শুরু দ্বিতীয় যাত্রা, হিংসাধ্বস্ত মণিপুর জুড়তে পারবেন রাহুল?
Bharat Jodo Nyay Yatra: রবিবার, রাহুল গান্ধী তাঁর দ্বিতীয় যাত্রা শুরু করলেন। 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা' মণিপুর থেকে পাড়ি দিল মুম্বইয়ের পথে। 'হিংসা, ঘৃণা ও স্বৈরাচারে'র বিরোধিতায় তাঁদের হাতিয়ার 'সাম্য ও ন্যায়'।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। রবিবার, রাহুল গান্ধী তাঁর দ্বিতীয় যাত্রা শুরু করলেন। 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা' মণিপুর থেকে পাড়ি দিল মুম্বইয়ের পথে। রাহুলের মতে, বিজেপির 'হিংসা, ঘৃণা ও স্বৈরাচারে'র বিরোধিতায় তাঁদের হাতিয়ার 'সাম্য ও ন্যায়'।
দু'মাসে মণিপুর থেকে মহারাষ্ট্র, প্রায় ৬৭১৩ কিমি জুড়ে চলবে এই যাত্রা। যাত্রার বেশিরভাগ অংশই হবে বাসের মাধ্যমে। ইম্ফল থেক মুম্বইগামী এই যাত্রায় রাহুল গান্ধী ১৫টি রাজ্যের ১০০টি লোকসভা কেন্দ্রের উপর দিয়ে যাত্রা করবেন। মুম্বই পৌঁছবেন ২০-২১ মার্চ নাগাদ। বিশেষ ভাবে তৈরি ভলভো বাসটিতে একটি হাইড্রোলিক লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে। তার সাহায্যে যাত্রা চলাকালীন জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা রাখতে পারবেন রাহুল।
ইম্ফলের কাছেই অবস্থিত থৌবলের একটি জনসভায় রবিবার 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা' শুরুর পূর্বে বক্তৃতা দেন রাহুল গান্ধী এবং মল্লিকার্জুন খাড়গে। অত্যন্ত সচেতন ভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে নিজের বক্তব্য রাখেন রাহুল। বিজেপির কট্টরপন্থী হিন্দুত্ব নীতির চূড়ান্ত সমালোচনা করেন খাড়গে। দু'জনেই সমস্যা জর্জরিত মণিপুরে না আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনা করেন। রাম মন্দির উদ্বোধনের আগেও মোদীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ এনেছিলেন খাড়গে। তাঁর বক্তব্য ছিল, 'রাম' নামটি ভোটে ফয়দা তোলার জন্য ব্যবহার করছেন মোদী। অভিযোগ ছিল, নির্বাচনে ধর্মীয় আবেগ জাগ্রত করে লোক ঠকাচ্ছে বিজেপি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bharat Jodo Nyay Yatra: বৃহস্পতিবার এই যাত্রার নাম আবার পরিবর্তিত করে রাখা হয়, 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা'। অরুণাচলপ্রদেশ সহ ১৫টি রাজ্য জুড়ে এই যাত্রা চলবে।
তিনি বলেন, “সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াবেন, আর মুখে বলবেন রাম রাম রাম রাম। মুখে রামনাম, আর আস্তিনের তলায় ছুরি? মানুষের সঙ্গে এ'গুলো করবেন না।" খাড়গের বয়ানে ভগবানের নাম জপ করতে করতে হিংসার রাজনীতি করছেন মোদী। তিনি আরও বলেন, “সমস্ত মানুষ ভগবানকে স্মরণ করেন। তাঁদের নিজস্ব বিশ্বাস রয়েছে। এ'নিয়ে সন্দেহের কোনও জায়গাই নেই। কিন্তু কেবল ভোটে মুনাফা লোটার জন্য এ'কাজ করবেন না। নিজের আদর্শের জন্য লড়ুন। আমরাও নিজেদের আদর্শ নিয়ে লড়াই করছি। আমরা লড়াই করছি ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়ের জন্যে। আমাদের লড়াই সংবিধান রক্ষার্থে। আপনারাও সেই লড়াইয়ে যোগ দিন। বিজেপি রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম মিশিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।"
কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, অধীররঞ্জন চৌধুরী সহ আরও অনেকেই 'রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টে'র আমন্ত্রণ পত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা জানিয়েছেন, প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন না কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ। ওইদিন বক্তব্য রাখার সময় রাহুল গান্ধী বলেন, বিজেপি আরএসএস-এর ঘৃণার রাজনীতির পরিণামই দেখছেন মণিপুরের মানুষ। তিনি বলেন, “আমি প্রাণপণে চেয়েছিলাম, যাত্রা এই মণিপুরেই শুরু হোক...কারণ আমরা আপনাদের যন্ত্রণা বুঝি, স্বজন হারানোর যে প্রচণ্ড দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে আপনাদের অহরহ যেতে হচ্ছে, তা আমাদেরও ব্যথিত করে... আমরা আমাদের সবথেকে দামি জিনিসটাই হারিয়ে ফেলছি। আপনাদের এই ক্ষতি কেবলমাত্র বিজেপির আদর্শের জন্য। বিজেপির রাজনীতির জন্য। বিজেপির ঘৃণার জন্য, যে ঘৃণা তাদের রাজনীতির মাধ্যমে সর্বক্ষণ ছড়িয়ে চলেছে বিজেপি-আরএসএস।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manipur Violence : কী বলছে সংখ্যাতত্ত্ব? মণিপুরবাসীর বিপদ কতখানি? কী থেকেই বা শুরু সংঘাত? পড়ুন বিস্তারিত।
