বাংলায় বহুদিন বন্ধ MGNREGA তহবিল, শ্রমিকের প্রাপ্য মারার অজুহাতই কি কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত?
MGNREGA Scheme: প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকা বাংলায় বকেয়া রয়েছে কেন্দ্রের ওই প্রকল্পে। তার মধ্যে ১৫০০ কোটি টাকা সেই সময়ের, যে সময় তহবিল বন্ধের বিল পাশও হয়নি।

বাংলায় একশো দিনের কাজের বকেয়া নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত বহুদিনের। কোনওভাবেই বাংলায় চেপে বসতে পারছে না বিজেপি। তাই কি বাংলাকে ভাতে মারার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তার উপর বাংলা থেকে বারবার প্রবল হয়েছে বিজেপি বিরোধিতার জের। আর তার ফলই কি ভুগছে বাংলার একশো দিন কাজের শ্রমিকেরা। নাকি এর বাইরেও কাজ করছে অন্য কোনও সমীকরণ! বহু দিন ধরেই একশো দিনের কাজের বকেয়া চেয়ে এসেছে রাজ্য। আবেদন-নিবেদন, চিঠি চালাচালি, কোনও কিছুতেই কাজের কাজ হয়নি। শেষপর্যন্ত মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি প্রকল্পে বাংলায় তহবিল বন্ধই করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। যার ফলে একশো দিনের শ্রমিকেরা MGNREGA প্রকল্পের আওতায় বাংলার শ্রমিকেরা আর কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে কোনও টাকা পাচ্ছেন না। তার জন্য এরমধ্যে আস্ত একটি বিলও পাশ করে ফেলেছে কেন্দ্র। তবে দেখা যাচ্ছে, সেই বিল পাশ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে থেকেই একশো দিনের কাজের তহবিল বাংলায় বন্ধ করে দিয়েছে মোদি সরকার।
কথাতেই আছে, 'রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়'। তারই প্রকৃষ্টতম উদাহরণ বোধহয় এই MGNREGA প্রকল্প। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের জেরে কার্যত প্রাণ যাচ্ছে এ রাজ্যের একশো দিনের শ্রমিকদের। ২০২২ সালের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক (MoRD)মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি (MGNREGA)-এর ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে বাংলায় MGNREGA তহবিল বন্ধ করার বিল পাস করে। কিন্তু কাগজকলম বলছে, ওই বিল পাশের অন্তত তিন মাস আগে থেকেই বাংলায় ওই খাতে টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্র। ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকেই বাংলায় বন্ধ ওই তহবিল।
একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের তথ্য জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে এই প্রকল্প নিয়ে অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট (ATR) চেয়ে পাঠিয়েছিল কেন্দ্র। বহুদিন ধরেই এ রাজ্যে ১০০ দিনের প্রকল্প নিয়ে বেনিয়মের অভিযোগ উঠছে। এ নিয়ে তদন্তের জন্য একটি কেন্দ্রীয় দলও পাঠিয়েছিল বিজেপি সরকার। সেই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে অ্য়াকশন টেকেন রিপোর্ট রাজ্যের কাছে চেয়েছিল কেন্দ্র। ঢিলেমি করে করে ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় রাজ্য। সেই রিপোর্ট সন্তোষজনক নয় বলে দাবি করে কেন্দ্র ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে। এরপরে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের তরফে নতুন করে অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যা আর কেন্দ্রের কাছে জমা পড়েনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kaliaganj Child Death: অভাব রাজ্যের সীমানা ঘুচিয়ে দেয়। অভাব এরাজ্যের বাবার সঙ্গে অন্য রাজ্যের বাবাকে এক পংক্তিতে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এর