মাওয়ের লং মার্চ, মহাত্মার ডান্ডি অভিযান থেকে ভারত জোড়ো যাত্রা! রাহুলের চেষ্টা কতটা সফল?
Bharat Jodo Nyay Yatra : মণিপুর থেকে শুরু করে ৬৭০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে, বাংলা, ঝড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশের মধ্যে দিয়ে গিয়ে তা শেষ হবে গুজরাতে, মোদির গুজরাতে

২০২৪ সালের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বার নির্বাচনে জেতার জন্য রাস্তায় নেমে পড়েছেন। শুধু রাস্তা নয়, গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমেও ছেয়ে গিয়েছেন তিনি। যে কোনও রকমের কৌশল, যে কোনও রকমের পন্থা, যে কোনও সংস্থাকে ব্যবহার করতে এবার যে তিনি দু’বার ভাববেন না, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। তাঁর একটাই লক্ষ্য, তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে এই দেশের এক অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠতে চান মোদি। আগামী প্রজন্ম যাতে তাঁকে একজন শক্তিশালী, ক্ষমতাবান চরিত্র হিসেবেই মনে রাখে, তার জন্য চেষ্টার কোনও কসুরই তিনি করছেন না। ঘোষিত হয়ে গেছে, আগামী ২২ জানুয়ারি বাবরি মসজিদের জমিতে যে রাম মন্দির তৈরি হচ্ছে, সেখানে রাম লালাকে প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি। চারিদিকে সাজো সাজো রব। যদিও এই রাম মন্দির নির্মাণ হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই, তবুও সমস্ত আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে যেন আরএসএস বিজেপির নিজস্ব অনুষ্ঠান এটি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে এটি আসলে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব অনুষ্ঠান। যে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়েছিল নরেন্দ্র মোদির পূর্বসূরি লালকৃষ্ণ আদবানির নেতৃত্বে ১৯৯২ সালে, যাকে কেন্দ্র করেই বিজেপি উত্থানের শুরু, সেই জায়গায় রামের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে বিজেপি আরএসএসকে আরও শক্ত জমি তৈরি করে দেওয়াটাই যেন লক্ষ্য, যাতে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করতে আর বিলম্ব না হয়।
কিন্তু মানুষের মনে কী আছে, তা কি প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারছেন? বিজেপি আরএসএস কি নিশ্চিত যে এই রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ২০২৪-এর নির্বাচনে তাদের লভ্যাংশ দেবেই? ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরেই উত্তরপ্রদেশে যে নির্বাচন হয়েছিল সেখানে কিন্তু হিন্দুরা দু’হাত তুলে বিজেপিকে সমর্থন করেনি। উল্টে ‘মণ্ডল রাজনীতি’র দৌলতে তারা কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে বেশ কিছু বছর পিছনের সারিতেই ছিল। ৯০ দশকের শেষে যখন অটল বিহারি বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু লালকৃষ্ণ আদবানিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরতে কোনও রামচন্দ্র আসেননি। ২০১৪ সালেও যখন নরেন্দ্র মোদি প্রথম প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হয়েছিলেন, সেদিনও কিন্তু তিনি শুধু হিন্দু আবেগে ভর করে তা হতে পারেননি। সেদিন বিজেপি দেখানোর চেষ্টা করেছিল, নরেন্দ্র মোদি একজন দক্ষ প্রশাসক হতে পারেন, দুর্নীতি বন্ধ করার লড়াইয়ে শক্তিশালী মুখ হতে পারেন। সেই কারণেই দেশের মানুষ, সেদিন নির্বাচনে বিজেপিকে সমর্থন করেছিল। শুধু রামমন্দির তৈরি করবেন বললে কি ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন?
