বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের পাঞ্জেরী
Khaleda Zia death: অন্যান্য রাজনৈতিক দল এরশাদের সঙ্গে আপস করে সংসদে যোগ দেয়, তখন তিনি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন।

•এ এস এম তৌফিক ইমাম: একটি জাতির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রায়শই এমন মহীরুহ ব্যক্তিত্বদের দ্বারা গঠিত হয়, যাদের জীবন জাতির ভাগ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জন্য বেগম খালেদা জিয়া এমনই এক মহীরুহ হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজন নারী যার জীবনযাত্রা একটি গৃহবন্দি গৃহিণী থেকে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীতে উত্তরিত হয়। এটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এমন একটি আখ্যান, যা দেশের নিজস্ব গণতান্ত্রিক সংগ্রামের উত্তাল ইতিহাসকে প্রতিফলিত করেছিল। তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রজন্মের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। সব প্রজন্মের তরুণ তরুণীদের জন্য তিনি ছিলেন এক আশ্রয়স্থল। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকালে, বেগম খালেদা জিয়া সবাইকে কাঁদিয়ে অসীম মহাকালের পথে যাত্রা করেন। তাঁর এই প্রস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। তাঁর জীবন সহনশীলতা, আধিপত্য এবং তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্পের মূর্ত প্রতীক।
খালেদা জিয়ার জীবনে রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয় দেশের স্বৈরশাসক বিরোধী সংগ্রামের সূচনালগ্নে। ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণকারী এই নেত্রীর প্রারম্ভিক জীবন ছিল শান্ত গৃহস্থালির। তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন, তাঁর জীবন ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি স্বামী জিয়াউর রহমান এবং তাঁদের ছোট্ট পরিবারের প্রতি নিবেদিত। তাঁর জীবনের এই অধ্যায়টি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, রাজনীতি তখনও প্রবেশ করেনি জীবনে। কিন্তু, তারপর, ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল সেই ধ্বংসাত্মক মোড়, যা তাঁকে রাজনীতির আঙিনায় ঠেলে দেয়। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর ট্র্যাজেডি থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৮২ সালে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব, উত্তরাধিকার সূত্রে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে পান। একজন শোকার্ত বিধবা থেকে রূপান্তরিত হন লাখ লাখ মানুষের প্রতিরোধের প্রতীকে, যারা তাঁর শহিদ স্বামী জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী।
তিনি সাবেক একনায়ক হুসেন মুহাম্মদ এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের সকল কারচুপির নির্বাচন বর্জন করেন। যখন অন্যান্য রাজনৈতিক দল এরশাদের সঙ্গে আপস করে সংসদে যোগ দেয়, তখন তিনি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কার চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন। এই যাত্রা ছিল বিপদসংকুল, আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত, তাঁর উপর একাধিক হামলা হয়। যদিও, সেইসব হামলা থেকে তিনি বেঁচে যান।
১৯৯০ সালে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসন উৎখাতের পর, খালেদা জিয়া বিএনপিকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম স্বাধীন, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের দিকে নিয়ে যান। তাঁর উত্থান ছিল বজ্রপাতের মতো দ্রুত, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এক শক্তিশালী আঘাত। তাঁর প্রথম মেয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অর্জন চিহ্নিত করা যায়— সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পুনরুদ্ধার, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। তিনি নিজেকে একজন অবিচল ও কর্তৃত্বশীল নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, দৃঢ় হাতে দেশ চালান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নমূলক নীতি বাস্তবায়ন করেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia death: বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন অনেকে। কিন্তু সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়া। কারণ স্পষ্ট, তিনি এমন একজন নেত্রী যার উপস্থিতি একাই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারত।
কৃষিকে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে, তাঁর সরকার রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাসনকালে গঠিত দেশের পলি জমে যাওয়া খাল পুনঃখনন ও পুনরুজ্জীবিত করার একটি ব্যাপক প্রকল্প পুনরায় শুরু করে। এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সেচের উন্নতি ঘটায়, জলপথে পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা বাড়ায় এবং বন্যার প্রভাব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা ও গ্রামীণ জীবিকা নির্বাহেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা খাতেও তাঁর সরকার যুগান্তকারী কয়েকটি উদ্যোগ নেয়— বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন এবং ব্যাপকভাবে স্বীকৃত "খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা" কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত। এই উদ্যোগ, শিশুদের স্কুলে উপস্থিতির বিনিময়ে পরিবারগুলোকে খাদ্যশস্য প্রদান করত, তাই ভর্তির হার ব্যাপকভাবে বাড়ে, বিশেষত মেয়েদের জন্য, এবং একটি ভবিষ্যৎ, আরও সাক্ষর প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপন করে।

