তিনবার বিক্রি, একাধিকবার ধর্ষণ! বাগুইআটির কিশোরীর লড়াই চেনাচ্ছে নারীপাচারের অন্ধকার
ভালবাসার মানুষের সঙ্গে নতুন সংসার পাতার স্বপ্নে বিভোর কিশোরী বোঝেইনি, কী বিপদ ডেকে আনছে নিজের জন্য। তারপরের দিনগুলোর কথা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি মেয়েটি।

ভালবেসে প্রেমিকের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছিল কিশোরী। ভালবাসার মানুষের সঙ্গে নতুন সংসার পাতার স্বপ্নে বিভোর কিশোরী বোঝেইনি, কী বিপদ ডেকে আনছে নিজের জন্য। তারপরের দিনগুলোর কথা হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি মেয়েটি। মোট তিনবার বিক্রি ও ধর্ষণের পর পুলিশ উদ্ধার করে তাঁকে। তবে আজ সব বাধা অতিক্রম করে ফের মূল স্রোতে ফিরে আসার চেষ্টা করছে সে। স্কুলের পড়া শেষে এখন কলেজে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে কিশোরী।
অন্ধকার জীবন
পুলিশের থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে যখন ঘটনাটি ঘটে, তখন কিশোরীর বয়স ছিল ১৫ বছর। বাগুইআটিতে তাঁর বাড়ি। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহুল নামের একটি ছেলের সাথে আলাপ হয় এবং সেই থেকেই দু'জনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই বছর ৭ জানুয়ারি স্কুল যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বেরোয় তরুণী। সেদিন কলকাতার সায়েন্স সিটির কাছে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করার পর বিহারের উদ্দেশ্যে রওনা হন দু'জনে। সায়েন্স সিটি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বাবুঘাট থেকে বিহারের বাস ধরার জন্য বাসে ওঠে দু'জনে। শীঘ্রই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে ছেলেটি। আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি মেয়েটির। কিছুক্ষণ পর অন্য একজন ব্যক্তি রাহুলের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে হাওড়া স্টেশন নিয়ে যায়। পরে জানা যায়, দেড় লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিজের প্রেমিক তাঁকে অন্যের কাছে বেচে দিয়েছিল। ট্রেনে করে বিহার পৌঁছলে কমল নামক এক ব্যক্তির কাছে তুলে দেওয়া হয় ওই কিশোরীকে। এই কমলই নাবালিকাকে উত্তরপ্রদেশের বিজনোরে চিত্রা নামক এক মহিলার কাছে বিক্রি করে দেন। চিত্রা জোর করে তাঁর ৪৫ বছর বয়সি ভাইয়ের সঙ্গে কিশোরীর বিয়ে দিয়ে দেন। সেখানে একমাস এই নাবালিকার সঙ্গে থাকার পর লোকটি তাঁকে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে চিত্রার ছেলে মেয়েটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বৃদ্ধদের পরিচর্যা ও নিরাপত্তার বিষয়টি শহর তথা দেশের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষত অতিমারী-পরবর্তীকালে। এক্ষেত্রে বহু স্টার্ট আপ সংস্থা এগিয়ে এসেছে প্রবীণদের সহায়তার জন্য।
এদিকে, আচমকা মেয়ের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় কিশোরীর পরিবারের তরফে থানায় ডায়েরি করা হয়। সুযোগ বুঝে একদিন চিত্রার ফোন থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানায় তরুণী। তারপরই ঘটনার তদন্তে নামে সিআইডি। ততদিনে চিত্রা খানিক আঁচ করতে পেরে নাবালিকাকে নিয়ে যেতে অনুরোধ করে কমলকে। কমল এবং তাঁর সঙ্গীরা কিশোরীকে উত্তরাখণ্ডের কাশীপুর স্টেশনে ফেলে রেখে পালায়। তদন্ত শুরুর প্রায় চার মাস পরে রেলস্টেশনের এককোণ থেকে পুলিশ উদ্ধার করে বিধ্বস্ত তরুণীকে।
মানসিক আঘাত এতই গুরতর ছিল যে, উদ্ধারের পর প্রায় একমাস কোনও কথাই বলেনি তরুণী। সরকারি হোমে রেখে কাউন্সিলিং করার পর ভেঙে পড়েন তরুণী। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানায় পুলিশকে। সম্প্রতি সরকারি হোম থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে তরুণী। কলেজেও পড়তে চায় সে।
পাশাপাশি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে রাহুল, চিত্রা, কমল-সহ মোট ছয়জন। সেই থেকেই জেল হেফাজতে রেখে বিচার শুরু হয়। সদ্য রাহুল ও চিত্রাকে ১০ বছর এবং কমল, চিত্রার ভাই ও ছেলে লব ও ভিমশন নামে চারজনকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার পকসো আদালত। বারাসাত আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকউটর শ্যামল দত্ত জানিয়েছেন, দীর্ঘ এবং কঠিন যুদ্ধ ছিল। কোভিডের কারণে বিচার পেতে দু'বছর দেরি হলেও মেয়েটি ন্যায়বিচার পেল, এতেই খুব খুশি সকলে। কিশোরীর বাবার কথায়, "এখন মেয়ের জন্য একজন সৎ পাত্রের খোঁজ করছি। ভগবানের আশীর্বাদে মেয়েকে খুঁজে পেয়েছি এবং দোষীদেরও শাস্তি হয়েছে। আমরা খুব খুশি।"
পশ্চিমবঙ্গে নারী ও শিশুপাচার
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ভারতে মোট ৬,৬১৬টি পাচারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৯১৪ জনই শিশু। ২০১৮ সালে মোট ৮২০৫ জন শিশুপাচারের ঘটনা ঘটে পশ্চিমবঙ্গে যা ভারতের মধ্যে দ্বিতীয়। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে বর্ডার এলাকায় প্রতি বছর বহু নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা সামনে আসে এই রাজ্যে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের পাচার হওয়া দুই তৃতীয়াংশ শিশুই মেয়ে। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ প্রাথমিক স্কুল থেকে ড্রপ আউট বা কেউ কেউ কখনও শিক্ষাঙ্গনে পাও রাখেনি। এই রাজ্যের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং দুই চব্বিশ পরগনা পাচারের শীর্ষে রয়েছে। তবে পুলিশের দ্বারা উদ্ধার হওয়া মেয়েদের অবস্থাও যে ভালো নয়, তার প্রমাণও রয়েছে বহু। সরকারি সাহায্যের অভাব, পরিবারের লোকের কথায় জেরবার তাঁদের জীবন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বছর উদ্ধার হওয়া ২৯ জন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে সাহায্য চেয়েছেন। উদ্ধার হওয়া মহিলাদের জীবনের মূল স্রোতে ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেকে আবারও হারিয়ে যান ভিড়ের মাঝে। লড়াইয়ের মতো মসৃণ করতে সরকার ও পরিবারের মানুষের সঙ্গ অত্যন্ত জরুরি।
















