যেখানে মুসলমান পটুয়াদের তুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠেন হিন্দু দেব-দেবীরা

tiasa gupta
৪ মিনিট
যেখানে মুসলমান পটুয়াদের তুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠেন হিন্দু দেব-দেবীরা

"রাজার পাপে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়/ গিন্নির পাপে গিরস্ত নষ্ট, ঘরের লক্ষ্মী উড়ে যায়। / মহারাজের দেশে দেখ জল নাইক হ’ল/ রাজার প্রজাগণ কষ্ট পেয়ে পলাইতে লাগিল।’’

কৃষ্ণের অবতারবিষয়ক একটি পটের গানে এমনই সামাজিক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়।

পটুয়াদের পট এবং গানের বিষয় বিচিত্র। তার মধ্যে যমলোক, বৌদ্ধ জাতক, গাজী পীর, রামকাহিনি, কৃষ্ণকাহিনি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় সামাজিক কোনও ঘটনা নিয়েও পটুয়া গান রচিত হত। পটুয়া সংগীত এক প্রকার লোকগীতি। আজ সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলীনের পথে। পটুয়ারা এই গানের রচয়িতা ও পরিবেশক বলে এর নাম হয়েছে পটুয়া সংগীত। পটুয়ারা পৌরাণিক ও লৌকিক কাহিনি অবলম্বনে বিভিন্ন ধরনের পট তৈরি করতেন এবং সেইসব পটের বিষয় অনুযায়ী গান রচনা করতেন। এই গানগুলো তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পট প্রদর্শনের সময় উপস্থাপন করেন। গানের সঙ্গে কখনও কখনও নৃত্যও পরিবেশিত হত। এর মাধ্যমে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতেন।

বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম উপাদান পটচিত্র। ভারতে নানা রকম পটচিত্র প্রচলন ছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত। তখন পটচিত্র দেখিয়ে গ্রাম-গঞ্জের মানুষকে ধর্ম ও লোকাচার নিয়ে নানা শিক্ষা দেওয়া হত। পটচিত্র দেখিয়ে পটের গান গ্রাম-গঞ্জের মানুষের বিনোদনও ছিল। কাগজ আবিষ্কার হওয়ার আগে সকল পটচিত্র কাপড়েই আঁকা হত।

রামায়ণ, কৃষ্ণলীলা, মনসামঙ্গল, শক্তি, যম, দশাবতার, চণ্ডীমঙ্গল, গাজীর পটের প্রচলন ছিল এদেশে। ব্রিটিশ আমলের ময়মনসিংহ মহকুমার ম্যাজিস্ট্রেট গুরুসদয় দত্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ২৬৩টি পট সংগ্রহ করেছিলেন। তার বেশিরভাগই সংগ্রহ করেছিলেন বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ থেকে। গুরুসদয় দত্ত তার মধ্যে আটটি পট সংগ্রহ করেছিলেন বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলা থেকে। এই আটটি পটই ছিল গাজীর পট। গুরুসদয় দত্ত বাংলাদেশ থেকে অন্য কোনও পট সংগ্রহ করেননি বা পাননি।

গুরুসদয় দত্ত ‘পটুয়া সংগীত’ নামে একটি বই লেখেন ১৯৩৯ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত বইটিতে ২৯টি পটের গান রয়েছে। সেখানে কোনও গাজীর পটের গান নেই। তবে পটে আঁকা ছবি দেখিয়ে গাওয়া হত গাজীর গান। এই পটের গানও আমাদের লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এক সময় গাজীর পট দেখিয়ে গাওয়া গান ছিল বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষের বিনোদন। সম্ভবত পীর গাজী তখন জনপ্রিয় ছিলেন। আচার্য বংশের প্রতিমা শিল্পীরা তৈরি করতেন এই পট। তাঁদের থেকে পট কিনে নিয়ে পটের গান গাইতেন বেদে সম্প্রদায়ের লোকরাও। আধুনিকতার দাপটে জনপ্রিয় এই লোকসংস্কৃতি এখন বিলীনই বলা চলে।

সংস্কৃত ‘পট্ট’ শব্দ থেকে পট কথাটি এসেছে। ‘পট্ট’ শব্দের অর্থ কাপড়। পটচিত্র হচ্ছে একখণ্ড কাপড়ের উপর হিন্দু দেবদেবী কিংবা মুসলিম পির-ফকিরদের বিচিত্র কাহিনি-সংবলিত চিত্র। এই পটচিত্রের শিল্পীদেরই বলা হয় পটুয়া। পটুয়ারা সংগীত সহযোগে পটচিত্র দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁরা গানের সুরে দর্শক ও শ্রোতাদের পটচিত্রের আখ্যানভাগ বুঝিয়ে দেন। কাপড়ের ওপর পট আঁকার রীতি ছিল প্রাচীনকালেও। তা থেকেই সাধারণভাবে কাপড়ে বা অন্য স্থানে আঁকা সব ছবিকেই পট বলার রীতি প্রচলিত হয়। যারা ছবি আঁকতেন, তাঁদের বলা হত পটুয়া। এভাবেই পট ও পটুয়া কথার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে বাংলার মানুষ।