তবে, তাঁর রাজনৈতিক জীবন খুব কমই মসৃণ ছিল। তাঁর শাসনকালে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়। ১৯৯৫-৯৬ সাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নিরবচ্ছিন্ন বিক্ষোভ ও সারাদেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন করে। তারা নির্বাচন তদারকির জন্য একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করছিল। সেই সময় খালেদা জিয়ার সরকার কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই বিক্ষোভ সামলানো এখনও তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। খালেদা জিয়া, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার মতো নন, তিনি কখনোই নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর আক্রমণাত্মক কঠোর পদক্ষেপ নেননি। তাঁর সরকারের অবস্থান ছিল সংবিধান নির্দেশিত কর্তব্য পালনের, যা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘর্ষের সময়ের দিকে নিয়ে যায়। এটি শেষ পর্যন্ত তাঁর পদত্যাগ এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দিকে পরিচালিত করে, যার ফলশ্রুতিতে জুন ১৯৯৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে পদে পদে খালেদা জিয়াকে অপমান করার চেষ্টা করা হয়। তাঁর নামে কুৎসা রটানো হয়। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়।
এই পর্বটি তাঁকে শুধুমাত্র একজন শাসক হিসেবেই নয়, একজন প্রতিরোধকারী হিসেবেও তুলে ধরে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন এমন একটি চেতনার সাক্ষ্য যা অগণতান্ত্রিক রীতিনীতির কাছে মাথা নত কখনও করেনি। ২০০১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পর, তিনি পরে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের আরেকটি পর্যায়ের মুখোমুখি হন। তাঁর শাসনকালে বিরোধী দলনেত্রী, বিরোধী দলের কর্মী, সাধারণ জনতা এবং তাঁর রাজনৈতিক দল বিএনপির মানুষের উপর সিরিজ সন্ত্রাসী হামলায় প্রকম্পিত হয়। তাঁর সহনশীলতা আবারও পরীক্ষিত হয় যখন তিনি র্যাব গঠন করেন। যদিও এটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, অপরাধ ও সন্ত্রাসী চক্রান্ত দমন করার জন্য।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শেষ শাসনকালে, বেগম খালেদা জিয়া, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে শাস্তিস্বরূপ পাঁচ বছরের কারাবাস পান। এই শাস্তি ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা তাকে ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখে।
খালেদা জিয়ার ত্যাগ অনুধাবন করতে হলে, তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত দেখতে হবে, এমন একটি আখ্যান যা ১৯৭১ সাল থেকে জাতির ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে। তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন, বহু বছর রাজনৈতিক কারাবাস ও গৃহবন্দিত্ব ভোগ করেছেন, হারিয়েছেন আদরের ছোট ছেলেকে এবং এমন মামলার মুখোমুখি হয়েছেন যাকে তাঁর সমর্থকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি লড়াই বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ত্যাগ একটি অবিচ্ছিন্ন সুতো—১৯৮১ সালের ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ পর্যন্ত তাঁর জীবনকে চিহ্নিত করা আইনি ও শারীরিক সংগ্রাম, যার মধ্যে তাঁর কারাবাস, তাঁর ছোট ছেলের মৃত্যু এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলমান স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জও অন্তর্ভুক্ত। তাঁর দল ও অনুসারীদের কাছে, তিনি শুধু একজন নেত্রীই ছিলেন না, একজন মাতৃসুলভ চরিত্র ছিলেন, যিনি তাঁর বিশ্বাসের জন্য চড়া মূল্য দিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব অবিস্মরণীয়। তিনি, তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার পাশাপাশি, এক দশক ধরে দেশের দ্বিমেরুকৃত রাজনৈতিক অঙ্গনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। "গণতন্ত্রের ত্রুসেডর" হিসেবে, তিনি একটি শক্তিশালী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন—একজন নারী যিনি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে উঠে এসে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গঠন করেছেন এবং অটুট আনুগত্যের অনুপ্রেরণা হয়েছেন।
তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান দলের হাল ধরবেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার দলীয় পরিচয়ের উর্দ্ধে যে অদম্য শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে স্টেটসওমান পরিচয় ছিল সেটি ছিল দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ স্থাপনের মূল ভিত্তি।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)