২০০২ সাল থেকে, বা তার আগে থেকেই বিজেপি দেখানোর চেষ্টা করেছে হিন্দুরা কংগ্রেসের মুসলমান তোষণ নীতির শিকার। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি কিংবা নরেন্দ্র মোদি শুধু হিন্দুত্বের তাস খেলেননি, আস্তিনে আরও অনেক তাস ছিল। একটা মোড়কের মধ্যে লুকনো ছিল হিন্দুত্ব। বাইরে ছিল সুশাসনের অঙ্গীকার, 'সবকা সাথ সবকা বিকাশ'-এর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তারপরে দশ বছরে কি সত্যিই সুশাসনের প্রতিশ্রুতি পালিত হয়েছে? নারীরা কি সুরক্ষা পেয়েছেন? দেশের সোনাজয়ী কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থা কিন্তু সেই ইঙ্গিত দেয় না। দুর্নীতি কি বন্ধ হয়েছে? বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা মন্ত্রীদের গ্রেফতারির ঘটনা দেখলে হয়তো আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধ নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি খড়্গহস্ত কিন্তু পাশাপাশি যদি বিরোধীদলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বিজেপিতে যোগদানের ঘটনাগুলোকেও উল্লেখ করা যায়, তাহলে বোঝা যাবে নরেন্দ্র মোদি বা বিজেপির ‘আর নয় অন্যায়’ স্লোগান
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Assembly Election 2023: তেলেঙ্গানায় রেবন্ত পারলেন, অথচ পারলেন না কমল নাথ, ভূপেশ বাগেলের মতো অভিজ্ঞ নেতারা। কোথায় কোথায় ভুল থেকে গিয়েছিল কংগ্রেসের? আলোচনায় সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য
সম্পূর্ণ ফাঁপা এবং ফাঁকা। প্রতিদিন যে রেডিও, টিভিতে, ‘মোদির গ্যারান্টি’র বিজ্ঞাপন চলছে তা কতটা সাফল্য পেয়েছে, সেই প্রশ্ন করা কি জরুরি নয়? অথচ বছরে দু’ কোটি বেকারের চাকরির গ্যারান্টির প্রতিশ্রুতির কী হলো সেই প্রশ্ন যদি একজন বেকার যুবক করেন, তাহলে হয়তো তাঁকে ইউএপিএতে গ্রেফতার করা হতে পারে ঠিক যেমন সংসদে ঢুকে পড়া যুবকদের ক্ষেত্রে হয়েছে।
আজকে রাম মন্দির উদ্বোধনের প্রাক্কালে বিজেপি এবং আরএসএস একদিকে যেমন দেখানোর চেষ্টা করছে যে, তাদের জন্যই হিন্দুরা হৃত সম্মান ফিরে পাচ্ছে, অন্যদিকে অযোধ্যাতে বিমানবন্দর উদ্বোধন করে নরেন্দ্র মোদি বলছেন, এই রামমন্দির এবং তৎসংলগ্ন উন্নয়ন আসলে ভারতের বিশ্বাস এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন। এটি ভারতের ঐতিহ্য এবং উন্নয়নের অভিমুখে একইসঙ্গে যাত্রা। যদিও হিন্দু হৃদয়সম্রাট হয়ে ওঠা, মুসলমানদের শত্রু হিসেবে
দেখিয়েও এই নরেন্দ্র মোদি কিন্তু সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণের কর্ণাটক, তেলেঙ্গানায় এবং তার আগে পঞ্জাব, হিমাচলপ্রদেশ, বাংলা কিংবা ঝাড়খণ্ডে জিততে না পারলেও, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ কিংবা ছত্তিশগড়ে হিন্দুত্বের তাস কাজ করেছে। তাহলে কি হিন্দুত্ব নিয়ে এই উন্মাদনা শুধুমাত্র হিন্দি বলয়ে সীমাবদ্ধ? ২০১৮ সালে কংগ্রেস কিন্তু হিন্দি বলয়ের এই তিন রাজ্যে জয়ী হয়েও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অত্যন্ত খারাপ ফল করেছিল। তাই নির্বাচকদের মন সম্পূর্ণ পড়তে পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি, একথা এখনই বলে দেওয়া যায় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bharat Nyay Yatra: নির্বাচনকে সামনে রেখেই রাহুল গান্ধী পরিকল্পনা করেছেন 'ভারত ন্যায় যাত্রা'র। ১৪ জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ অবধি চলবে এই যাত্রা। চলবে ৬২০০ কিলোমিটার জুড়ে। ১৪ টি রাজ্য ও ৮৫টি জেলার উপর দিয়ে যাবে যাত্রাটি
অনেকেই বলছেন, মোদি এবং তার হিন্দুত্বের এই আগ্রাসী আক্রমণকে রুখতে একটা বিকল্প ন্যারেটিভ দরকার। কিন্তু সেই বিকল্প ন্যারেটিভ বা আখ্যান কীভাবে তৈরি হবে তার কোনও দিশা নেই। শুধু মুখে বলে দিলে বা সামাজিক মাধ্যমে টুইট করে দিলেই কি বিকল্প দিশা দেখতে পাবে দেশের আপামর জনসাধারণ? এই সব ক্ষেত্রে রাস্তাই একমাত্র রাস্তা, মানুষের মাঝে যাওয়াই একমাত্র রাস্তা। কিন্তু কী পদ্ধতিতে সেই রাস্তায় নামতে হবে সেই বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা করছেন রাহুল গান্ধি। মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। আবার ঘোষিত হয়েছে ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা। মণিপুর থেকে শুরু করে ৬৭০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে, বাংলা, ঝড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশের মধ্যে দিয়ে গিয়ে তা শেষ হবে গুজরাতে, মোদির গুজরাতে।
