যুদ্ধের ক্ষত সারাচ্ছে বক্সিং, যে ভাবে বেঁচে আছেন ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ

রাশিয়ার সেনারা কিয়েভ থেকে সরে গিয়েছে প্রায় কয়েক সপ্তাহ হল। ধীরে ধীরে পোড়া ভাঙা প্রিয় জিনিসের স্তুপ সরিয়ে ফিনিক্সের মতো মাথা তুলছে কিয়েভ।

Sindhu Som
৩ মিনিট
যুদ্ধের ক্ষত সারাচ্ছে বক্সিং, যে ভাবে বেঁচে আছেন ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ

হিপহপ বিটের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পাঞ্চিং ব্যাগে ঘুঁষি মারার ভোঁতা শব্দ। ঐযে ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে তালে তালে বক্সিং করছে, নিমেষে সরে যাচ্ছে, দ্রুত নাড়াচ্ছে কব্জি —-ওরা কারা? জায়গাটা ইউক্রেনের কিয়েভ। লোকগুলি সাধারণ মানুষ, কেউ কেউ বক্সিং বিদ্যার ছাত্রও। সদ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উঠে ওরা অমন ঘুঁষোঘুঁষি করছে কেন? “শহরে কারফিউ, চলাফেরা করাটাও মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে এত রকমের নিয়ম, মাথায় সারাক্ষণ চিন্তা। এ সব নামানোর তো জায়গা চাই! বক্সিং-এ সমস্ত চাপ বের করে দেওয়া যায় আর কি,” ওলেকজান্দ্র নামে এক ৩৮ বছর বয়েসি যুবক বললেন। ওলেকজান্দ্র কিয়াভের আন্তর্জাতিক রেড ক্রস বিভাগে চাকরি করেন। পদবি জানাতে নিতান্তই অনিচ্ছুক। মোটামুটি এই বয়ান থেকেই আমরা সাধারণ মানুষের বক্সিং অভ্যাস করার একটা কারণ পাই। প্যাড ওয়র্ক, দৌড় এবং সবশেষে পাঞ্চিং ব্যাগের সঙ্গে দীর্ঘ প্র্যাকটিস সেরে ওলেকজান্দ্রর মুখে তৃপ্তির হাসি খেলে গেল, “খুব আরাম! খুবই।”

রাশিয়ার সেনারা কিয়েভ থেকে সরে গিয়েছে প্রায় কয়েক সপ্তাহ হল। ধীরে ধীরে পোড়া ভাঙা প্রিয় জিনিসের স্তুপ সরিয়ে ফিনিক্সের মতো মাথা তুলছে কিয়েভ। কিয়েভের জনজীবন ছন্দে ফিরছে ধীর লয়ে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে যে সব মানুষেরা কিয়েভ ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন, তাঁদের প্রায় দুই তৃতীয়াংশই ফিরে এসেছেন। কারো সারা জীবন একটু একটু করে জমানো টাকা দিয়ে গড়ে তোলা বাড়ি গুঁড়িয়ে গিয়েছে, কোথাও গুঁড়িয়ে গিয়েছে অফিসটাই। ব্যবসা বাণিজ্য বিপর্যস্ত। শিল্প বিপর্যস্ত। রাস্তার মোড়ে যে রেস্টুরেন্টে হয়তো বসতেন বিকেলটা, সেই রেস্টুরেন্ট গুঁড়িয়ে দিয়ে বিকেলগুলোর দফারফা করেছে যুদ্ধ। তবে জনস্রোত তাতে থেমে থাকে না। জীবন ধ্বংস ছাপিয়ে বেড়ে ওঠে। বসন্ত যদিও দেরিতে এসেছে কিয়েভে। যুদ্ধ তাকে আটকে রেখেছিল। তবু তো এসেছে। ধীরে ধীরে আবার খুলছে টিকে যাওয়া রেস্তোরাঁ। নতুনভাবে গড়ে উঠছে কিছু। ফুটপাথের ধারে কফি দোকানগুলো আবারও খুলছে। লোকের আনাগোনা বাড়ছে সেখানে। এত বড় আঘাত সামলানোর পরে হঠাৎ হঠাৎ বেজে ওঠা সাইরেনকে আর পাত্তা দিচ্ছে না কেউ। আকাশপথে বিমান? যাচ্ছে তো যাক! এমন একটা ভাব সবার মধ্যেই। সেই সঙ্গেই খুলেছে জিমগুলিও। কিয়েভ ডাউনটাউনের নামকরা জিম ‘অল স্টার বক্সিং ক্লাব’-ও খুলে গিয়েছে। এই ‘অল স্টারে’ শিক্ষকেরা বক্সিংপ্রেমী, স্বাস্থ্যপ্রেমী এবং শিক্ষানবিশদের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা করে থাকেন। লাফদড়ি, ক্রাঞ্চেস, স্প্যারিং ইত্যাদি নানামুনির নানা ওষুধ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যুদ্ধের দিনগুলোতে প্রেম, ইউক্রেনের এই যুগলদের গল্প চোখে জল এনে দেবে

যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের আকাশে-বাতাসে ভালবাসার মরশুম

গত দুই দশক ধরে বক্সিং-এর জগতে ইউক্রেন নিজের প্রতিপত্তি জারি রেখেছে। গতি, চালচলন এবং লড়াই উপস্থিত বিদ্যা–এই সব দক্ষতার জন্য ইউক্রেনিয়ান বক্সারদের ভালোই খ্যাতি রয়েছে বাজারে। অনেকে মনে করেন এই দক্ষতা ইউক্রেনিয়ান সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রেও দেখিয়েছেন। স্বয়ং কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো এবং তাঁর ভাই ব্লাদিমির দীর্ঘদিন নানারকম হেভিওয়েট প্রতিযোগিতা জিতে আসছেন। শুধু কিয়েভে নয়, বহু জায়গায় তাঁরা বক্সিং তারকা হিসেবে পরিচিত। এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভিতালি নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারে খুবই সফল। অলেজান্দ্র উস্যক বিশ্বের একচ্ছত্র হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। বক্সিং-এর গ্লাভস যথাস্থানে ঝুলিয়ে রেখে ভদ্রলোক পাড়ি দিয়েছিলেন সীমানার দিকে। ফেব্রুয়ারি মাসে সীমান্তরক্ষীদের দলে যোগ দেন তিনি। কিছুদিন আগেই ফিরেছেন। ইংলন্ডের বক্সিং তারকা অ্যান্থনি জশুয়ার সঙ্গে একটি বহুপ্রতীক্ষিত বক্সিং ম্যাচ রয়েছে তাঁর। “আশেপাশে এইসব বক্সারদের দেখলে মনে জোর পাই । আমি অবিশ্যি প্রফেশনাল হওয়ার জন্য শিখছি না। তবে ফিট থাকতে চাই।” বলছেন ভ্লাদিস্লাভ, বছর ৩৫-এর এক রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টর। তিনি আরো বলেন, “খেলাধুলো আমাকে ফিট তো রাখেই, মনটাও ফুরফুরে থাকে। চাপ কাটানোর সবথেকে ভালো উপায়।” ‘অল স্টারে’ যাঁরা এই মুহূর্তে বক্সিং করছেন, প্রায় সবার ক্ষেত্রেই এই কথাটা খাটে। যুদ্ধকালীন মানসিক চাপ এবং উদ্বিগ্নতা কাটাতেই বেশিরভাগ মানুষ এখানে বক্সিং করতে আসছেন। “

এই পরিস্থিতিতে খেলাধুলাই একমাত্র পথ মানুষের কাছে। একটা লক্ষ স্থির রেখে নিজেকে গড়ে তোলার একটা অন্যরকম সুযোগ দেয় স্পোর্টস্‌।” —বললেন বছর ৩৫-এর সরকারি চাকুরে ইগর। ইগরের আদিবাড়ি ছিল দনবাস অঞ্চলের দন্তেস্ক-এ। ২০১৪ সালে যে প্রতিবিপ্লবে হাওয়া দিয়েছিল মস্কৌ, তার প্রভাব এই অঞ্চলেও পড়েছিল ব্যাপক ভাবে। ঘর ছাড়তে বাধ্য হন ইগর। এই প্রতিবিপ্লবকে বর্তমান বছরে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সরাসরি রাশিয়ান আক্রমণের ভূমিকাই বলা যায় একরকম। ইগরের কাছে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তাই খুবই চেনা। সেই সব পরিচিত হিংসাত্মক ঘটনারই পুনরাবর্তন চলেছে যেন। তবে তখনও স্পোর্টস্‌ সাহায্য করেছিল ইগরকে। এবারও করল। ওলেকজান্দ্রর মতে, “বক্সিং মাথা পরিষ্কার রাখে। এটাই সুবিধা। কোনও চিন্তাভাবনা কিচ্ছু তখন আর মাথায় থাকে না। নতুন করে শুরু করা যায় সবটাই।” যুদ্ধ আসে যুদ্ধ যায়। ক্ষমতা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে বারবার। কিন্তু প্রাণের স্রোত এইভাবে আটকে দেওয়া যায় না। খেলাধুলো থেকে গানবাজনা–মানুষ নিজের হাসিকান্নার পথ ঠিক খুঁজে নেয়। কঠিন থেকে কঠিনতম মুহূর্তেও।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।