কোন জাদুতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল 'গজধর ভাইয়া'? রাজু শ্রীবাস্তবকে যে কারণে মনে রাখবে দেশ
Raju Srivastav: কৌতুকানুষ্ঠানে গজাধর ভাইয়া চরিত্রটি সৃষ্টি করেন। দেশের ঘরে ঘরে সেই চরিত্রটিকে নিয়ে চর্চা তখন।

প্রায় মাসখানেকের ওপর লড়ছিলেন। ১০ অগাস্ট দিল্লির একটি জিমে ট্রেডমিলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক। সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির এইমস-এ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। প্রথমদিকে অবস্থার অবনতি হলেও দিন পনেরো ভেন্টিলেশনে থাকার পর শরীর খানিক সুস্থ হয়েছিল। জ্ঞানও ফিরেছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই জ্বর আসায় রাজুকে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে রাখা হয়। চিকিৎসক অনিল মুরারকা জানিয়েছিলেন, মস্তিষ্ক জবাব দিয়েছে। কিন্তু হার্ট সচল। ভেন্টিলেশনে থাকার পরে জ্ঞান ফিরলে আশার আলো দেখছিলেন সবাই। কিন্তু একে একে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। মাসখানেকের লড়াই শেষে হার মানলেন কৌতুকাভিনেতা রাজু শ্রীবাস্তব। মারা যাওয়ার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর।
১৯৬৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর কানপুরে জন্ম হয়েছিল তাঁর। বাবা রমেশচন্দ্র শ্রীবাস্তব ছিলেন কানপুরের প্রখ্যাত কবি। আদর করে ছেলের নাম রেখেছিলেন সত্যপ্রকাশ শ্রীবাস্তব। কিন্তু ডাকনাম রাজু। ওই নামেই ডাকত সবাই। তাই কেরিয়ারের শুরুতে সেই নামই ব্যবহার করতে শুরু করেন। সফলতার শীর্ষে দেশজোড়া পরিচিতি ওই নামেই। আটের দশকে উত্তরপ্রদেশের কানপুর থেকে মুম্বইয়ে আসেন রাজু। জীবিকার সন্ধানে অটো চালাতে শুরু করেন। পরে ট্যাক্সি। ছোট থেকেই তারকাদের গলা নকল করতে ভালবাসতেন। নিজের এলাকায় বেশ জনপ্রিয় ছিলেন এই কারণে। তখনই কৌতুকশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন। মুম্বই আসার পরে দেখলেন, কেউই পাত্তা দিচ্ছে না তেমন। সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বারবার বিফল হয়ে কানপুর ফিরে যাওয়ার কথাও ভেবেছেন। কিন্তু সেসময় জনি লিভারকে দেখে সাহস পেতেন। তাঁর লড়াই রাজুকে ভরসা জোগাত। জীবনে চলার পথে বহু ঘাত-প্রতিঘাত দেখেছেন। তারপরে সুযোগ এল এক হাস্যকৌতুক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শুধু অভিনেতা রাজু শ্রীবাস্তবই নয়, অতীতে ফিরে গেলে দেখা যাবে জিম করতে করতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়।
পাশাপাশি নানা ছবিতে টুকটাক চরিত্রে কাজ করছিলেন। ১৯৮৮-তে 'তেজাব', ১৯৮৯-তে 'ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া', ১৯৯৩-এ 'বাজিগর'— এমন নানা বিখ্যাত ছবির অতি সাধারণ কোনও চরিত্র পেতেন। ১৯৯৪-তে প্রথম বড় কাজ টেলিভিশনে। 'টি টাইম মনোরঞ্জন' বলে একটি অনুষ্ঠান হতো। তাতে সুযোগ পেলেন। এই শো স্মৃতি ইরানি, ব্রজেশ হিরজি-সহ বহু শিল্পীদের সুযোগ করে দিয়েছে। এরপরে 'শক্তিমান'-এর ধুরন্ধর সিং। সেই চরিত্রটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।
২০০৫ সালে 'দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লাফটার চ্যালেঞ্জ'-এর প্রথম সিজন। প্রতিযোগী হিসেবে দেখা গেল তাঁকে। মূলত মোটা দাগের কমেডি করতেন রাজু। তা ছিল সেই যুগেরই বৈশিষ্ট্য। জাতীয় টেলিভিশন থেকে বলিউডে তার আগের দু'-এক দশকে কমেডির ঝোঁকটাই সেরকম হয়ে উঠেছিল। বডি শেমিং থেকে স্লাট শেমিং, পিতৃতান্ত্রিক কৌতুক, হোমোফোবিক কৌতুক ইত্যাদি নানা অসংবেদনশীল হাস্যরস পরিবেশনটাই এই সময়টাতে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। সেখান থেকে খানিকটা হলেও যে গত এক দশকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে দর্শক, তা এক বিরাট অর্জন। এবং স্বস্তির কারণ। লাগাতার আন্দোলনে মানুষ খানিক সচেতন। যাই হোক, 'দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লাফটার্স চ্যালেঞ্জ'-এ তৃতীয় স্থান পেলেন বটে, কিন্তু অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন রাজু শ্রীবাস্তব। প্রথম স্থানাধিকারী সুনীল পালও সেই জনপ্রিয়তা পাননি।
এই কৌতুকানুষ্ঠানেই গজাধর ভাইয়া চরিত্রটি সৃষ্টি করেন। দেশের ঘরে ঘরে সেই চরিত্রটিকে নিয়ে চর্চা তখন। 'দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লাফটার্স চ্যালেঞ্জ'-এর পরে ২০০৯ সালে বিতর্কিত রিয়্যালিটি শো বিগ বস-এর তিন নম্বর সিজনে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ২০১৩ সালে সস্ত্রীক 'নাচ বলিয়ে সিজন ৬'-এ অংশ নিলেন। 'দ্য ইন্ডিয়ান মজাক লিগ' বা 'কমেডি নাইটস উইথ কপিল'-এও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। অতিথি বিচারক হিসেবে এসেছিলেন মীরাক্কেল-এ। 'ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া', 'জার্নি বম্বে টু গোয়া', 'আমদানি-আঠানি খরচা রুপাইয়া' ইত্যাদি অনেকগুলি হিন্দি ছবিতেই কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।
৪১ দিন লড়াইয়ের পর সেই জীবন শেষ হলো। রয়ে গেলেন তাঁর হাস্যরসে বিনোদনের ভরপুর স্বাদ নেওয়া দর্শকরা। সারা জীবন মানুষকে হাসিয়েছেন। সেই দর্শকরাই ভেজা চোখে বিদায় জানালেন তাঁকে। না ফেরার দেশে রাজু শান্তিতে থাকুন— এটুকুই তাঁদের আন্তরিক কামনা।
