প্রাচীন বাংলায় যখন কোনও দরবারি শিল্পের ধারা গড়ে ওঠেনি, তখন পটচিত্রই ছিল বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক। আর এই চিত্র যাঁরা অঙ্কন করতেন বা এখনও পট রচনা করছেন, তাঁদের বলা হয় পটুয়া। সপ্তম শতাব্দীতে রচিত বানভট্টের হর্ষচরিতে যমপট ব্যবসায়ীর কথা উল্লেখ রয়েছে। গুরুসদয় দত্ত এ প্রসঙ্গে লিখেছেন- "রাজা প্রভাকর বর্ধনের পীড়ার কথা শুনিয়া হর্ষবর্ধন শিকার হইতে ফিরিয়া রাজধানীতে প্রবেশ করিয়াছেন। হর্ষবর্ধন নগরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন দোকানের পথে অনেকগুলি কৌতুহলী বালকদ্বারা পরিবৃত একজন যমপট্টিক বা যমপট ব্যবসায়ী পট দেখাইতেছেন। লম্বা লাঠিতে ঝুলানো পট বাঁ হাতে ধরিয়াছে, ডান হাতে একটা শর কাঠি দিয়া চিত্র দেখাইতেছে। ভীষণ মহিষারূঢ় প্রেতনাথ প্রধান মূর্তি। আরো অনেক মূর্তি আছে। যমপট্টিক গাহিতেছে-

‘মাতাপিতৃ সহস্রানি পুত্র দার শতানি চ

যুগে যুগে ব্যতিতানি কস্যতে কস্যবা ভবান’।।"

বাংলায় বৈষ্ণবীয় ধারায় পটচিত্র অঙ্কন করার রীতিও যথেষ্ট। নিমাইয়ের সন্ন্যাস গ্রহণ থেকে শুরু করে নগরকীর্তনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়ে পট আঁকা হয়েছে। এই সকল পটচিত্র আবার কাহিনি আকারে মানুষের মধ্যে পরিবেশিত হওয়ার কথাও জানা যায়। বিশেষ করে শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের পরবর্তীতে বৈষ্ণবীয় ধারার পটের প্রসার ঘটে বেশি। নগরকীর্তনের মতো পটের গানও গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।

পটের গানের নানা প্রকারভেদ আছে- যেমন, লীলা কাহিনি, কৃষ্ণলীলা, গৌরাঙ্গলীলা, রামলীলা, শিবপার্বতীলীলা ইত্যাদি লীলা কাহিনিমূলক সংগীত।

পঞ্চ বা পাঁচ কল্যাণী

এই পর্যায়ের সংগীতগুলি কোনও বিশেষ লীলা কাহিনি বা আখ্যায়িকা অবলম্বনে রচিত হয় না। এখানে নানা দেব-দেবীর সম্পর্কে ছড়ার পাঁচমিশালি সমাবেশ ঘটে।

গো-পালন বিষয়ক গীতিকা

গো-পালন গীতিগুলিতে কপিলার মর্তে অবতীর্ণ হতে প্রথমে অনিচ্ছা প্রকাশ ও পরবর্তিতে মনুষ্যজাতির সেবার জন্য দেবগণের সনির্বন্ধ মিনতি এখানে গীত হয়।

পটুয়া শিল্পীরা হিন্দু দেব-দেবীর ছবি এঁকে তাঁদের মহিমা কীর্তন করলেও তাঁরা বেশিরভাগই হিন্দু নন। যদিও তাঁরা হিন্দুদের সংস্কৃতির সঙ্গে অনেকেই সম্পৃক্ত। পটুয়া পরিবারের মেয়েরা অনেকেই হিন্দুদের সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলেন। পটুয়াদের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে কিছু সীমারেখা বরাবরই ছিল। তাঁদের মধ্যেকার বৈবাহিক সম্পর্ক নিজ ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আজ তাঁরা অনেকটাই মুক্ত।

পটের গান লিখে রাখার কোনও রীতি পটুয়াদের মধ্যে প্রচলিত নয়। তাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে এই গান স্মৃতিতে ধরে রাখেন। যিনি পট আঁকেন, তিনি ঐতিহ্যগতভাবে পটের গানকে স্মরণ করেই আঁকেন। কখনও কখনও কেউ কেউ নতুন দৃশ্যের অবতারণা করতে পারেন। যিনি গান গেয়ে পট দেখান, তিনি নতুন গানের কলি যুক্ত করে নেন। এই ব্যাপারে পটুয়াদের স্বাভাবিক দক্ষতা রয়েছ বহুকাল ধরে। তাই শিল্পের দাবি নিয়ে ইতিহাসে পাতায় থেকে যাবে পট ও পটের গান।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।