প্রসঙ্গত, নতুন বছরের শুরুতেই হিংসা আর রক্তপাত দেখেছে মণিপুর। থৌবল জেলায় গোষ্ঠীসংঘর্ষে অন্তত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে রাজধানী ইম্ফল-সহ উপত্যকার পাঁচ জেলায় কার্ফু জারি করেছে মণিপুর সরকার। থৌবল ছাড়াও তালিকায় রয়েছে, ইম্ফল পূর্ব, ইম্ফল পশ্চিম, বিষ্ণুপুর এবং ককচিং। ২০২২ সালের ৩ মে জনজাতি ছাত্র সংগঠন ‘অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ মণিপুর’ (এটিএসইউএম)-এর কর্মসূচি ঘিরে অশান্তির সূত্রপাত হয়েছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওই রাজ্যে। মণিপুর হাই কোর্ট মেইতেইদের তফসিলি জনজাতির মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারকে বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছিল। এর পরেই জনজাতি সংগঠনগুলি তার বিরোধিতায় পথে নামে। আর সেই ঘটনা থেকেই মণিপুরের আদি বাসিন্দা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুকি, জ়ো-সহ কয়েকটি তফসিলি জনজাতি সম্প্রদায়ের সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। বছর ঘুরে গেলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওই রাজ্যে হিংসা থামেনি। এখনও পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা প্রায় দু’শো। ঘরছাড়া ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
রাহুল গান্ধী বলেন, “আমরা মণিপুরের মানুষের সহমর্মী। এই বেদনা, দুঃখ আমাদেরও। আমরা এই রাজ্যে আবার সেই সাম্য, শান্তি ও ভালোবাসা ফিরিয়ে আনব যার জন্য একদিন মণিপুর প্রসিদ্ধ ছিল।" তাঁর মতে, ভারত এ'সময় সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক─সমস্ত ক্ষেত্রগুলিতে এক চরম অব্যবস্থার মধ্যে, অবিচারের মধ্যে রয়েছে। "একচেটিয়া পুঁজির আধিপত্যে দেশের সমস্ত সম্পদের খুব সামান্যই সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারছেন। একজন-দু'জন পুঁজিপতি সমস্ত ব্যবসায় নেমে পড়েছেন। বড় ব্যবসায়ীদের চাপে মাঝারি পুঁজি, খুচরো পুঁজি ধ্বংস হতে বসেছে। দেশে হু হু করে বেকারত্ব বাড়ছে। সমস্ত ভারতবাসী মূল্যবৃদ্ধির অত্যাচারে কাতর।"
সামাজিক সমস্যাগুলির উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ভারতের বৃহৎ অংশ...তথাকথিত নিচু জাত, দলিত, আদিবাসীদের কোনও মতই গ্রাহ্য করে না ভারতের বর্তমান সরকার। এইসব দাবি নিয়ে সোচ্চার হবে 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা'। আমরা আপনাদের 'মন কি বাত' শুনতে চাই। আপনাদের দুরবস্থা বুঝতে চাই, আপনাদের সঙ্গে নিয়ে ভারতের নতুন সরকার গঠন করতে চাই। হিংসা নয়, ঘৃণা নয়, একচেটিয়া পুঁজি নয়─সাম্যের আদর্শ, ন্যায়ের আদর্শ, ভ্রাতৃত্বের আদর্শ। আপনাদের স্বর আমরা ভারতের সর্বত্র পৌঁছে দিতে চাই।"
এই যাত্রায় মহাত্মা গান্ধীর পায়ে হেঁটে নোয়খালি পরিদর্শনের ঘটনার ছায়া দেখছেন কেউ কেউ। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের এক বছর আগে থেকেই অবিভক্ত বাংলা ছিল অগ্নিগর্ভ। হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পারষ্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ঘৃণা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যার জেরে ১৬ই অগাস্ট, ১৯৪৬ ঘটে যায় পূর্ব ভারতের ইতিহাসের কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ - 'দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস'। দাঙ্গা শুরুর প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাণ হারান ৪,০০০ নিরীহ হিন্দু ও মুসলমান, এবং গৃহহীন হন এক লক্ষেরও বেশি মানুষ। দাঙ্গার খবর শুনে গান্ধীজি ঐ অঞ্চলে গিয়ে প্রায় মাস তিনেক সময় কাটান। এ'সময় বেশিরভাগ পায়ে হেঁটে তিনি পুরো অঞ্চলটি ঘুরে বেড়ান। হিন্দু-মুসলমান সমাজের নানা অংশের সঙ্গে কথা বলেন। এবং বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে ভাষণ দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই হানাহানি বন্ধ করে দুর্বলকে রক্ষা করা। আজও 'ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা' পীড়িত সাধারণ মানুষের স্বর দেশের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা তুলছেন রাহুল। মণিপুর সমস্যা সমাধানে সফল হবে এই যাত্রা? অপেক্ষায় মণিপুরবাসী, অপেক্ষায় সমস্ত দেশ।







