আসতে চাননি গানের জগতে, তবু ভূপিন্দর সিং অমর হয়ে রইলেন সংগীতে

প্রয়াত সংগীতশিল্পী ভূপিন্দর সিং। গত দশদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। বার্ধক্যজনিত একাধিক সমস্যা ছিল তাঁর। বয়স হয়েছিল ৮২।

 

প্রয়াত সংগীতশিল্পী ভূপিন্দর সিং। গত দশদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। বার্ধক্যজনিত একাধিক সমস্যা ছিল তাঁর। বয়স হয়েছিল ৮২। একাধিকবার মূত্রনালীর সংক্রমণে ভুগেছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সোমবার মৃত্যু হয় তাঁর। রয়ে গেল অজস্র সৃষ্টি, সুরের ভুবন।

ভূপিন্দরের জন্ম অমৃতসরে। বাবা খুব কড়া সংগীত-শিক্ষক। পরিবারের সকলের মধ্যেই টুকটাক গানের চর্চা ছিল। এই সব কারণেই দীর্ঘদিন সংগীত বিষয়টা খুব একটা পছন্দ করতেন না ভূপিন্দর। তাঁর মনে হতো, পরিবারের সবাই যা করছে তিনিও তাই করলে কেউ তাঁকে পাত্তা দেবে না। আলাদা করে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারবেন না তিনি। তবু স‌ংগীত তাঁকে ছাড়েনি। প্রথমদিকে ভূপিন্দর দিল্লির অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজ শুরু করেছিলেন। সেসময় দিল্লি দূরদর্শনের সঙ্গেও তাঁর একটা সম্পর্ক ছিল। গিটার এবং ভায়োলিন শিখেছিলেন।

১৯৬২ সাল। সতীশ ভাটিয়ার অধীনে ভূপিন্দর তখন গিটারিস্ট হিসেবে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজ করছেন। ভাটিয়ার একটি ডিনার পার্টিতে গান করেন ভূপি। ঘটনাক্রমে মদনমোহনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ওই গান শুনে চেতন আনন্দের ‘হাকিকত’-এ তাঁকে গাওয়ার সুযোগ দিলেন। রফি, তালাত মেহমুদ, মান্না দে-র সঙ্গে ‘হোকে মজবুর মুঝে উসনে বুলায়া হোগা’ গানে গলা মিলালেন ভূপিন্দর। এরপর প্রথম সোলো ‘আখরি খত’-এ। তাঁর অমোঘ কণ্ঠই তাঁর নিজস্ব পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। কিশোর এবং রফির সঙ্গে কয়েকটি খুব জনপ্রিয় ডুয়েট গেয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: ‘হামে কাশ তুমসে মোহব্বত…’, কেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেল মধুবালা-দিলীপকুমারের প্রেম?

এরপরে নিজের অ্যালবাম তৈরিতে মন দেন ভূপিন্দর। প্রথম এলপি-র তিনখানি গান নিজে সুর দিয়েছিলেন। ১৯৬৮ নাগাদ বেরোয় সেই অ্যালবাম। দ্বিতীয় এলপি-তে বেরোল শুধু গজল। গজলে স্প্যানিশ গিটার, বেস এবং ড্রামের ব্যবহার প্রবর্তন করেন তিনিই। ১৯৭৮-এ বেরোল সেই অ্যালবাম। দু'বছরের মাথায় গুলজারের কথায় তাঁর সুরে এল তৃতীয় এলপি 'ও জো শায়র থা'। বাংলাদেশের গায়িকা মিতালিকে বিয়ে করলেন। আটের দশকের মাঝামাঝি প্লেব্যাক করা বন্ধ করে স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে অ্যালবাম তৈরি করতে শুরু করলেন, লাইভ অনুষ্ঠান করতে শুরু করলেন। বহু হিট গান দিয়েছেন নিজের সঙ্গীতজীবনে। 'দিল ঢুন্ডতা হ্যায়', 'দো দিওয়ানে শহর মে', 'নাম গুম যায়েগা', 'করোগে ইয়াদ তো', 'মিঠে বোল বোলে', 'কভি তো কিসি কো মুকম্মল', 'কিসি নজর কো তেরা ইন্তেজার ভি' এবং অবশ্যই 'এক অকেলা শহর মে', আরও প্রচুর হিট গান রেখে গেলেন ভূপিন্দর। ‘মৌসম’, ‘সত্তে পে সত্তা’, 'ঘরোন্দা', ‘আহিস্তা’, ‘দুরিয়া’ ছবির গান এখনও সমান জনপ্রিয়।

শিল্পীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন পঙ্কজ উদাস। “ভূপিন্দরজি আমার দাদা। ওঁর গায়কীই হোক, আর কণ্ঠস্বরই হোক– সবার থেকে আলাদা। সংগীতের জগত আরেকজন অভিভাবককে হারাল।” নাট্যব্যক্তিত্ব শেখর সেন জানিয়েছেন, “ওঁর সুর রাতের শব্দে শব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ‘নাম গুম যায়েগা’, দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। গিটার থেকে গজল– সবেতেই ওঁর আশ্চর্য দক্ষতা আমায় অবাক করত। পঞ্চমদার সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব, ওঁর কত কাজ, কিন্তু কখনও অহংকার দেখিনি।”

কয়েকদিন আগে ইউরিনারি সমস্যা নিয়ে ক্রিটিকেয়ার এশিয়া হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেখানকার ডাক্তার দীপক নামজোশি জানান, “দশদিন আগে তাঁকে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সংক্রমণ ছিল। আমাদের দৃঢ় সন্দেহ ছিল যে, কোলনে সমস্যা আছে। ফলে আমরা খতিয়ে দেখছিলাম। কোভিড-আক্রান্তও ছিলেন। সোমবার সকালেই তাঁর অবস্থার অবনতি হয়, এবং ভেন্টিলেটরে রাখার ব্যবস্থা করি। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সন্ধে ৭টা ৪৫ মিনিটে তিনি মারা যান।”

সুরের এক বিচিত্র ভুবন রেখে তিনি চলে গেলেন। আজ আমাদের আরেকবার নীরব হয়ে থাকার দিন। সেই সব সুরে তাঁর অস্তিত্ব অনুভব করার দিন।

 

More Articles

;