১৪টি রাজ্য এবং হিন্দি বলয়ের বহু লোকসভা ছুঁয়ে এই ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা যখন মুম্বই পৌঁছবে, ততদিনে ভারতীয় রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটে যাবে। প্রাথমিকভাবে ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা রাহুল গান্ধি এবং কংগ্রেসের নিজস্ব কর্মসূচি হিসেবে ঘোষিত হলেও, রাহুল গান্ধি নিজে আবেদন করেছেন, ইন্ডিয়া জোটের অন্য শরিকরাও যাতে এই কর্মসূচিতে যোগদান করেন। আসন সমঝোতা সম্পূর্ণ না হওয়ার কারণে, শরিকরা এই কর্মসূচিতে যোগ দেন কিনা, তা সময় বলবে। তবে, একটা কথা বলতেই হয়। রাহুল গান্ধি এই অসম লড়াইতে সহজে হেরে যেতে রাজি নন।
এই কর্মসূচি যে মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিজেপি বোঝে। তাই যে মণিপুরের বিজেপি সরকার গত ছয় মাস ধরে জাতিদাঙ্গা থামাতে ব্যর্থ তারা এই ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা যাতে ইম্ফল থেকে না শুরু হয় সেই চেষ্টা করছে। শুধু তাই নয়, অসমের বিজেপি সরকারও ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার অংশগ্রহণকারীদের রাতে থাকার অনুমতি দিতে টালবাহানা করছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, বিজেপি রাহুল গান্ধির এই ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার মাধ্যমে, মানুষের সঙ্গে সংযোগের কর্মসূচিকে যথেষ্ট ভয় পাচ্ছে। গতবার যখন ভারত জোড়ো যাত্রা কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর অবধি শুরু হয়েছিল, তখন প্রাথমিকভাবে অনেকেই রাহুলকে আমল দেননি। ধীরে ধীরে মানুষ জুড়ে যান এই দীর্ঘপথে। নরেন্দ্র মোদির পোষা গণমাধ্যমও এই ভারত জোড়ো যাত্রা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। গতবারের মতো এবারের এই ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা কতটা আকর্ষণীয় হবে, কতটা উন্মাদনা এই যাত্রা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করবে তা সময় বলবে। তবে একটা কথা অবশ্যই বলা যায়, রাহুল গান্ধির এই প্রচেষ্টা নিশ্চিত আগামী ভারতবর্ষ মনে রাখবে।
ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থার পরে রাজনৈতিক জগতে উঠে এসেছিলেন জয় প্রকাশ নারায়ণ। ইন্দিরাকে পরাজিত করার ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর ডাকে সেদিন সারা দিয়েছিল দেশের বেশিরভাগ ছাত্র যুবরা। সমস্ত বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধির স্বৈরাচার থেকে দেশকে মুক্ত করতে। তিনি বলেছিলেন, দেশে সম্পূর্ণ বিপ্লব চাই। তা হয়তো সেদিন বাস্তবায়িত হয়নি কিন্তু ইন্দিরা পরাজিত হয়েছিলেন। কার্যকরী ঐক্য সেদিন ইন্দিরা গান্ধিকে পরাস্ত করতে পেরেছিল। আজ রাহুল গান্ধি আর একবার নতুন জয়প্রকাশ নারায়ণ হয়ে উঠতে পারবেন কিনা তা ভবিষ্যৎ বলবে কিন্তু তাঁর এই ভারত জোড়ার প্রচেষ্টা মানুষ মনে রাখবে। যখন সবাই বিকল্প ন্যারেটিভ দেওয়া উচিত বা দিতে হবে জাতীয় কথা বলেই দায় সারছিলেন, সেই সময়ে মানুষের মাঝে পৌঁছে মানুষের থেকেই রসদ সংগ্রহ করে বিকল্পের খোঁজ করার চেষ্টা রাহুলই করেছিলেন।
চিনের লং মার্চ ছিল কমিউনিস্ট বিপ্লবের জন্য আর ডান্ডি মার্চ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার আহ্বানে মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে রাস্তায় হাঁটা। দু'ক্ষেত্রেই মানুষের অংশগ্রহণ ছিল স্বতস্ফুর্ত। চিনে মাও সে তুঙের নেতৃত্বে লং মার্চের কথা ইতিহাস ভোলেনি, মহাত্মার লবণ সত্যাগ্রহ এবং ডান্ডি মার্চও দেশের মানুষ মনে রেখেছে। যখন দেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যমই নরেন্দ্র মোদির বন্দনায় ব্যস্ত, তখন কিছু ব্যক্তিগত সংবাদ মাধ্যমের প্রচেষ্টায়
একমাত্র রাহুল গান্ধিই বিকল্প খুঁজতে পথে নেমেছেন। দেশ এই ভারত জোড়োকে মনে রাখবেই।