পরেই বাংলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় কেন্দ্র। MGNREGA-র ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে বাংলার জন্য ওই তহবিল বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। জানানো হয়, রাজ্যের কাছ থেকে সন্তোষজনক রিপোর্ট না পেয়েই এই কড়া পদক্ষেপ। যতক্ষণ না রাজ্য এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মেনে চলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে রাজ্যের ১০০ দিনের কাজের তহবিল।
এ রাজ্যের অসংখ্য নিম্ন ও অতিনিম্নবিত্ত পরিবারের সংসার চলে এই একশো দিনের কাজ করে। পুকুর কাটা, রাস্তা তৈরি, সাফাইয়ের মতো ১০০ দিনের কাজ করেই তাদের ক্ষুদপিপাসা নিবৃত্তি হয়। সাধারণ ভাবে কাজ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে বেতন পান MGNREGA শ্রমিকেরা। রাজ্য সরকারের পাঠানো ফান্ড ট্রান্সফার অর্ডারের ভিত্তিতে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের থেকে সরাসরি শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে ওই বেতন পাঠানো হয়। রাজ্যের কাজের ভিত্তিতে গ্রামোন্নয়নন মন্ত্রক প্রতিদিন ওই বেতন দিতে থাকে রাজ্যের পাঠানো FTO মিলিয়ে। কারও বেতন বাকি থেকে গেলে তার উপরে ০.০৫ শতাংশ হারে তার উপরে সুদও দেয় কেন্দ্র।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজকর্ম করে উপার্জন করেন এমন মানুষের সংখ্যা অন্তত ৫০ কোটি। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই লাগাতার অসহনীয় শোষণের শিকার।

তবে এ সকলই এখন ইতিহাস। পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেত মজদুর সমিতি (PBKMS) নামে একটি শ্রমিক সংগঠনের তরফে অনুরাধা তলওয়ার জানিয়েছেন, ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ওই তহবিল একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এ নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছে সংগঠনটি। জানা গিয়েছে, প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকা বাংলায় বকেয়া রয়েছে কেন্দ্রের ওই প্রকল্পে। তার মধ্যে ১৫০০ কোটি টাকা সেই সময়ের, যে সময় তহবিল বন্ধের বিল পাশও হয়নি। ওই শ্রমিক সংগঠনের দাবি, এ ভাবে তহবিল বন্ধ করে দেওয়া অন্যায্য। এই ধরনের কাজ করার অধিকার নেই গ্রামন্নোয়ন মন্ত্রকের। যদিও এ ব্যাপারে মন্ত্রকের তরফে কোনও সদুত্তর মেলেনি।
ওই ১৫০০ কোটি টাকা বকেয়ার সুদ দাঁড়ায় অন্তত ২০০ কোটি টাকা। আসলেরই ঠিকঠিকানা নেই। সুদের আশাটুকুও করার অবস্থায় নেই এ বাংলার দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের। কেন্দ্রের এই মনোভাব শ্রমিকবিরোধী বলেই দাবি করেছে শ্রমিক অধিকার গ্রুপগুলি। ইতিমধ্য়েই শুরু হয়েছে 'বিজেপি হঠাও! NRGEGA বাঁচাও' ক্যাম্পেনও। ২০২৪ ভোটের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে এই শ্রমিরবিরোধী কার্যকলাপকেই হাতিয়ার করতে চাইছে একাধিক শ্রমিক সংগঠন।
আদতে যেভাবে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আড়ালে গরিব, খেটে খাওয়া মানুষকে বঞ্চনা করার অবিরাম চেষ্টা চালাচ্ছে দুই সরকারই, তার নিন্দা করেছে একাধিক বুদ্ধিজীবী মহল। আসলে এই ছদ্ম লড়াইয়ের মলাটে টাকা বাঁচাচ্ছে কেন্দ্র, রাজ্য উভয়েই। আর শহর সাজাতে, ঝলমলে লোকসভা ভবনের মতো চাকচিক্যময় স্থপতি বানাতে কিংবা দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশসফরের পিছনে খরচ হয়ে যাচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রক্তঘাম জল করা পারিশ্রমিকটুকু! এই 'অচ্ছে দিন'-ই দেশের মানুষ চেয়েছিল বুঝি!







