পদ্মা সেতুর পর কোটি মানুষের স্বপ্নপূরণ বঙ্গবন্ধু টানেলে, কতটা এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ?

পদ্মা সেতুর মতোই বঙ্গবন্ধু টানেলও দেশের যানচলাচলে গুরত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় মানুষরা তাই ভীষণ আশাবাদী, এশিয়ার বৃহত্তম টানেল প্রকল্পকে ঘিরে।

Piya Saha
৩ মিনিট
পদ্মা সেতুর পর কোটি মানুষের স্বপ্নপূরণ বঙ্গবন্ধু টানেলে, কতটা এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ?

গত বছরেই স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করল বাংলাদেশ। এই দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাপকাঠি বহু উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। জুন মাসেই বাংলাদেশের মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে উদ্বোধন হয়েছে পদ্মা সেতুর। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পর এবার কয়েক মাসের মধ্যেই চালু হতে চলেছে বঙ্গবন্ধু টানেল। নতুন এই টানেলও বাংলাদেশের উন্নয়নের গাড়িতে নতুন রসদ জোগাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর মতোই বঙ্গবন্ধু টানেলও দেশের যানচলাচলে গুরত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় মানুষরা তাই ভীষণ আশাবাদী, এশিয়ার বৃহত্তম টানেল প্রকল্পকে ঘিরে।

২৬ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে পদ্মা নদী পারাপারের একমাত্র মাধ্যম ছিল সদরঘাট টার্মিনালের লঞ্চ ও ফেরি। তাতে যাত্রাপথে সময়ও লাগত অনেক। কিন্তু স্বপ্নের পদ্মা সেতু সেই কষ্ট লাঘব করেছে। একই ধারায় কর্ণফুলি নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানলেও যাতায়াতের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে । চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্ন এই টানেলের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এই পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, দেশের সড়ক পরিবহণ এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, টানেলের প্রায় ৮৭ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। ফলে মনে করা হচ্ছে, নির্ধারিত সময়, অর্থাৎ চলতি বছরের ডিসেম্বরের আগেই খুলে যাবে বঙ্গবন্ধু টানেল।

বঙ্গবন্ধু টানেলের বিশেষত্ব

টানেলটি চট্টগ্রাম মহানগরী এবং নদীর দক্ষিণ তীরের আনোয়ারা উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মসৃণ করে তুলবে। এর ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়া সম্ভব হবে। এই টানেলের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৩৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে টানেলের প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২.৪৫ কিলোমিটার। দু'টি টানেলে লেন থাকছে চারটি। মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তের ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকছে। আনোয়ারা প্রান্তে থাকছে ৭২৭ মিটারের দীর্ঘ ফ্লাইওভার। প্রথম টানেল খননে সময় লেগেছে ১৭ মাস। দ্বিতীয়টি তৈরিতে সময় লেগেছে মাত্র ১০ মাস। ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় তৈরি করা হয়েছে দু'টি টানেল। প্রতিটি ৩৫ ফুট প্রশস্ত এবং ১৬ ফুট উচ্চতার। প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানিয়েছেন টানেলের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন ভেতরের লেন তৈরি-সহ বেশ কিছু টেকনিক্যাল কাজ বাকি রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করার প্রচেষ্টা চলছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পদ্মা সেতুই নির্বাচনে বৈতরণী পার করাবে হাসিনাকে?

২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের নির্বাচনে পঞ্চমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করলেন।

এর আগে পদ্মা সেতুর নির্মাণে ব্যয় নিয়ে বিরোধীরা আক্রমণ করছেন হাসিনা সরকারকে। কিন্তু এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু টানেল ব্যতিক্রম। শুরু থেকে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর। এই টানেল বাংলাদেশের এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশে তৈরি প্রথম ও দীর্ঘতম টানেল।

টানেল নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর। চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির হাতে দেওয়া হয় এই টানেল নির্মাণের দায়িত্ব। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধু টানেলের ফলে কতখানি বদলাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি?

দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরী অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও কর্ণফুলির ওপারে আনোয়ারা অবহেলিত থেকে গেছে। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় নদীর ওপারে বন্দর প্রসারিত হয়নি। এই টানেল চালু হলে কর্ণফুলির দক্ষিণ তীরে আনোয়ারা, বাঁশখালি, পটিয়া এবং চন্দনাইশ-সহ চট্টগ্রামের দক্ষিণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। কর্ণফুলি নদীর দক্ষিণ পাড়ে নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং বন্দরের কাজকর্ম প্রসারিত হবে। মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত শিল্প করিডর গড়ে তোলা হবে। কর্ণফুলি নদীর দুই তীরে চিনের সাংহাইয়ের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউন গড়ে তুলতেই বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার।

টানেল রোডের পাশে আনোয়ারা অঞ্চলে নতুন ব্যবসা স্থাপনের জন্য শিল্পমালিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পিছিয়ে নেই স্থানীয় মানুষরাও। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, শপিং মলের মতো বিভিন্ন ব্যবসা গড়ে তুলতে চায় তাঁরাও। ব্যবসায়ীদের মতে, বঙ্গবন্ধু টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি নয় দেশের অর্থনীতিতেও সার্বিক উন্নতি আনবে কারণ এর ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ফলে বাংলাদেশের যোগাযোগ, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে চলেছে বঙ্গবন্ধু টানেলের হাত ধরে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।