারদার নাম জড়িয়ে রয়েছে।

বাংলায় সমাজসংস্কার এবং নবজাগরণের বহু অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছিল বাগবাজারে। নগেন্দ্রনাথ বসু কুড়ি বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে 'বিশ্বকোষ' নামে প্রথম বাংলা অভিধান সম্পাদনা করেছিলেন। তার পরিশ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টায় তার বাড়ির পাশের রাস্তার নাম হয় বিশ্বকোষ লেন। বইয়ের নামে সম্ভবত সমগ্র বাংলায় এই একটি রাস্তাই রয়েছে। বিখ্যাত নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের বাড়ি আজও বাগবাজারে গেলেই দেখতে পাওয়া যায়। এই বাড়ির বৈশিষ্ট্য হলো যে, বাড়িটি বাস চলাচলের রাস্তার মাঝে অবস্থিত। বাড়ি তৈরির সময় এই এলাকায় বাস চলাচলের রাস্তা না থাকলেও পরবর্তীকালে রাস্তা তৈরির সময়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষের সন্মানে বাড়িটি অক্ষত রেখে দুই দিক দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়। কুকমির মশলার কথা আমরা জানলেও খুব কম মানুষই এটা জানেন যে, কুকমির প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত বাগবাজারে থাকতেন এবং সেখানেই তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বাগবাজারের ব্যবসায়ী বললে গৌরমোহন দত্তের নাম আসতে বাধ্য। সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই গৌরমোহন দত্তের নামটার সঙ্গে পরিচিত না হলেও ১৯২৯ সালে তার তৈরি সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিমের নামটা নিশ্চয় বলতে পারবেন। বাগবাজার বলরাম মন্দিরের কাছে বোরোলিন হাউস আজও স্বাধীনতার পূর্বের বাংলার গল্প বলতে পারে। বাঙালিকে রসগোল্লার সঙ্গে পরিচয় করানো নবীনচন্দ্র দাসের দোকান বাগবাজারে আজও রয়েছে। বাগবাজারের ভগিনী নিবেদিতার বাড়িতে দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক আসেন। বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজো কলকাতার অন্যতম পুরনো বারোইয়ারি পুজো। এই পুজোর সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম জড়িয়ে আছে।

কলকাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া বহু জিনিস আজও বাগবাজারে পাওয়া যায়। কলকাতার বহু প্রান্তে যেখানে ঠাকুরদালান এবং বড় থামওয়ালা বাড়িগুলো ভাঙা পড়ছে, সেখানে বাগবাজারে এই ধরনের বাড়িগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে। 'বাইশে শ্রাবণ' সিনেমায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত প্রবীরবাবুর বাড়ি আসলে বাগবাজারের বসুবাটী। শুধু পুরনো বাড়ি নয়, বাগবাজারে পাওয়া কিছু খাবার কলকাতার বেশিরভাগ অঞ্চলে বর্তমানে পাওয়া যায় না। বাগবাজারের বিখ্যাত ফাউল কাটলেট থেকে মাছের কচুরির সঙ্গে আলুর দম, লালমোহনের মতো মিষ্টি তার মধ্যে খুব অল্প কয়েকটা নাম। একদিকে যেমন হালফিলের খাবারের দোকান, অন্যদিকে সেই পুরনো ধাঁচের খাবারের দোকান। একদিকে নতুন ঝাঁ-চকচকে বাড়ি, অন্যদিকে ইতিহাসের গল্প বলা বনেদি বাড়ি। একদিকে যখন মঞ্চে নতুন ভাবনার প্রকাশ, অন্যদিকে তখন ইতিহাসের অজানা গল্প। সব মিলিয়ে বাগবাজার পুরনো এবং নতুন কলকাতার চমকপ্রদ মিশ্রণ।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।